কারাগারে আটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক আগামী সপ্তাহে মুক্তি পেতে পারেন এ রকম আভাস পাওয়া গেছে শিক্ষা উপদেষ্টার মন্তব্য থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক থেকে শেষে একই আভাস দিয়েছেন। এটি অবশ্যই আশার কথা। সম্ভাবনার কথা। তবু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং সর্বসাধারণ এ ধরনের আশ্বাসে যেন আশাবাদী হতে পারছেন না। এ আশাবাদী হতে না পারার কারণটি সুস্পষ্ট। বিগত কয়েক মাস যাবত আশা আর আশা ভঙ্গের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বাসের জায়গাটাকে নড়বড়ে করেছে। বিশ্বাসের নড়বড়ে সে জায়গাটা এখনও শক্ত হয়নি। শক্ত করা যায় নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক পরিবেশটা কোনভাবেই স্বাভাবিক বলা যাবে না। অনিশষ্চয়তার দোলাচল বেড়েই চলছে।
আমরা খুব আশা করেছিলাম যে, ঈদের আগে, নতুন বছরের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় সমস্যার সমাধান হবে। আটকে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মুক্তি পাবেন। কিন্ত আমাদের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার ভেতরে থেকে গেল। আলোর মুখ দেখলো না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনী প্রক্রিয়াগুলো ভাল বুঝি না। আইনের মানুষও নই। তবে যারা আইন বুঝেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মন্তব্যগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। সংবাদপত্রে তাদের মতামতগুলো পড়বার চেষ্টা করেছি। আইনবোদ্ধাদের বেশির ভাগই বলেছেন যে, সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলোর মধ্যে মামলাগুলোর প্রত্যাহরই সবত্তোম উপায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, তাদের পরিবারও সেটাই চান। তুব বুঝা যাচ্ছে না বিষয়টি কোন প্রক্রিয়ায় গিয়ে শেষ হয়।
বিগত কয়েক মাস ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর আটককৃত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদৈর নিয়ে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহের জের ধরে জনজীবনে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত, জনপথের একজন সাধারণ পথচারী হিসেবে তার যেটুকু শুনতে পেরেছি, পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি, তার আলোকে লাভ-ক্ষতির একটি সরল অংক কষবার চেষ্টা করেছি। সে সরল অংকের সমীকরণ থেকে এটি আমার কাছে মনে হয়েছে যে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হবে সরকারেরই লাভ হবে তাতে বেশি। কারণ এতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল হবে।
মুক্তির প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। পড়ালেখার পরিবেশ তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে একটি স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।
আর যদি এ মুক্তির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘতর হয় অথবা আইনী প্রক্রিয়ায় ফেলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অপরাধী প্রমাণ করা যায় তা হলে কার লাভ? কারা এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেবেন? প্রথমত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি। কারণ যারা কারারুদ্ধ আছেন, তাদের প্রত্যেকেই প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির অংশ। আর এ কারণেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলিম রেজা নিউটন এবং মামুন গ্রেফতার হওয়ার সাথে সাথে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল। সফল হয়নি। নিউটন ও মামুনের প্রগতিশীল চিন্তার সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা সবাই জানেন। সুতরাং তাদের মতো প্রগতিশীল শিক্ষক-ছাত্রদের আইনের চোখে অপরাধী প্রমাণিত করতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল চিন্তার জায়গাটাই দূর্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, এবং তা অব্যাহত থাকলে, ঢাকা সহ দেশের আনাচে-কানাচে উচ্চ শিক্ষার নামে গড়ে উঠা শিক্ষা বেনিয়াদের বাণিজ্যটা আরও প্রসারিত হতে পারবে। এ সুযোগে তারা অনেক বেশি শিক্ষার্থী পাবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিবেশটাকে পুঁজি করা যাবে। সে পুঁজির হাত ধরে শিক্ষা বাণিজ্যের দোকানগুলো আরও গড়ে উঠতে পারবে।
চুড়ান্তভাবে ক্ষতিটা হবে আমাদের সকলের। ক্ষতি হবে নিম্নব্ত্তি ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর। ক্ষতি হবে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে ফিরে যাবার যে চেষ্টা চলছে তার। আমরা আবার প্রত্যাশা করছি এবং বিনীত অনুরোধ করছি সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেয়া হোক। খুব তাড়াতাড়ি। এতে মূল বাহবাহটা সরকারই পাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

