আমরা কারা?
২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:০৩
আমরা কারা? আমাদের সত্যিকার পরিচয় কি? আমরা কি সিরিয়াসলী কখনো তলিয়ে দেখেছি কোথায় আমাদের উৎস? না ভিনদেশীদের সারিবাদি সালসা খেয়ে চিলে কান নেবার মত কান নিল কান নিল বলে চিৎকার দিয়ে চলেছি? আসুন চোখের ঠুলি ফেলে দিয়ে একবার দেখুন ইতিহাসের পাতার গরমিল! আমাদের পিতা-প্রপিতামহের ইতিহাস অন্বেষণ করে দেখুন, হতভম্ব হয়ে যাবেন, চিন্তাধারা বাধাগ্রস্থ হবে, ইতিহাসের অনেক জোড়াতালি দেখতে পাবেন।
স্বাধীনতার এই ৩৮ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে এত টানাটানি হয়েছে যা আমাদের সব প্রাপ্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে। চেতনাকে চিহ্নিত করতে হলে আমরা কারা তা প্রথমতঃ চিহ্নিত করতে হবে, এখানে কোন গোঁজামিল দিলে চলবে না। তাই আসুন দেখি আমরা কারা?
যে ভৌগোলিক সীমা রেখায় আমাদের অবস্থান, সেই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ বদ্বীপ গাঙ্গেয় এলাকাকে বঙ্গ বলে আর এই বঙ্গ শব্দটি পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি শব্দ। বঙ থেকে বঙগ এর উৎপত্তি এর অর্থ জলাশয় অর্থাৎ নদীমাতৃক এলাকা। এই শব্দের প্রাচীনত্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছরের।
ইতিহাসের চাঞ্চল্যকর উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে কখনো বঙ্গদেশ, বঙ্গীয় এলাকা, বঙ্গ প্রদেশ, বাঙ্গাল সরকার, বাঙ্গাল মুলুক, বাঙ্গলা প্রেসিডেন্সী, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, আর এখন বাংলাদেশ।
জনগোষ্ঠীর কথা-শুরু দ্রাবিড় ও আষ্ট্রিক সভ্যতা থেকে এর পর বৌদ্ধ সভ্যতা। আমাদের এই পূর্ব বঙ্গে আর্যরা কোন সময়ে সমাদৃত হয়নি। বরং আমাদের এই জনগোষ্ঠী বহিরাগত আর্যদের বিরুদ্ধে শতাব্দী পর শতাব্দী যুদ্ধ করেছে। নবদ্বীপ কেন্দ্রীক অবাঙালী, কর্ণাটকিয়,সেন বংশের শাসনকে কিছুতে মেনে নেয়নি। আর এই সন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে মুসলিম শাসকদের আগমন, শুধু শাসক বৃন্দ নয় সাথে মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন সুফী সাধকদের আগমন হয়। যুগের পর যুগ এই শত শত সাধকদের অক্লান্ত চেষ্টায় এই অঞ্চলের গণমানুষের বিশাল অংশ সুফীদের প্রচারিত জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুফিদের এই বিরাট সাফল্যের একটাই কারণ সুফিরা তাদের মতবাদ প্রচারের সময় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও লোকাচার, স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্যকে গ্রহণ করেছিলেন বিশাল হৃদয় দিয়ে।
আর এর ফলেই পূর্ব বাংলায় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে সুফী দর্শনের সমন্বয় এবং স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাষা সাহিত্য এবং জাতিয় জীবনে তার প্রতিফলন হয়। ইংরেজদের আগমনের বহু পূর্বে বাংলার মুসলিম সুলতানরা যুগের পর যুগ যে ভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এর পাশাপাশি শতাব্দীর পর শতাব্দী শত শত সুফীদের নিরলস প্রচেষ্টায় জন্ম সূত্রে মুসলমান এবং ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে নিবিড় একাত্মতা সৃষ্টি হয় যার ফলে নয়া জাতীয়তাবাদী দর্শনের সৃষ্টি আর এখান থেকেই সূচনা হয় বাংলাদেশী জাতীয়তার।
উদার পন্থী সুফীইজমের প্রেমময় দর্শনের প্রভাবে এই নতুন জাতীয়তাবাদী দর্শন দ্রুত প্রসার লাভ করে। ফলে বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছিল। সুফীরা শিখিয়ে ছিলেন, এই দেশ এই মাটি আমার, এই ভাষা এই সাহিত্য আমার,এই লোকাচার এই সংস্কৃতি আমার, আমি এ মাটিরই সন্তান।
এর ফলে সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টে গাঙ্গেয় বদ্বীপ থেকে আর্যদের উত্তর সুরীরাই দেশ ত্যাগ করেছিলেন। একাত্তরের ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনে শরাফত খানদানী দাবিদার অবাংগালিরাও এ দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে ইসলামী করন যেমনি উচিত হবে না তেমনী মৌলবাদী করন ও উচিত হবে না।
আজকে আমরা কারা? এ প্রশ্ন করতেই বলতে হয় যে স্বাধীনতার পর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকী রয়ে গেছে। সে কাজ হচ্ছে আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছাড়াও আমরা কারা তা নির্ণয় করা। আমাদের জাতীয়তা নানা উপকরণের সমন্বয়ে গড়া, এই সম্পূরক উপকরণের কোনটাই আজ আর বর্জন করা যাবেনা, আর এই চৌহদ্দি থেকেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক বলেছেন: আপনার সাথে আমি একমত, বাংলাদেশী জাতীয়াকে যেমন অনেকে ইসলামী করে ফেলেন ঠিক তেমনি অনেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ শুনলেই মৌলবাদী বলে চিহ্নিত করে ফেলেন আসলে এর কোনটাই ঠিক নয়।
আমরা যেমন ধর্মী উৎসবাদি রীতিনীতি পালন করি ঠিক তেমনি ২১শে ফেব্রুয়ারী, বাংলা নববর্ষ, জাতীয় ও লোকজ উৎসবাদি ও পালন করি আর এইখানেই আমাদের জাতীর বৈশিষ্ট।
আমি এ বিষয়ে শুধু উপস্থাপনা করেছি তরুণ সমাজের কাছে বাকিটা ওরাই অনুসন্ধান করে জেনে নেবে বলে আমার বিশ্বাস। ধন্যবাদ।
জুলিয়ান সিদ্দিকী বলেছেন:
কথা ঠিক। কিন্তু মানতে গেলে অনেক সমস্যা। তার আগে মনে হয় আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা আসলে কী চাই? কতটুকু চাই? কখন চাই?পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: আপনাকে ও ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: এ বিষয়ে শুধু ধন্যবাদ জানালেই হবে এ লেখার বাকি টুকু তোমাদের ই বের করতে হবে। ধন্যবাদ।



















তবে একটা অংশ একটু ব্যাখ্যা করলে অনেকের সুবিধা হত। তা হল বঙ্গ অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তৃতি। বুদ্ধের আগমনের সময় থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ সনাতন হিন্দু ধর্মকের ছেড়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। এক সময় আমাদের এই বাংলাদেশ বৌদ্ধধর্মের অন্যতম শক্তিশালি ঘাটি ছিল। পরে যখন ইসলাম আসে এবং মানুষ দেখে ইসলাম আরো সহজ তখন তারা তা গ্রহণ করে। এতে প্রমানিত হয় এই অঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারা বিশ্বাস দ্বারা বদ্ধ নয়। আমরা সবসময় নতুনকে স্বাগতম জানিয়েছি। এখানেই আমাদের সাথে ঐ বাংলার পার্থক্য এবং মূলত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলতে এটাকে বুঝানো হয়। যারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বলে তাদের অনেকেই স্থুল জ্ঞানের আলোকে একে ইসলামী চেতনার সাথে এক করে ফেলে।
পূর্ব বঙ্গের এই অঞ্চলের ভৌগলিক কাঠামোও এই ক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী। তিনটা বিশাল নদী গঙ্গা, যমুনা ও ব্রম্মপুত্র পূর্ববঙ্গের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় আমাদের এই অঞ্চল বড় বড় নদী দ্বারা অনেক বেশি পৃথক। বিধায় সমগ্র পূর্ববঙ্গ ব্যাপি সামাজিক কাঠামো কখনই গড়ে ওঠে নাই। নদীর ক্রামাগত ভাঙ্গন ও নতুন অঞ্চল গড়ে ওঠা এই ব্যাপারটার জন্যও আমরা অনেকটা অস্থায়ী মানসিকতার। এর ফলে কঠোর হিন্দু ধর্ম আমাদের এই অঞ্চলে খুব একটা স্থান নিতে পারে নাই। যখনই ভাল নতুন কিছু এসেছে আমরা তা গ্রহণ করেছি। এখানেই আমরা বাংলার পশ্চিম অংশের থেকে আলাদা এবং সবাই বাঙালি হলেও আমরা কিছুটা পৃথক। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটা একেবারেই ভৌগলিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বলে আমার মনে হয় না।
যদিও অনেকেই বিরোধ করবে। বিরোধীতা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।