somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফাঁকা মাঠে স্মৃতি মন্থনের ঘ্রাণ

২১ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ১১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাশের বন পার হলে সরু পথের বাঁকা সিঁথিতে - ছায়া ফেলে দ্রুত চলে যায় মনোচৌকির নিচে লুকানো হলুদগন্ধী নগ্ন পদচুম্বন। তার ধ্বনি বাজতে থাকে, খুলে খুলে পড়ে ঢোলকলমির পাতায় রোদ প্রিয় মন। উড়ে উড়ে যায় বাতাসের শো শো শব্দের মগ্ন সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে। হাতের মুঠোতে ধুলোর গন্ধ এখনো সরল কিশোরের দৃষ্টি চেছে নিচ্ছে যেন। কোন মানে হয় না এসবের, তবু স্মৃতির ডালিম নেচে উঠছে ..

খোলা মাঠে কাউকে দেখা যাচ্ছে না, দূরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টিনের ঘরের উপর রোদ পড়ে আকাশের দিকে ডানা মেলছে, আর তার তড়িৎ চাহনিতে উজ্জ্বল এক আলোর ঝলকানিতে মুখের উপর তৈরি হচ্ছে এক আভার পর্বত। এর কোন চূড়া নেই। সীমানাহীন গোলকধাঁধার ছামিয়ানায় আর আকাশের সাথে মিলে যাচ্ছে রোদ আর উড়ন্ত সলকের সঙ্গম শেষে দিগন্তে ভেসে উঠছে রোদ সিংহের তারকারা।

এসব ভাবতে ভাবতে মনোহর কোথায় যাচ্ছে? কার কাছে ছুটে যাচ্ছে? কেনই বা যাচ্ছে? দুর্বাঘাসের সংসারে বা বাঁশপাতাদের সবুজ মৌনতায় তার কি কোন ঠাঁই হবে? যাকে সে বাক্যপ্রতিমার অধরে দেখেছিল গভীর এক রাতের শেষে গ্রীনরোড সংলগ্ন সম্পর্কের সূচিপত্রে, তাঁর মোহভঙ্গের সীমানা থেকে নাও গুটিয়ে সেই কবে নিরুদ্দেশে চলে গেছে সুষমার বাহুবন্দী দাহ, তাকে কি আর ফিরে পাবে? তবুও মনে হয়, নীলজলাশয়ে হয়তো দেখা পাবো, ডানার শব্দে ডানা মিলিয়ে জলের সিক্ত উরুতে আবার ভোর জেগে উঠবে হয়তো, এরকম মনে হয়, আর পদচিহ্ন দ্রুত বাঁকা সরুপথ ধরে উড়তে উড়তে যায়। দেখা মিলবে তো এবার? এই নিয়ে তেত্রিশবার এই পথ পাড়ি দিচ্ছে।

ও কি ভুল পথে যাচ্ছে? কোন মানুষজনের দেখা পাচ্ছে না কেনো? ডানে বামে তাকায় সে। ঢোলকলমি, কড়ুইগাছের ছায়া, জামগাছের পাতার শিরায় হাটবারে ঘরে ফেরা গৃহস্থদের মুখোভঙ্গি এখনো ভেসে আছে। তেঁতুল গাছের পাশে ভাঙা কুয়োর জংধরা দেহ আর কুড়ে ঘরের সারিগুলো আছে নাকি আজো! কে জানে! ওর ভাবনার তলে রাখালের মাথাল গজিয়ে উঠছে। ডাঙগুলি খেলা ছেলেদের হৈচৈ আর সন্ধ্যার আগে মেয়েদের বৌচি খেলার দৃশ্যগুলা মনে পড়ছে কেনো? ও তো এসব আগে থেকে ভাবেনি, তবু কেনো মনে হচ্ছে এসব টুকরো স্মৃতির ধুলো?

বাজার ফেরত রিকসাচালকের ছোট মেয়েটা একদিন কদম ফুলের গন্ধ দিয়েছিল, তার খোপায় কোন দিন রোদ উঠা দেখিনি, তবু তাকেই কেনো মৌনজানালার শিকে ঝুলে থাকতে দেখি? খুব শীত লাগতে শুরু করে। শরীরের ভিতর কেমন এক ভাঙা ডোঙা ভাসতে ভাসতে কোথাও ভিড়তে পারে না..মনোহর আরো দ্রুত পা চালায়।

তাঁকে মনের ভিতর হারিয়ে ফেলে বাক্যহারা হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে ও তাঁর ভাঙা ছায়া। মমির মতন দেখতে ঝাপসা আলোর কফিনে পেরেকের গান গেয়ে ওঠে যেসব দেয়ালগুলো, যেসব হাসনাহেনার শুকনো চোখের কিনারে শপিংমলের ছায়া দুলতে যেওয়ো দুলছে না, বা আড়ষ্ট দেহে যারা রোজ রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে এমনি এমনি, তাদের বুকের ভিতরকার কান্না বিদ্যুত তারে ঝুলে থাকতে দেখলে - মায়া জমা হয় নিঃসঙ্গ চেয়ারের হাতলে। ওর অস্থির অস্থির লাগে। পুরনো জ্বরের ঘোর এসে কোলে তুলে নেয়। আদর করে। জোছনা ডাঙার ভিটেতে আমগাছের তলে মাচায় বসিয়ে ডাকে, “খোকা উঠ, আর কতক্ষণ বসে থাকবি?” কালকে মেলা থেকে নিয়ে বাঁশীটা ভেঙেছে তো কি হয়েছে? আবার কিনে দেবো..”উঠ” শত বছরের ক্লান্তি আর বিবরগুহার চোয়ালে অস্পষ্ট সংকেতে সে আর ওঠে না, উঠতে পারে না। কেউ যেন তাকে আটকিয়ে রাখে পায়ে শিকল দিয়ে। শুধু মহুয়াফুলের গন্ধ টের পায় যখন তখন একটু এদিক ওদিক তাকায়, এরকম তো তার দাদা করতো শেষ বয়সে। মরার আগে। ওর ভিতর দাদার স্মৃতি চলে আসতেছে কি কারণে? ও ঠাহর করতে পারে না, শুধু রোদ আর শালিখের ডানায় তাকে দেখে আর সেদিকে পা চালায়, পথ আর ফুরোয় না..

আঙুলের সমস্ত জলাশয় শুকিয়ে কাঠ ফাটা হয়ে চিৎ হয়ে মরা চিতলের আঁশে গরুর বাছুরের বাটচুষার মতন মনে হয়। অল্প অল্প করে চোখের পাতার নিচে ভেসে আসে রিকসার ঘন্টি, ময়লার ভ্যানগুলো পাশকেটে যেতে থাকে কিন্তু গন্ধের প্রাচীর ঘিরে রাখে প্রাকৃত দেহের তাপ। উড়তে পারে না। বাজার ফেরত মানুষেরা ফেরে বাড়ির দিকে, তাদের তুবড়ানো মুখের কোণে রাজ্যের অট্টহাসি ফুটতে গিয়েও যেন ফোটে না, রাস্তায় গড়িয়ে গড়িয়ে যায়। ভাঙা কাচের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে আরো কত জনের বিরহ-গাথা, চুড়ির শব্দ..এসব ফাঁকা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছে, একটু একটু মিটি মিটি হাসির রেখা ফুটে উঠছে, ফুলবানুর চোখের তারা ভেসে উঠছে স্পষ্ট...

চারতলার পিছন দিকে গভীর রাতে কোন শব্দ হলেই, মনের মধ্যে ছ্যাৎ করে ওঠে। কড়াইয়ে তেল দিয়ে কেউ যেন কৈ মাছ ভাজতে থাকে। গন্ধে টিকে থাকা যায় না। মাটির গন্ধ বিলিন হয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্তটুকুর যে নিঃশ্বাস সেই ধরণের ক্ষণ যেন ওই সময় গা বেয়ে উঠে আসে কানের কাছে, একদম নিরবে চুপিচুপি ঘাড়ের খুব নিকটে এসে কে যেন ধীরে ধীরে রক্তের মধ্যে সূচ ফুটিয়ে রক্ত বের করে চুকচুক করে খেতে থাকে। হাত দিলেই সরে যায়।

জানালার পাশে ছায়া ঘন হয়ে ওঠে। পা একেবারে অসাড় হয়ে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। নড়ে না। কোন কথা বলতে ইচ্ছা করে না। কেউ যেন কাছে টেনে নিয়ে পিষে ফেলতে চাচ্ছে। মুখটা জোর করে আলগা করে জিভের উপর ঢেলে দিচ্ছে - সিসা..
ধুর..মিয়া রাস্তা দেইখা পার হতে পারো না..

কারা যাচ্ছে বাজারে? টাকার বউ তো আমার নাই। কোন দিন ছিল না উনুনের পাশে বসে থাকা স্মৃতি। সিন্দুকের চাবিতে যাদের মনভরা যৌবন দেখে এসেছি তাদেরকে আজ কোথায় পাবো? উলু বনের কাছে জোড় হাত করে বলবো, আমাকে ফিরিয়ে দাও মাটির বউ, শালুকের পাতায় আমার হারানো খোপার মেঘ অভিমানে চুপ হয়ে আছে, তাকে ফিরিয়ে দাও। কলপাড়ের স্নানের দৃশ্য দেখতে যেসব বালকের বয়স বেড়ে গেছে তাদের হৃদয়ে তুমি ফুলবাগানের ছায়া ঢেলে দাও। আমি সত্যি বাড়ি ফিরবো না...

যারা বাজারে যাচ্ছে, উনাদের বাজারের থলের ভিতর শুধু টাকার গন্ধ ভাসে, নগরের হাজারো গাড়ির ধোঁয়া ভাসে, কোটি মানুষের পায়ের শব্দ উড়ে উড়ে যায়, চেনা যায় না, অচেনা সব মুখের সারিরা মুখের পাশে বসতে গিয়েও বসে না, ওর টিয়ে পাখির কথা মনে পড়ে যায় - গাছের খোড়লে ছোট ছোট নীল ডিমের সাজানো সংসার মনে পড়ে, সে শুধু টাকা-গন্ধের মাতাল সুবাসে তাঁকেই মনে পড়ায়; তাঁর অবয়ব ও দেহঘরের বাঁক প্রতিমার আকৃতির ভিতর তবু সে ঢুকতে পারে না। অথচ, বিজ্ঞাপণের চরিত্ররা অনায়াসে তাঁর মন গহনের নগরের মধ্যে ঢুকে পড়ে হুড়মুড় করে, কোথাও যেন বিল্ডিং ভেঙে পড়ে, কোকাকোলার ঠাণ্ডা বোতলের স্পর্শ চিবুকের কাছে এসে রেস্ট নিতে চায়, হাসে, মন ভোলানো বেহালার তারের উপর ঝিরঝির হাওয়ার মতন কাঁপে আর এসময়ই তাঁকে খুব করে মনে পড়ে যায়। আহা! ফাঁকা মাঠ!

পাঁজরের হাড়ের কম্পনে তাঁর দহন রাঙা মুখের আভার ছায়াতল সে টের পায় রোজ মধ্য রাতের আকাশের দিকে চেয়ে। যা চেয়েছিল সে তা বিবিধ বিরহের আধারের কিনারে যেয়ে কুয়াশার মধ্যে মোমের আলোয় নিজেকে দেখবে, নিজের দেহটাকে ছড়িয়ে দিবে বাতাসের তোড়ে, কাশফুলের সুষমাকে চোখের পাতার পরে সাজিয়ে দেখবে সে খোলা আকাশের নীল রঙের মেঘমালা আর ভেসে বেড়াবে বৃষ্টিধ্বনির স্বরলিপির সাথে, এই রকম স্বাদ তাঁর হয়। মনের অধীর টানটারে গেঁথে তুলতে চায় রাস্তার পাশে বা পার্কের বেজ্ঞ্চে, কিন্তু তা সীমানার রোদে আটকে আছে বহুকাল থেকে। চেয়েছিল সে মমি হরণের রাতে হাজার বছরের হরমোনের রসে ডুবে যেতে, ভোরের সরলতার মতন সবুজ পাতার উপর বৃষ্টির ছাট হতে, পারে নাই। সে মনের মধ্যে শুধু রাতজাগা বৃষ্টির শব্দ হয়েই রয়ে গেলো... ওহ! রোদ বোঝাই দূরের টিনের চাল, তুমি কাছে আসো, কলমিলতার কাছে নিয়ে চলো...সখা..
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৭
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফটো, ছবি ব্লগ । - ১

লিখেছেন ইহা রাজু হয়, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:৩৭


ছবিগুলো হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিথলং গ্রামে যাওয়ার পথের হাওর এলাকার।

-বৃক্ষ তোমার নাম কি
-ফলে পরিচয় ।
-ঠিক আছে, ফল আসুক চিনে নিব (ফল আছে তো?) ।



একাকী জীবন ।
... ...বাকিটুকু পড়ুন

না করি ভোরের প্রত্যাশা!

লিখেছেন রমিত, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:৪৩



না করি ভোরের প্রত্যাশা!
--------- ড. রমিত আজাদ

এখনো গভীর রাতের আঁধারে
সীমাহীন নক্ষত্ররাজীর অন্তহীন প্রত্যাশা নিয়ে আমি অপেক্ষা করি,
ঘোর বরষার অবিরাম বৃষ্টির দুর্দান্ত কলরব ছাঁপিয়ে
শোনা যাবে তোমার কন্ঠস্বর, মধুর মায়াবী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফটো, ছবি ব্লগ । - ২

লিখেছেন ইহা রাজু হয়, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:৪৫

অধিকাংশ ছবিই হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিথলং গ্রামে যাওয়ার পথের হাওর এলাকার।

উপাসনালয় ।



বৃক্ষ ফসল গেল তল । এই অধম জিগায় কত জল ?



হিজল গাছ ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিস্টোরি ইন পিকচার্স (বাংলাদেশ)

লিখেছেন দূরের পথযাত্রী, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ১২:০০

ফেসবুকে লগ ইন করি শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটা পেইজ আর গ্রুপের জন্য।তাঁর মধ্যে প্রিয় একটা পেইজ 'Bangladesh Old Photo Archive"।সেখান থেকে পাওয়া ছবিগুলো বাছাই করে কিছু ঐতিহাসিক ছবি দিলাম এখানে।


... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই ২০১৫ পরিসংখ্যানঃ সামু হিট সমাচার

লিখেছেন অপু তানভীর, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ১:০৯



সবাই যেমন করে ঈদের পরপরই কাজে আসতে একটু দেরী করে কিংবা ঈদের পর কাজে কর্মে ঠিক মন বসে না, এবারের পরিসংখ্যান করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের ব্লগারদের ভেতরেও ঠিক তেমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেয়েদের ব্রেক-আপ ন্যাকামি।

লিখেছেন হেল কিচেন, ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ১:৫১

গত শনিবার উত্তরা থেকে আসার সময় বাসের(এসি বাস) পিছনের দিকে একটা সিট নিয়ে জানালার সাইডে বসে বসে বৃষ্টি দেখছিলাম। পুরা বাসটাই বলতে গেলে খালি ছিলো। আমি ৩টা সিটের জানালার সাইডে... ...বাকিটুকু পড়ুন