সাধুর চরণে বহুকাল ধুলোর মত লেপ্টে আছে চরণদাসি, তাকে আমি যতবার দেখি টুকে রাখি দৃষ্টির উন্মুক্ত খাতার হলুদ পৃষ্ঠায়। খুলে খুলে ক্ষণে ক্ষণে পড়ি। উলুবনের গভীরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আর ভাবি - এবার চোখের দেখা পেলে তুলে রাখবো মাটির দেওয়ালের ভিতর। গভীর রাতে দেওয়ালে কান পেতে শুনবো তাঁর গোপন সিম্ফনী।
হাহাকারের বন্যায় যেবার ভেসেছিল বক্ষস্থ পাখিদের ভিড়, সেবার মৌসুমী ফলের ঘ্রাণ আর মানুষের সম্মিলিত বিরহের চৌকাঠে খুলে পড়েছিল মৌবনের নিরব প্রহরী। তার খোলা দেহের খালগুলোতে মাছেদের অবাক হওয়া চক্ষুতে মিশে গিয়েছিল আমাদের কাঁহার পাড়া। পালকিশুন্য কাঁহার পাড়ার বাঁশবাগানে আমরা মাটির পৃথিবী এঁকে তার ভিতর একে অপরে আঙুলগুলো লুকিয়ে ফেলে সমস্বরে হেসে উঠলে বাঁশপাতার মচমচ শব্দের তরঙ্গ ঢেউ তুলে ছুটে আসতো আমাদের হাসির নদে। তখন আমাদের পরাণপুকুরে ভেসে উঠতো - গাঙপাড়ের রাখালের মুখ, উড়তে গিয়ে বারবার পড়ে যাওয়া বাচ্চা শালিখেরা আড় চোখে দেখতো এইসব। আমাদের মনে তখন হঠাৎ-ই বৃষ্টি নামতো।
ময়ূরের পেখমে যাকে আমরা একসঙ্গে হেসে উঠতে দেখি, তার চরণে লাল মাটির দাগ। আমরা দাগের বাইরে যাই না। যেতে চাই না। সেই থেকে ছকের ভিতর আমাদের ঝাউবন। আমাদের সুষমার আড়াতে আমরা ঝুলিয়ে রাখি সবুজ ড্রাগন। ভুল করেও কেউ ছুঁতে যাই না কলমির মন। চরণদাসির নিধেষ আছে, যে ছোঁবে কলমির মন, তাকে সে নিমিষে করবে বর্জন। আমরা ভয় পাই। নিধেষের বেড়া ভেঙে যেতে চাই না কলমির নরোম ছায়ায়।
আমি মনে মনে চরণদাসিকে ভয় পাই না। উপর উপর ভয় পাই। তাঁর দিকে তাকালে আমার মনে হয় এই কথা বুঝে গেছে সে। আমি গোপনে গোপনে বিড় বিড় করি;
খোঁপার মেঘেতে স্পর্শের বাণ
ধনুকের দেহ! তুমিই সাম্পান। চড়াও রোদেলা নাওয়ে গোপন তুফান
দৃষ্টি মৈথুনে ডালিম,হোক খান খান।
ডালিমের লাল দানায় ভাসুক বক্ষখেত, সোহাগের রাতে পাঠিও
সবুজ সংকেত।
ঝুলিয়ে রাখা সবুজ ড্রাগন মাটিতে খুলে পড়ে। জানালার রড বেয়ে বেয়ে আমার ঘরে ঢুকে পড়ে বুনো-শব্দের গভীর কাঁপন। আমিও কাঁপি। বুক পকেটে হাত রাখি। অজস্র গোলাপের চারাতে ভরে ওঠে আমার শ্রীমন - ডাকে, এসো কুটুম, বসো আমার পাঁজরের তারে। কেউ আসে না, তবু একা একা তারের ভিতর কে যেন ডাকে;
নিশি কুটুমের ডাক দিয়ে যায়
ভরা নদীর উচ্ছল যৌবন,কাহারে কুসুম বলে ডাকে
আহা! হৃদ্যতার ছিন্ন মৌবন।
সাদা পালকের ঘ্রাণ মুছে
ফিরে দেখে প্রান্তজন,নোলকের কোণে স্নিগ্ধ হাসে -
তারই সিক্তবসন।
কাঁহারদের মেয়েরা স্নানে যায়। আমরা ওৎ পেতে থাকা ঢোল-কলমির রোদে মিশে গিয়ে দেখি তাদের খোঁপার বাহার। নূপুরের শব্দে আমরা টুকরো টুকরো হয়ে ধুলোতে গড়াই। আমাদের বক্ষে তারা ছাপ দিয়ে গেলে আমরা হৈ হৈ করতে করতে তাদের পায়ে পায়ে পুকুরে নামি। মাছের সংসারে আমাদের তৃষ্ণা হয়ে ওঠে পানির সন্তান। আমরা আবার গভীর রাতে সমস্বরে হেসে উঠি। আমাদের দেহ তখন নূপুরে বাজে ধবল শয়তান। আমরা ঘুমহীন চৌকাঠে হাসি আর;
দেহের গাঙ ভেসে গেলেই
পলকে ঢেউ উথলে ওঠে।
উজানের মাঝি,কালোতরীতে ভাসিয়ে নিও
জলসুড়ঙ্গের পাঁজরে
যেসুধা যেসুমধুর কাঁপন ওড়ে,তাকে সামলিয়ো।
জ্বলে ওঠে নুনের ভিটা। খুব গভীরে কে যেন মুছে দিচ্ছে আমাদের ব্যক্তি মহিমা –এ শুধু মানবিকতা নয়, পাহাড়ের ঢাল নয়, সুরের ভিতর কি যেন হারিয়ে গেছে, আরো প্রাণীকুলের ভিতর থেকেও আওয়াজ ভেসে আসে, আমরা কারো দিকে তাকাই না, চুপ করে মাটির দিকে তাকাই। নিজেদের আলাদা করে নিজেদেরকেই ফিরে দেখি আমরা, আমাদের হাড়ের নগরে ঝাঁকে ঝাঁকে সৈন্যরা ঘুম থেকে জাগে, আমরা আবার ফিরে যাই চরণদাসির কাছে। ফিরে যাই ভোরের পাখিদের কাছে।
ভোরে পাখিদের কাছে রাগ ভৈরবি শুনতে শুনতে চরণদাসির খোঁপায়, কখন যে উঠে এসেছে সর্পসর্পিনী। আলো-লতার মৃদু স্পর্শ, গোপনে স্নান সেরে মোহ চিলের চোখে চোখ রাখে - মনে পড়ে অনার্য আজ বাড়ি ফেরেনি...
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


