somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আমাদের কন্যার কন্যা হয়ে উঠার ভয় ও সাংস্কৃতিক পুরুষতন্ত্রের ভূমিকা

১১ ই অক্টোবর, ২০০৯ দুপুর ২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
কন্যাশিশু দিবসের ঠিক আগের রাতেই আমাদের একমাত্র কন্যাটি অবাক করে বলে উঠে, আমি ছেলে হলেই ভাল হতো। ওর বয়স কতো হবে। মাত্র ছয়। এ কয়েক বছরের জীবনকালে ওকে কখনও এ রকম মন্তব্য করতে দেখিনি। বরং মেয়ে হওয়ার কারণে ওর অনেক গর্ব। অনেক তৃপ্তি। অনেক উচ্ছাস। এ উচ্ছাস শুধু নিজের ভেতরে নয়, অনায়াসে সে অন্যদেরও বলে বেড়ায়। ওর ছোট্র মনের গভীর প্রকাশে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠার অপার সম্ভাবনাগুলোই ভেসে উঠে। ওর এ আত্ম-বিশ্বাস আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা অভিভূত হই। আর সে মেয়ে কিনা বলে- ছেলে হলেই ভাল হতো! শুনে আমি হেসে উঠি। অবাকও হই। আমার কৌতুহল বাড়ে। সাথে আতংকও । কেন কি হয়েছে, আমি জিজ্ঞেস করি। ওর সরল উত্তর। মেয়েদের অনেক বেশি কাজ করতে হয়। মৃন্ময়কে অত বেশি কাজ কাজ করতে হবে না। কিন্তু আমাকে করতে হবে। মৃন্ময় তার মামাতো ভাই। মৃন্ময় চাইলে বাসার বাইরে যেতে পারবে। আমি পারবো না। ওর অল্প বয়সের ছোট্র পর্যবেক্ষণে যেন আপাত এক গভীর সত্যের প্রতিফলন। এ সত্য প্রাকৃতিক নয়, সামাজিক। চাইলে এ সত্যটাকে মিথ্য করে দেয়া যায়। টুকরো টুকরো করে দেয়া যায়। তবু তা টিকে থাকে। ব্যবস্থার জোরে। বহুবছর ধরে বাঙ্গালী পুরুষতন্ত্র ধর্ম ও আচারের মিশেলে নারীর জন্য যে ব্যবস্থাটি তৈরি করেছে, সেটি যে ন্যায্য নয় একটি শিশুর সরল পর্যবেক্ষণে তা ফুটে উঠে। তার এ তাৎক্ষণিক পাঠ করবার ক্ষমতা নিয়ে হয়তো গৌরব করা যায়। কিন্তু সে পাঠ থেকে যে আতংকের জন্ম সেটি তো কিছুতেই গৌরবের হতে পারে না। তবু এ সমাজ এ অগৌরবের বিষয় মহাযতনে সৃজন-পুনসৃজন করে। টিকিয়ে রাখে বংশপরস্পরায়।

২.
আমি ভাবি, ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হই। অল্প বয়সী শিশুর সরল অনুসিদ্ধান্ত আমাকে নাড়ায়। ভীষণভাবে। আমারও মনে হতে থাকে সম্ভবত ওর জগতটা ছোট হয়ে আসছে। একটু একটু করে। আমরা চাই বা না চাই, যে ব্যবস্থার ভেতরে ওর বেড়ে উঠা, চলাচল, সেখানে ওর জগৎটি যে মুক্ত নয়, অনেক সীমাবদ্ধ, তা অস্বীকার করি কি করে! খুব মনে পড়ে প্রথম নিজে খেলনা কিনতে গিয়ে ও পছন্দ করেছিল দোকানের সব চেয়ে বড় ফুটবলটি। সে ফটবলটি কিনেও ছিল। ফুটবল একটি নিতান্ত খেলার বস্তু নয়। এটি উচ্ছাস, গতিশীল, উদ্যাম ও স্বাধীন জীবনের প্রতিকীও। ফুটবল খেলা মানে ঘরের ভেতরের নয়, বাইরের মুক্ত জীবন। ছুটোছুটি, হৈচৈ করার অপার স্বাধীনতাও। প্রথম খেলনা হিসেবে ওর ফুটবল পছন্দ করাতে মনে মনে খুশী খুশী হয়েছিলাম। অথচ ফুটবল খেলা সে মেয়েটিই এখন শংকিত! চিন্তিত।

কারণ ও ইতোমধ্যে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। খেলতে শুরু করেছে বাইরের বন্ধুদের সাথে। প্রতিবেশিদের সাথে একটু আধুটু যোগাযোগও হয়। নাটক, সিনেমা, গান, সংবাদপত্রেও মাঝে মাঝে ওর চোখ পড়ে। কিছু বুঝে, আবার কিছু বুঝে না। কিন্তু এ বুঝা না বুঝার মধ্যেও ওর কাছে এ সংবাদটি পৌছে গেছে। ও বুঝে গেছে, ওর জন্ম এমন এক সমাজে, যেখানে নারীর গতিশীলতা অনেক সীমিত। নারীকে বাড়তি কাজ করতে হয়। এ ছোট্র অথব ভয়াবহ তথ্যটি সে হয়তো পেয়েছে তার বিদ্যালয়, বন্ধু, প্রতিবেশি, অথবা নাটক, সিনেমার গল্প থেকে। সাংস্কৃতিক পুরুষতন্ত্র যেভাবে তৈরি করে তার উপযোগী নারী। খুব ছোট্র বয়স থেকে। হাসিখুশি উচ্ছল শিশুরা মানুষ থেকে নারী হয়ে উঠে। আর হারায় তাদের স্বাধীন সত্ত্বা।

৩.
জাতীয় কন্যা শিশু দিবস এর সংবাদ পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে। এটি নিশ্চই মেয়েদের বিদ্যামন প্রান্তিকতার অবসান দূর করার প্রয়োজনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এ ইতিবাচক স্বীকৃতিকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু পুরুষতন্ত্রকে শক্তিশালী করবার যে সাংস্কৃতিক আয়োজন, এখানে-সেখানে, নাটক, সিনেমা, গল্প, সাহিত্য, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ধর্মের মাধ্যমে, সে প্রক্রিয়াগুলো টিকিয়ে রেখে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস কতটা কার্যকর হবে? কবে, কখন কীভাবে??
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:০৭
২৫টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×