somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুকামি

০৫ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শীত জমে ওঠা নগরের কালো রাস্তায় গভীর রাতে একাকি পোস্ট মডার্ন বাউলে খালি গলায় অতি দরদের সহিত গাইতেছে তাঁর প্রাণনাথের গান:

সাঁইজি আপনার পায়ে দি’য়েন ঠাঁই আপনি ছাড়া
এ জগতে এই অধমের আর কেহ নাই।
আপনি মাছ মাংশ কিছুই খান না আমি কিন্তু খাই
তাই
আমি অধমের অধম আপনি হলেন সাঁই।।

আপনার জামাজুতো কিছই লাগে না আমার ঠিকই লাগে
তবু দাসী রূপে রাইখেন সাঁইজি আপনারই লগে।
আপনি যদি আপনার লগে এ অধমেরে না দেন ঠাঁই তা’লে
আপনি কিসের ফকির ? কিসের সাঁই?
আপনের চরণে ঠায়ে’র আশায় প্রাণ বান্ধি আর খুব গোপনে
আপনের জন্যে একা কান্দি।

আপনের ছবি দিলের ভিতর এঁকে ভাবি সাঁই ভাবের মধ্যে থেকে।
আপন ফকিরি দরবারে জলসা হলে মনের ঘরে সিঁধ কেটে যায়
যে লক্ষণা,
তাহার চরণ পাওয়ার আশায়
কুবৃক্ষের ফল লালনে খায় তাইতো ভবে রয় যন্ত্রণা।

এই ভাবের হাটে আশেক রাসূল মমিন মোকাম খোঁজে যারা তাদের দিলে বসত করে নয় জন তারা, তাদের সে নয় তারাতে আলোক ভূবন দেয় যে সাড়া সেই সাড়াতে দিনের রাসুল ত্রিশ পারা..
এই ভাবের কিনার ধরে হাঁটে যারা তাদের মন না থাকে আর মর্চে পাড়া..
এই সলকের আভার তলে সকল মিলন পাখনা মেলে।

অর্ধ আওলানো লোকটা ওই মিলন মেলার ভাবের হাটে নতুন পয়সার মত, পানির স্রোতের মতো দিলের দুনিয়ায় ফকিরি করার মানুষি প্রতিজ্ঞায় নিষ্ঠারত, তাঁর দিল সাফ, মনোগাঙে শাপলা ফুটে থাকে আর খুব গহীন বুকের অরণ্যে না পাওয়া এক পাখি শুধু ডাকে। ভানু মুরালির চক্ষুকে সাক্ষ্য করে সে তাঁর ভাবের তরীতে একাকী ভাসমান,তবে, সে আধা কানা, অর্ধ মুখের মানুষ, ভাবের নদে। ভাবের হাটে যারা মাল কেনাবেচা করে আর যারা খরিদ করে তাদের দেখার জন্য তো দিব্য চোখ থাকা আবশ্যকীয়, তা লোকটার আছে, যা, আধা কানা ভাবের হাটে, ভবো পারের গোলমালে তার সাই নাই। তিনি বা সে বা অন্য কেউ আধা কানা এ অর্থে না যে বেশি পাওয়ারের চশমা ছাড়া সে কিছুই ঠিকমত দেখতে পারে না। সে দেখে ভানুর গাত্রে সাধনার তীর ছুড়ে সেও দেখতে চায় তীরের ফলা কেমনে গেঁথে তোলে রৌদ্দুর, চাঁদ সদাগর।
সমস্যা হলো সে যা কিছু দেখে তা পুরোপুরি অবলোকন করতে পারে না মন গহনের পাঞ্জাতনে। সাধারণত প্রত্যেক মানুষের দু'নয়ন, এই দু’নয়ন দিয়েই মানুষেরা সব কিছু দেখে থাকে। দেখার নানা রকম ফের আছে। নিজের ভিতর দেখার চোখ সবার থাকে না, এ চোখ পাঞ্জাতনের ছায়াতলে বাইস্কোপ দেখার মত, সেই বাইস্কোপে একটার পর একটা নিজের ছবি আঠারো ভাজের তলা থেকে সলক বেলার আলোক সারির মত মন আকাশের শাদা মেঘের দিকে ছুটে আসতে থাকে, সে সব ছবির নানা রকম ভাব, ভঙ্গি।
সে, যে, ভাবের হাটে আধা কানা, মানুয়ের দু নয়ন ছাড়াও যে আর একটা নয়ন বিদ্যমান, সে সেই নয়নের কথা সরল দিলে স্বীকার করে এবং মনের প্রাণে তার অধিস্থান থাকা জরুরী বলে মনে করে। তাঁর নিজকে দেখার দিব্য চোখ আছে, তা সে দেখেও, শুধু পরখ করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে পাওয়ার আলা চশমার, তা না হলে ঠাহর করতে পারে না নিজ দেহ কাঠের সংযোগ স্থানের যোগ-বিয়োগগুলি,
ডোবা নালাগুলি।
সত্যিকার অর্থে সে জিনিয়াস, ফুকো মেরে ঘাটে ভিড়িয়েছে ভাবের নৌকা, আর তাঁর নকুল ঠাকুরের পায়ের প্রতিভার মত জ্ঞান পিপাসু মন, সকল সময় নীল কাঞ্চনের গুহায় যেতে চাই শয়তান মারা পাখনায় চেপে। এজন্য তাঁর সঙ্গে তর্কে কেউ পেরে ওঠে না, কেননা তাঁর মনের ভিতর ভানুমতির কেরামতি, সেই ভাবের নৌকায় বারামখানার তাপ কিছুটা হলেও আছে পবনের আকারে নিরাকার হরিনাথের মত। এ ধরাধামে এই আধা কানার সঙ্গে কারো কোন শত্রতা নেই আবার বন্ধুত্ব সম্পর্কও নেই। সে নিজের পালকিতে নিজেই সওয়ার। তাকে দূর থেকে অনেকেই দেখে কাছে ভিড়ার সাহস কেউ দেখায় না, কারন তাঁর ভঙ্গির মধ্যে এক ধরনের ফিকিরি ভাব আছে। ফিকিরি ভাবের রসের ভান্ডর মধ্যে সে দয়াল চাঁদ নিধুরাম না, তা সে জানে, সে আরো জানে যে সে আধা কানা, তাই তাঁর দিব্য চোখের আলো যাতে সবকিছু ঠিকমত অবলোকন করতে পারে এবং নিজের কাছে নিজেই যে আধা কানা এই অপবাদ যাতে ঘোচে সেজন্য সে রীতিমত তৎপর নিজ জ্ঞানের গুণে। সে এও জানে যে অজ্ঞানে তাঁর অনেক সুনাম আছে, তাঁর সুনামের বারামখানার উপর কোন ছাউনি যে নেই, তা সে জানে।
এছাড়া সে যে যা কিছু দেখে বেশি পাওয়ারের চশমার ফাঁক গলিয়ে তা তো আর সকলে জানে না। এ জন্য নিজের দিলটাকে সে তাই কায়েমি করার অভিপ্রায়ে এবং দিব্য চোখের আসমানি দ্যুতিতে নিজের মনের ঘর আলোকিত করার জন্য কিছুদিন যাবৎ তালিম নিচ্ছে একজন সাধকের কাছে। যে সাধকের কাছে তালিম নিচ্ছে সে, তাঁর দুচোখই অন্ধ। তারপরও সে নাকি সবকিছু দেখতে পায়, দিব্য জ্ঞানী। এই অন্ধ সাধক শাদা লুঙ্গি ও শাদা পাঞ্জাবী পরে। এই পোষাক সে পরে তাঁর বড়বিবি মারা যাবার পর থেকে। বড়বিবিকে এই সাধক মায়ের মত ভালবাসতো। এই সাধকের গুরূও ছিল এই মা রূপি বড়বিবি। সেই বিবির গুণের মহিমায় সে আজ দিব্য জ্ঞানের রসভান্ডার। তবে তাঁর বিবির কোন গুণের কারণে সে শাদা পোষাক ছাড়া অন্য রঙের কোন পোষাকই আর পরে না, তা কেউ জানে না, তবে কেউ কেউ মনে করেন এটা তাঁর ছোট বিবির খায়েশ। যাই হোক, আধা কানা লোকটা শিষ্যত্ব গ্রহণের পর থেকে কালো পোষাক পরে। বারো বছর যাবৎ এই পোষাকই তাকে পরতে হবে, এ রকমই অন্ধ সাধকের নির্দেশ। এ তো গেলো পোষাকের ব্যাপার, এ ছাড়া আর একটা নির্দেশ আছে, তা হলো আধা কানা লোকটাকে আঠারো বছর উনিশ দিন পাঁচ পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে হবে, ধ্যানের মধ্যে থেকে ভাবের চর্চা করতে হবে। ভাবের তরীতে আর কাউকে সঙ্গ দেয়া যাবে না। কোন পথে পাঁচ পাহাড়ে যেতে হবে, কিভাবে যেতে হবে অন্ধ সাধক তা বাতলিয়ে দিয়েছে তাকে। বর্ষাকালের শেষ সোমবারের ভোরের দিকে লোকটা পাহাড়ের দিকে রওনা দেয়।
সে যাবে ভোমরা পালান পার হয়ে আরো উত্তরের দিকে, সেখান থেকে পুবের দিকে কিছুটা অগ্রসর হয়ে কালিতলা বা’য়ে ফেলে নাক বরাবর চলে যাবে, সামনে পড়বে হরিৎ পুকুরের মোড়, তারপর আর একটু আগালেই ডান দিকে বিশাল আমলকি বন, তাকে এই বন পার হতে সময় লাগবে, তবে সে চশমার চোখ দিয়ে আমলকি বনের গম্ভীর ভঙ্গি দৃষ্টিগোচর করতে পারবে। আমলকি বন পার হলে মিনিট ছয় হাটাঁর পর সামনে পড়বে লালমনিহার নতুন পাড়া, এ পাড়ার লোকজন সবাই পাখি শিকার করে। এদের কে স্থানিয় লোকজন বুনো বলে। এ বুনো পাড়া পার হলে বামে তাকালে দেখা যাবে সবুজের সারি সারি সমাহার, খোলা আকাশের অবাধ উপচিয়ে পড়া উচ্ছ্বাস, স্বচ্ছ্ব কাচের মত দ্যুতি ছড়ানো সেই উচ্ছ্বাস সবুজের আবরণে অপূর্ব নিস্তব্ধতার মত চরণ রাঙিয়ে তোলে, এর মধ্যে দিয়েই তাকে তিন কোণা পাহাড়গুলির দিকে যেতে হবে। সেখানে পাশাপাশি চার সাহাবি পাহাড় আর তাদের মধ্যিখানে একটা ফকিরি পাহাড়। ফকিরি পাহাড়ের সবচেয়ে উচু জাগায়, একদম উপরে চন্দন কাঠের দোতলা এক ঘর আছে, সেখানেই তাকে যেতে হবে। এই ঘরই হবে তাঁর সাধন সিদ্ধির কেন্দ্র। এ ঘরের বাইরে সে কোথাও যেতে পারবে না আঠারো বছর উনিশ দিন। তাকে সেবা প্রদানের নিমিত্তে এক জনা সারাক্ষণ থাকবে। তাঁর নাম মুকামি। সে এই পাহাড়ে তিন যুগ ধরে আছে। তারপরও তার পাপ মোচন হয়নি। তাঁর নাকি করুণ ইতিহাস আছে। সে যখন তের বছরের তখন তাঁর বাবা মাকে রাক্ষস রাষ্ট্যের কুলিন সেপাহিরা গলাটিপে মেরে ফেলে। আর ছোট একটা বোন ছিল তাকে দাসি বানিয়ে ভোগের জন্য নিয়ে যায় সঙ্গে করে। সে কোন রকম বেঁচে যায়। তারপর থেকে সে একে একে একুশটি কুলিন সেপাহিকে হত্যা করে। আর এগারটি সেপাহি পরিবারের নারীকে বলৎ করে এবং তাদেরকে নির্মমভাবে খুন করে প্রতিষোধের নেশায়।
তারপর থেকে সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতো, সব সময় তাঁর মনে ছিল অশান্তি, একটু শান্তি পাওয়ার আশায় সে পথে পথে ঘুরে বেড়াতো। পথে পথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে সে এক সময় তাঁর পাখি শিকারি বংশের সকলের কথা ভূলে যায়। এক রোজার মাসের শেষ শুক্রবারে সে ঘুঘুডাঙা বিলপাড়ের দোচালা ঘরের এক অন্ধ ফকিরের দেখা পায়। সেই অন্ধ ফকিরই তাকে এই পাহাড়ে পাপ মোচনের জন্যে পাঠিয়েছেন। সে সারা দিন সারা রাত মননের জানালা খোলা রাখে আর ভোরের নির্মল আলোয় নিজের সাথে বোঝা পড়া করে কাটিয়ে দেয় সেবার মধ্যে দিয়ে। প্রকৃতির সকল জীবের জন্যই তাঁর সেবার দরোজা সকল সময় খোলা থাকে। সেবা করার মধ্যেই তাঁর পাপ মোচন হবে। তারপরও তাঁর দেহকাঠের ভিতর কোটি বছরের হরমোন ঝরনার জলের অবিরত শব্দে সারাক্ষণ মেঘে মেঘে ভেসে বেড়ায়, তা তাকে সেবা করার মনোটোনাস ভাবটাকে জাগিয়ে রাখে যেন পাতাল পুরির হাজার বছরের শাদা শাদা শান্তির নীল পায়রারা তার মনের ভিতর উড়াউড়ি করে যায়, তাদের উড়ার গতির সাথে তাঁর সকল বেদনার কাঞ্চন জংঘা আরো আলোকিত হয়ে উঠে। সেই সাথে তাঁর জীবনের আশা নিরাশার বাতি ঘর আধার মুক্ত জাহাজের ছায়ার মত ঘুম থেকে জেগে ওঠে, কল্পনার অসংখ্য বিড়ালের থাবার মধ্যে তবু তাঁর প্রাণের কালো ভোমরা বন্দি হয়ে থাকে যার প্রাণের সঙ্গে তাঁর প্রেমের জানালা, নদী আর জীবনের অথৈ স্রোত মোহনার সাথে মিলিত হবার প্রত্যাশায়
উন্মূল বাসনার টান অনুভব করে।
যার নির্জনতার সীমানা বাঁধা পড়ে থাকে সেবার মধ্যে দাসিভাবের প্রেমের মধ্যে। তাঁর ভাবের মধ্যে তবুও তাঁর বংশধরেরা রাজা বাদশাদের মাথার খুলির মত পড়ে রয়েছে বহু বছর, সে তো মনে মনে তাদের সেই মাথার খুলির ভিতর দিয়ে যাওয়া আসা করে, যেন তার ভিতর তাঁর সমস্ত প্রেম অজানা আকাংখার মত তীর ধনুকের মত সদা প্রস্তুত হাসরের ময়দানে জবাব দেবার জন্য। এখানে তাঁর কেউ নেই তবু তাদের খোঁজে সে এই পাহাড়ে সবুজের সমারোহে চন্দন কাঠের দোতলা ঘরের মেঝেতে রোদের ভিতর বিড়ালের থাবার মত সদা প্রস্তুত থাকে, সেবা প্রদানের মধ্যে দিয়ে।
এই মুকামি, লোকটাকে সেবা প্রদানে বাধ্য থাকবে।
তবে সে যে স্বপ্নের ভিতর জাহাজের মাস্তুলে ঝুলে থাকা রোদের সঙ্গে সন্ধি করে রোজ রোজ ভাবের মধ্যে থেকে, সাগরের জলের মত তাঁর স্বভাবের বালুচরে যে সব বালুহাসেরা ছিল তারা সব উড়ে গেছে বহুদূরে, সে যে একা একা নির্জন ঘরের মেঝেতে রোদের মধ্যে বসে তাদের পাখনায় নিজের ছবি আঁকে, তাতে সিদ্ধি লাভের কেন্দ্রে আসা লোকটা কোন প্রকার বাঁধা প্রদান করতে পারবে না। তাঁর মুখের বাম গালের কাটা যে দাগ আছে সে দাগের সঙ্গে কোন কিছুর তুলনা করতে পারবে না। ঝড় বৃষ্টির ছাঁটে দোতলা ঘর কেঁপে উঠলে সে বাইরে বের হয়ে পড়ে, ঝড়ের গতির সঙ্গে সে লড়াই করে ভাবের মধ্যে থেকে এতেও বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।
আর তার ভিতর আনন্দর বাতাস বয়ে গেলে, সেই বাতাসের শো শো শব্দে সে যে আরো নিঃশ্ব হয়ে যায়, তাকে কে যেন ধুয়ে মুছে ছাফ করে দিয়ে যায়, তাতে তার নিঃসঙ্গতা আরো গাঢ় কাঠামো ধারণ করে, যার ভিতর তার প্রাণ পুরনো ভেঙে পড়া বাড়ির মত হয়ে যায়। এর ফলে স্বপ্নের ভিতর সে দেখতে থাকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা রোগীদের, তারা সব তার কাঁটার বেড়া ভেঙে মিছিলে যোগ দেবে, এমনি ভাব আর তাদের মুখের রঙ ফ্যাকাশে মুকামির বাম গালের দাগের মত।
এ ছাড়া সে আর একটা স্বপ্ন দেখে ভাবের মধ্যে, তা হলো, চারিদিক রব রব গুজুব ওঠে যে নগরের সব ফ্লাট বাড়ি এভিনিউ পার্ক বস্তি সামনের বর্ষায় ডুবে যাবে। এ ভয়ে নগরের সব উচ্চ বিত্ত মধ্যবিত্তদের ঢল নামে রাস্তায়, মড়কের ভয়ে তারা যেন সব নূহের নৌকার অপেক্ষায় সারি সারি কবর থেকে উঠে আসা এক একটা লাশ। তাদের গায়ে লোবানের গন্ধ, বাতাসে সে গন্ধ চৌদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পোস্ট কার্ডের মত গ্রাম থেকে সমস্ত ছাগল বিড়াল কুকুর ছানারা শহরের কিনারায় জড়ো হয় যেন উজাড় হয়ে যাচ্ছে এক দল সরীসৃপ, তা দেখার জন্য তারা খুবই উদগ্রীব অধীর.. তাদের চোখে মুখে কোন ক্লান্তির ছাপ নেই, হারানো কোন হতাশার ছায়া নেই, এক ধরনের শান্তি তাদের চোখেমুখে ঝলক দিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে তাদের মাথার উপর আকাশ এমন ভাবে দিল খোলা হয়ে আছে তাতে তাদের মনে হচ্ছে নতুন জীবনের হাতছানি দিয়ে তাদের কে ডাকছে। তারা তাতে সাড়া না দিয়ে পারবে না বলে মনে হচ্ছে আর নগরে তাদের আগের বংশধরেরা সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যাচ্ছে..লোকটা ভাবের মধ্যে এ সব স্বপ্ন দেখে, এ স্স্বপ্ন দেখার সময় কোন রকমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না।
চন্দন কাঠের ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা ভেদ করে প্রতিদিন যে অজস্র রোদ ঢুকে পড়ে সেই পথে তাঁর তৃতীয় নয়ন হাঁটতে হাঁটতে অনন্ত সীমানার ওপারে মনের ঘরের পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে, তাদের পাখনার শব্দে লালনের গান বাজে হাছন রাজার মুখের বোল ফুটে থাকে থোকা থোকা। আর ঘরের পাশে
বকুলের গাছ আছে, তার শরীর দিয়ে সারাক্ষণ মানুষের গায়ের গন্ধ বের হয়, এ গাছের কোন কিছুকে ছোয়া যাবে না। এ গাছের পরিচর্যা করার দায়িত্ব একমাত্র মুকামির। মুকামির আর একটা অভ্যাস আছে তা হলো সে ভাবের মধ্যে গুন গুন করে। তাঁর গুনগুনানি শব্দের চন্দন কাঠের ঘর মনের মধ্যে প্রতিদিন বেড়ে ওঠে, এক তলা..দোতলা..আর

রাস্তার উপর চাকার নিচে গান গেয়ে ওঠে ঠাকুর বাড়ির আঙিন।
সেনাবাহিনির কুচকাওয়াজে
ভরে ওঠে যাদু ঘরের করিডোর
শাসকদের কংকালেরা সেলুট দেয়, তাতে কৃষকেরা লাল গালিচায় পা রেখে রেখে, সব তৈল চিত্রে পোজ দিচ্ছে।
আর সে এই সব দেখে যাচ্ছে একা একা চন্দন কাঠের ঘরে।
রেল লাইনের ধারে যারা বড় হয়েছে, তারা সব বুনোপায়রা, আওলাঝাওলা ওড়ে, আর জলপায়ের
বুটের শব্দে শহরময় সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে, হাহাকারের ভেতর বাজি ফোটে,
জলপাই রঙের উটেরা তাদের নাম না জানা আত্মীয়দের লাশ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে
দিগন্তের দিকে।
পরকীয়ার পায়রাগুলি সব উড়াল দিচ্ছে উড়াল..
এইডসের রোগীরা গান গাচ্ছে সব গান গাচ্ছে রেডিওতে টেলিভিশনে
বেসরকারি ক্লিনিকগুলি ভরে উঠছে শ্মশানের হাওয়ায়
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাষ হচ্ছে আফ্রিকান মাগুর
হা হা নগর ছেড়ে যাচ্ছে সব বাদুর বিড়াল চামচিকা।
তবু কাকেরা কাকের সাথে হা হা
ফিল্ম মেকাররা মৌজে আছে
তাদের চোখে চশমা নাই জামা জুতা সব ভেসে গেছে বানে
হা হা
অফিস কেরানিরা যে যার সাথে
কামুকেরা হা করে আছে তাদের মুখের মধ্যে শুধু ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া
আর কিছু নাই।
তাদের মাংশের ভিতর গুলির আওয়াজ
হরিনেরা বনে বনে ফের ফিরে গেছে
মাছের জীবনে ফের ফিরে এসেছে সুবাতাস ..
এত কিছুর পরও লোকটাকে, মুকামি প্রতিদিন সেবা প্রদানে বাধ্য
থাকবে।


রচনাকাল: ২০০৫
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:১৭
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×