অন্ধকারে হলুদ দুটি চোখ জ্বলতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো দীপা । চিৎকার করতে যাবে এমন সময় ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। এই নিয়ে প্রায় দশবার ও এই স্বপ্নটা দেখেছে। প্রতিবারই চিৎকার করার আগেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। খুব অস্বস্তি লাগে দীপার এই স্বপ্নটা দেখলে। দীপা উঠে পানি খেলো। তারপর জানালার পাশে দাঁড়াল। রাস্তার লাইটের আলো দেখা যায় জানালা দিয়ে। ঘুম আসবে না মনে হয় আজকে আর। দীপার চোখ জ্বলছে। মাকে কি ডাকবে? ভাবলো সে। নাহ, মাকে এতো রাতে জাগানো উচিত হবে না। সারাদিন পর একটু তো চোখ বন্ধ করেছেন দীপার মা, রাবেয়া বেগম। ল্যাপটপটা অন করল দীপা। ল্যাপটপের ব্যাকগ্রাউন্ডে দীপা আর রিফাতের ছবিটা ভেসে উঠল। দীপা অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছবিটা ওদের হানিমুনের সময় তোলা। সেন্টমার্টিনে সাগরের পাশে দাড়িয়ে দুজন। অনলাইনে রিফাতকে খুঁজে দীপা, পায় না। তাই একটা মুভি অন করে বসে থাকে।
রিফাত ঘুম থেকে উঠে। আজ একটু বেশি ঘুমিয়ে ফেলেছে মনে হয়। তাড়াহুড়ো করতে থাকে সে। বাথরুমে ফ্রেশ হয়েই কিচেনের দিকে দৌড়ায়। একটা স্যান্ডউইচ বানায়। ফারুক উঠে গেছে। ফারুকের দিকে তাকানোর সময় নেই রিফাতের। ক্লাশ শুরু হয়ে যাবে ওর। রিফাত ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে এমএস করছে। তার হাউসমেট ফারুকের সাথে তার পরিচয় সেখানেই। ফারুক অন্য একটা ডিপার্টমেন্টে এমএস করছে। খুব ভালো ছেলে। রিফাতের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব তার।ফারুককে বলে রিফাত রওনা দিলো ক্লাশ ধরতে। যাবার পথে মনে হল আজ দীপার ছবিটাও একবার দেখা হয়নি। মনটা খারাপ লাগলো। দীপার হাত ধরা হয় না কতদিন হয়ে গেছে।
অফিসে বসে দীপার আজ কাজে মন নেই। খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। রিফাতের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে পারলে হয়তো মনটা হালকা হত। রিফাতের যাওয়ার আগের দিন ও রিফাতের কাঁধে মাথা রেখে অনেক কেঁদেছিল। রিফাত ওর চোখ মুছে দিয়ে বলেছিল, "পাগলী মেয়ে। আমি তো মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। চোখের পলক ফেললেই এই সময়টা কেটে যাবে।" কিন্তু দুইটা বছরকে এখন দুই যুগ মনে হয় দীপার। ভালো লাগে না কিছুই। ওর শ্বশুরবাড়ি যশোর। তাই এখনও ও বাবা-মার সাথেই থাকে। রিফাতের সাথে ওর ভালো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। ভার্সিটিতে থাকতে একদিনও রিফাত ওকে না দেখে থাকতে পারত না। বুয়েট থেকে ক্লাশ শেষ করেই সোজা টিএসসিতে চলে আসত দীপার সাথে দেখা করতে। একদিনও মিস যেত না। রিফাতের পড়া শেষ হলে চাকরি পেয়েই দীপার বাসায় প্রস্তাব পাঠায় ও। দীপার বাবা-মাও খুশিমনে হ্যা বলে দেয়। বিয়ের আগেই রিফাতের বাইরে এমএস করার সবকিছু ফাইনাল হয়ে যায়। দীপার একটু মন খারাপ হলেও ও রিফাতকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। রিফাত খুব ভালো স্টুডেন্ট। তাই ওর পড়া্য বাধা হতে চায়নি সে।
ক্লাশ শেষ করে রুমে ফিরেই অনলাইনে বসে যা্য রিফাত। নাহ, দীপা নেই অনলাইনে। কিচেনে যায় ও খাবার বানাতে। অনলাইনে রেখে যায় আইডি। দীপা আসলেই কল দিবে। ভিডিও কল। ঐটাই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। একদিন ভিডিও কল ছাড়া থাকাটাও যেন দুঃস্বপ্ন তাদের।
দীপা অনলাইনে রিফাতকে পেয়েই কল দিল। একবার কল হল কিন্তু রিফাত ধরল না। দীপা একটু রেগে গেল । আবার কল দিল। এখন ২টা রিং বাজতেই রিফাত ধরল। "স্যরি, আমি কিচেনে ছিলাম।" দীপা একটু রাগের ভঙ্গি করল। রিফাত জানে এই রাগ শুধু কয়েক মুহুর্তের । একটু পরই দীপা হেসে উঠবে। আর ভিডিওতে ঐ হাসির দিকে অপলক চেয়ে থাকবে রিফাত। যে হাসির প্রেমে পড়েছিল সে ছয় বছর আগে। দীপা রাগের ভঙ্গি করে মনে মনে ভাবছিল কখন রিফাত তার রাগ ভাঙ্গাবে কবিতা বলে। রিফাতের মুখে কবিতা শুনেই তো ও হ্যা বলেছিল রিফাতকে। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুজন মানুষ ল্যাপটপের সামনে বসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। কি গভীর সেই দৃষ্টি। কত অপরিসীম ভালোবাসার সেই এক মুহুর্ত পৃথিবীর আর কেউ কি জানে ওরা ছাড়া? যেন দূরে থেকেও ওরা পাশেই আছে সবসময়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



