somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক্স বসের ভালবাসার ধরন আর পদ্ধতিসমূহ ঠিক আগের মতোই আছে, এতটুকুন বদলায় নি

২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বার বার সেল ফোনটা বেজে ওঠার শব্দে এক আকাশ-সম বিরক্তি নিয়ে কলটা রিসিভ করি এবং সূচনা বাতচিতেই বুঝতে পারি ওপাশের নারী কণ্ঠটি আমার সাবেক বসের। একটানা দু'বছর যার 'কর্ম-কাবিননামার' সূত্রে আমি তার কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের একটিতে প্রধান কামলা ছিলাম (এক ঝাক তরুন সেবাদাসের টিম লীডার, প্রধান সেবাদাসও বলা যায় )। ওখানে কামলাগিরীটা ছেড়ে দিয়েছি বছর খানিক আগে। অনেকটা 'অর্ধেক কল্পনা আর অর্ধেক বাস্তব' এর একটি আপাত অনতিক্রম্য লজিক দাঁড় করিয়ে। লজিকটা ছিল নিতান্তই শারিরীক। আর শরীর বলে কথা। তাও কামলার। 'কাম' এর বিনিময়ে (আদি রসাত্বক অর্থে নয়) যে জীবন চালায়। যার সংসার চলে। আবার কামলার শরীর ঠিক না থাকলে বসেরও ঠিক থাকে না। না শরীর না মন। হয়তো সে কারণেই শরীর বিষয়ক যুক্তিটা বস অগত্যা মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু মনে নেন নি। মানতে পারেন নি আমার হঠাৎ করে ওভাবে চলে আসাটা, ছেড়ে আসাটাও। আমি যে আর ফিরে যাবো না সে ভালবাসার রাজ্যে এটাও বোধ হয় প্রথমে বুঝতে পারেন নি। যখন পেরেছেন তখন আমি অন্য মেরুতে। নতুন সংসার সাজিয়েছি নতুন সেবাদাসদের সাথে...।

টেলিসংলাপে ভাল থাকা-মন্দ থাকার খোঁজখবর নেয়া প্রচলিত সাংস্কৃতিক সৌজন্যতা। দীর্ঘ বিরতির পর পুরনো সম্পর্কের একজন ফোন করেছেন। যিনি একসময়কার বস। অতএব সে সৌজন্যতা রক্ষা করাটা আমিও নিজের জন্য ওয়াজিব নয়, রীতিমত ফরজ মনে করি। কেমন আছেন, কর্তব্য জ্ঞানে জানতে চাই। এক লাখ পর্বত সম অভিযোগ-অনুযোগ এর মিশেলে বসের ঐতিহাসিক ঠোটকাটা উত্তর-ভাল থাকি কী করে, আমার দীর্ঘ জীবনে ছ্যাকা খাওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এক তুমি ছাড়া। বসের কথা সত্য হলে এটি স্পষ্ট যে, ছ্যাকাদানকারী হিসেবে আমার স্টাটাসটা উদ্বোধক এর। নিজের কামলাময় জীবনের দৌড় থেকে এটি নিশ্চিত যে, আমার মতো নগণ্য মানুষের কোনদিনই কোন পুজা-পার্বন-উৎসব-মহোৎসব এর উদ্বোধক হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অতবএব উদ্বোধক ছ্যাকাদানকারী হিসেবে আমার শ্রেণী উত্তরণটা না হোক, গোষ্ঠী উত্তরণটাতো হয়েছে। মনে মনে বলি-দুনিয়ার ছ্যাকাবাজ এক হও অথবা মার্ক্সের কথাটাকে একটু ঘুরিয়ে-ছ্যাকাদানকারীদের হারাবার কিছু নেই, এক প্রেমের শৃঙ্খল ছাড়া। শ্রেণীর প্রশ্নে বসের বিচরণ আকাশে আর আমি পাতালে। সুতরাং পাতালের মানুষটি আকাশের মানুষটির মন ছুঁয়েছে, পাতালের মানুষটির অনুপুস্থিতি আকাশের মানুষটির মনে বেদনা জাগায়, তার ভাবনার আকাশটাকে মাঝে মাঝে নীল করে তোলে, মেহনতী মানুষের এ সাফল্যটাকে মনে মনে সেলিব্রেট করি।

দীর্ঘ দশমিনিটের বাতচিতের একটি পয়েন্ট অব একশন হচ্ছে আমি যেন পরদিন তার সাথে দেখা করি। সেই-ই অফিসটিতে। যেখানে আমার দু’বছরের অনেক টুকরো টুকরো বেদনা জমা হয়ে আছে। জমা হয়ে আছে নিজের কিছু সৃষ্টিও। বছর খানিক আগেও যেখানে আমার বিচরণ ছিল। সপ্তাহে কমপক্ষে ছয়দিন। সকাল থেকে রাত অবধি। মনে পড়ে ঐ অফিসে আমার শেষ দিনটিতেও বসের ভালবাসার খবরদারি অথবা বন্ধনে আটকা ছিলাম রাত দশটা অবধি। যখন বাসায় ফিরি তখন আশপাশের কেউ জেগে নেই। পেশাদার এক ডজন দারোয়ান আর কুকুরগুলো ছাড়া। রাতের পাহারায় যাদের ঐতিহাসিক সহ-অবস্থান। একদল মাস শেষে মাইনে পান। কোন মতে বেঁচে থাকার মতো। অন্যদলের ভাগে জুটে ইন-কাইন্ড হিসেবে খাবারের উচ্ছিষ্ট।
দীর্ঘ বিরতির পর বসের ফোন কিন্তু অফারটা লোভনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময় থেকে এ রকম লোভে লোভাতুর হয়ে আকণ্ঠ নিমজ্জনের ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে। অনেকবার। ঐ সময় খ্যাপা হিসেবে নাম-দূর্নামও কুড়িয়েছিলাম। পড়া শেষে (আসলে একখান সার্টিফিকেট পেয়ে) চাকরের জীবন শুরু করার পর সে অভ্যাসটা কমেনি। বরং বেড়েছে। কখনও শখে আবার কখনও বাড়তি আয়ের আশায়। বাংলাদেশের ক্রমাগত মূল্যস্ফীতিতে নাভিশ্বাস হয়ে ওঠার এ সময়ে মাত্র দশ থেকে পনের দিন সময় দিতে হবে। তাও দিন-রাতের কোন একটি সময় বরাদ্দ করলে চলবে। পারফরমেন্স সন্তোষজনক হলে যা পাবো তা হাজারের হিসবে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। শরীরের ওপর দিয়ে না হয় একটা বাড়তি প্রেসার যাবে। যাক, তাতে কি। টাকাটাতো আর কম নয়। আমি রাজি হয়ে যাই। এবং যথারীতি পরদিন দেখা করি...........পুরনো সে ভালবাসার রাজ্যে। যেখান থেকে আমি একদিন পালিয়ে এসেছিলাম। ভালবাসাটা সহ্য হয়নি বলে।

পরদিন থেকে খ্যাপের নেশায় উন্মত্ত হই। শুরু হয় আমার পনের দিনের খ্যাপ-মিশন। কাজটা কি ? চুপি চুপি বলি। প্রকল্প সাহিত্য রচনা। গোটা ৫০ থেকে ষাট পৃষ্টার একটি ডকুমেন্ট। বাংলাদেশে বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি অধিপরামর্শেভিত্তিক কার্যক্রম। তার ওপর একটি প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করতে হবে। প্রকল্পটি সাবমিট করা হবে বাইরের একটি দাতা সংস্থায়। পুরনো অফিসে নতুন খ্যাপে নিমগ্নতার মধ্যেই হাতড়ে বেড়াই পুরনো ভালবাসার স্মৃতিগুলো। যেটি মাড়িয়ে এসেছি বলে বস ছ্যাকাদানকারী হিসেবে অভিযোগ তুলেছেন। দ্বিতীয় দিন দেখি বস রিসিপশনের কর্মনিষ্ঠ আমার সাবেক সহকর্মীকে বলেন, কাল থেকে তোমার আসার দরকার নেই, আমি তোমাকে রাখবো না, সাথে চিৎকার- চেঁছামেছি। সে পুরনো কায়দায়। এ সব দেখতেই স্মৃতির অডিও থেকে বেজে উঠে বসের ভালবাসার অভিধানের আরও কিছু শব্দমালা যেমন, চড়াই দাঁত ফেলে দিব (সাফোর্ট স্টাফদের জন্য), বেতন কাটবো..ছাটাই করবো ( মধ্য পর্যায়ের শ্রম দাসদের জন্য) আরও কিছু উচ্চারণ অযোগ্য শব্দরাজি। তারপর দিন ঠিক ঠিক একজনকে ছাটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন বস। সাথে তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্দার। আক্ষরিক অর্থে।
আমার খ্যাপ মিশনের শেষ পাঁচ দিনে তিনজন পুরনো সহকর্মীকে প্রতিদিন অন্তত অতিরিক্তত চার ঘন্টা কাজ করতে দেখি। সে হিসেবে পাঁচ দিনে তাদের অতিরিক্ত সময়দানের পরিমাণ ৬০ ঘন্টা। যা একজন চাকরিজীবির দৈনিক আট ঘন্টা কর্ম সময় হিসেবে সাড়ে সাত দিনের সমান। যার অর্থনৈতিক মূল্য সর্বশেষ নির্ধারিত ন্যুনতম মজুরি হিসেবে বাংলাদেশের গার্মেন্স শিল্পে কর্মরত তিনজন শ্রমিকের এক মাসের বেতনের সমান। অতিরক্তি সময় কাজে যুক্ত রেখে বস এ টাকাটা লুন্ঠন করেছেন মাত্র পাঁচ দিনে। সারা বছরের হিসেবটা আর নাই বা করলাম।
সব দেখে আমি আবারও নিশ্চিত হই যে বসের ভালবাসার পদ্ধতি ও ধরন কোনটাই পাল্টাইনি। আগের মতোই আছে। উৎপাদন এর উপায় ও উপকরণের মালিকানা হাতে থাকার সুবাধে বাংলাদেশের সামন্ততান্ত্রিক (এরা প্রফিট লুন্ঠনে পুঁজিবাদী আর আচরণে সামন্ততান্ত্রিক) বসদের কখনও পাল্টাতে নেই। পাল্টাতে হয় না। কেবল কামলারা ধৈর্যশক্তি হারিয়ে কামত্যাগ করলে ’ছ্যাকাদানের’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এটাই হয়তো কামলার জীবন চক্র। যে চক্রের শুরু আছে, শেষ নেই। জয়তু বস। বসের ভালবাসা।


সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ: এটি কেবলই উর্বর মস্তিষ্কে একটি পাতানো গল্প। কোন নর-নারীর জীবনের সাথে মিলে গেলে ভাববেন কাকতালীয়। তার জন্য কেউ দায়ী নয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:৪১
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×