আজকে দুইটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। একটি সকালে। ব্যবসার ধারণা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। এই নিয়ে আগে বিস্তারিত লিখেছি। আজকে ছিল এর প্রথম রাউন্ড। ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩টি দল রেজিস্ট্রেশন করেছে। এর মধ্যে ঢাবি-র ১৪টি আর বুয়েট আর সাস্টের ৬টি করে। আমি অবশ্য প্রতিয়োগীদের কেস প্রেজেন্টেশণের সময় ছিলাম না। জাজদের দুইজন সণ্ধ্যায় বললেন বেশিরভাগই পুরাতন ধারণা। নতুন কেসের সংখ্যা কম। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে আমি বিল গেটসের গল্প বলেছি যা আমি প্রায়শ বলি। বিশেষ করে মাইক্রোসফট-এর সঙ্গে আইবিএমের প্রথম চুক্তির গল্প। বিশ্বের সেরা ১০টি চুক্তির মধ্যে এটি একটি। আমার বিবেচনায় সেটি শ্রেষ্টতম। এককালীন ১ লক্ষ ডলারের পরিবর্তে বিল আইবিএমকে প্রস্তাব করেছিলেন পিসি প্রতি ১ ডলার প্রাপ্তির। আর সেটা থেকে তিনি বিশ্বের এক নম্বর ধনী। আমার এই গল্প বলার পেছনের কারণ হলো প্রতিযোগীদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, ব্যবসাটা একটু ভিন্ন কিছু। এখানে ভাল করতে হলে উদ্ভাবণী হতে হবে আর থাকতে হবে সাহস। ১ লাখের পরিবর্তে ১ বলার জন্য সাহস লাগে। আর এই সাহসের জন্য লাগে দূরদৃষ্টি। আমি যদি ভিডিও নিয়ে যেতাম তাহলে ফকরুদ্দিন বাবুর্চির ভিডিওটা দেখাতাম। বলতাম, ফকরুদ্দিনের আগেও ভিকারুন্নিসা স্কুলে অনেক দারোয়ান ছিলেন। তাদের মধ্যে কেহ কেহ ভাল রান্না যে করতেন না তা নয়। তারপরও ফকরুদ্দিন বাবুর্চি একজনই হয়েছেন কারণ ঠিক সময়ে তিনি প্রস্তাবটা স্কুলের বড় আপাকে বলতে পেরেছিলেন। কাজে, ব্যবসা করার জন্য দরকার সাহস, দরকার উদ্ভাবনী মন, দরকার রিস্ক নেওয়ার মনোবল। প্রোডাক্টও জরুরী। তবে, আমি অন্তত: কয়েক লাখ ভাল প্রোডাক্ট-এর লিস্ট করতে পারবো যেগুলো ব্যবসায়ী উদ্যোগ যথাযথ না হওয়ায় ক্লিক করে নাই। আমাদের দেশে আমরা সবাই একবারেই সফল হতে চাই। ইতিহাস কিন্তু এর পক্ষে নয়।
আইসিটি প্রতিমন্ত্রী মহোদয় তার স্বভাবসুলভ কাব্যসুষমায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, যার অনেকখানিতে সাহসের কথা ছিল। তিনি বলেছেন কেবল টেকনিশিয়ান বা ভোক্তা হলেই হবে না, নিজেদেরও জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। বলেছেন -
“টেকনিশিয়ান চাই না হতে,
পাসটা করে কলেজ,
মুক্তিযদ্ধ গর্ব মোদের
উই উইল ক্রিয়েট নলেজ।“
একটি মজার গল্পও শুনিয়েছেন। সংক্ষেপে গল্পটা এরকম। চ্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার ভিসি ইউসুফ স্যার একবার কোলকাতায় যান। সেখানে তিনি একজন বন্ধুর কাছে জানেন যে বন্ধু একটি চোর ধরার যন্ত্র বানিয়েছে। বিজ্ঞানের এই আবিস্কারে তিনি খুবই মুগ্ধ। চট্টগ্রাম ফিরে সবাইকে তিনি এই কথাগুলো বলেন। এর মাস ছয়েক পরে কোলকাতায় যান মান্নান স্যার (চবির প্রাক্তন ভিসি)। তা ঐ যন্ত্রের কথা এতো শুনেছেন যে তিনিও একই বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে বললেন তোমার য্ন্ত্রটা দেখাওতো। ইউসুফ এতো বলে।
বন্ধু মর্ম বেদনার সঙ্গে জানালো যে, যন্ত্রটি চোর চুরি করে নিয়ে গেছে!!!!
গল্পটি দিয়ে তিনি এখনকার যেকোন বিষয়ে হালনাগাদ থাকার কথা বলেছেন। বলেছেন এখন যদি কেহ দাড়িয়ে থাকে তাহলেও সে পিছিয়ে পড়বে। কাজে জ্ঞানকে সবসময় হালনাগাদ রাখতে হবে।
সিটি ব্যাংকের বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী মামুন রশীদ একটি অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছেন। মামুন ভাই লিখেন খুব ভাল। আজকে যা একখান বলেছেন সেটা ফাটাফাটি। কিছু গল্প বলেছেন, কিছু ঘটনা বলেছেন এবং সবচেয়ে বেশি বলেছেন সম্ভাবনার কথা। বলেছেন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অনেককিছুতে ভাল। তাদেরকে ধরিয়ে দিতে পারলে তারা করে দেখিয়ে দিতে পারবে।
এই বিশ্বাস আমাদের সবারই আছে। আয়োজকরা যদি, নিয়মে থাকে, তাহলে সব প্রজেক্ট আইডিয়া ওয়েবসাইটে দিয়ে দিতে পারেন। তাহলে সবাই সেটা দেখতে পারবে। আমাদের মতো বুড়োরা সেটা দেখে বুঝতে পারবো আমাদের তরুনরা কীভাবে এগোনোর মতলব করছে।
এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে যেমন জ্ঞান তেমনি দুপুরের খাবারের সময় থেকে যাদের সঙ্গে ছিলাম তাদের উপজীব্যও ছিল জ্ঞান। তাদের কেহ কেহ এসেছে জ্ঞানগ্রাম থেকে। কেহ কেহ নিজেদের গ্রামগুলোকে জ্ঞানগ্রাম বানাতে চায়। দুপুরের পর কিছু সময় কেটেছে আমাদের গ্রাম প্রকল্পের জ্ঞানকর্মীদের সঙ্গে। বাগেরহাট , খুলনা, টুঙ্গীপাড়া, দেবিদ্বার, বাশখালী, রাঙ্গুনিয়া ইত্যাদি মোট ১০/১১টি প্রকল্প এলাকার কর্মীরা তাদের প্রকল্পের ভালমন্দ শেয়ার করে নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য দুইদিনের জন্য মিলিত হয়েছে। ঐ শেষনে আমি আর কাশফিয়া (ড. কাশফিয়া আহমেদ, প্রধান নির্বাহী, উইন ইনকোরপরেট, বাংলালিংকের ৭৬৭৬-এর জননী!) গিয়েছি আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে। রেজা ভাই (রেজা সেলিম), রাশেদ ভাইতো ছিলেন। ছিলেন কমান্ডার জলিল ভাইও। সেখানে আলোচনাটা ছিল কীভাবে তাদের কেন্দ্রগুলো টেকসই হয়ে উঠতে পারে, কীভাবে কমিউনিটিকে আরো সম্পৃক্ত করা যায় এসব বিষয়ে। ঘুরে ফিরে আসছিল ঐ জ্ঞানের কথা। উপাত্ত-তথ্য-জ্ঞান-প্রজ্ঞা - এই সিরিজে জ্ঞান পর্যন্ত টেনি নিয়ে যাওয়া যায়। বোধিস্বত্ত্বের মতো ব্যাপারটা নিজের মধ্যে ঘটে। তখন সত্যিকারের জ্ঞানী লোক হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞাবান।
কাশফিয়া জানালেন এসআরডিআই-এর একটি সফটওয়্যারের কথা যা কিনা মাটির গুনাগুন দেখে সেখানে কী ধরণের সার ইত্যাদি লাগবে তা বলে দিরে পারে। দু:খ করে বললেন সরকারের এই চমৎকার সফটওয়্যারটি সবাই ব্যবহার করতে পারে না কারণ এটি ওপেন সোর্স নয়। কাশফিয়ার মুখে ওপেন সোর্স শুনে চমকিত হয়েছি। নিজেদের অজান্তে সবাই মুক্ত দর্শনের প্রতি আকৃষ্ঠ হয়ে পড়ছে কারণ সেটাই স্বাভাবিক। একটা সময় ছিল পুরোহিতরা বইপত্র নিজেদের দখলে রেখে দিত। এখনো কেহ কেহ জ্ঞানকে কুক্ষীগত করতে চায়। জ্ঞানকর্মীরা এর বিপরীতে জ্ঞানের মশাল জ্বালাতে পারে।
আগের দিন ওরা নিজ নিজ প্রকল্পের শক্তি-দুর্বলতা-সুযোগ-ঝুঁকি বিশ্লেষন করেছে। আমাদের সঙ্গে আলাপে বের হয়ে আসলো এই কাজটি নিজ নিজ গ্রামেও করা সম্ভব। তা হলে, গ্রামেরও একটি বেসলাইন হবে। দেখা গেল, সবাই সেটি করতে রাজী হয়েছে।
আমার যেহেতু গল্প বলার অভ্যাস তাই আমি তাদেরকে যশোরের কৃষক আয়ুব ভাই-এর গল্প বলেছি। কোন একদিন তিনি এসআরডিআই অফিসে গিয়ে মাটি পরীক্ষার কথা জানতে পারেন। তখন তিনি নিজ এলাকায় তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে ব্যাপক সুফল পান।
কাশফিয়া বলেছেন কী করে তথ্যের প্রাপ্যতা মানুষের দিন বদলের হাতিয়ার হতে পারে। নিজের শিক্ষার্থীজীবনের একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় করে তিনি জ্ঞানকর্মীদের বেশি বেশি উঠোন বৈঠক, মতবিনিময় এসবের পরামর্শ দিয়েছেন।
তৃণমূলের জ্ঞানকর্মীদের সঙ্গে দেখা হলে মনটা সবসময় ভাল হয়।
আজকের দিনটি বিশেষ ভাল দিন কারণ আজকে কোন হাবিজাবি কাজ করতে হয়নি! আহা সব দিন যদি এমন হতো!!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

