মাননীয় ভিসি
আরও একটি লাশ পড়লো। মাত্র কিছুক্ষণ আগে। পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বর্তমানে আপনি যার আনুষ্ঠানিক অভিভাবক। আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক গানিতিক হিসেবে একটি লাশ বড় কোন সংখ্যা নয়। উল্লেখ করার মতো তো নয়ই। শত-হাজার-লাখ- কোটি মানুষ, দলীয় সমর্থক-কর্মী অথবা শিক্ষার্থীর ভীড়ে তাই হয়তো একজন আবু বকর এর কোন গুরুত্ব নেই। আবু বকরের অস্বাভাবিক অপ্রত্যাশিত মৃত্যু সময়ের পরিক্রমায় আরও অনেক ঘটনার মতো ভুলে যাওয়ার উপযোগী একটি ঘটনা। কিন্তু যে মা তার আপন ছেলেকে আলোর খোঁজে পাঠিয়েছিল আলোকিত বিদ্যাপীঠে, যে বাবা স্বপ্ন দেখেছিল ছেলে তার মানুষ হয়ে ঘরে ফিরবে, পাঠ শেষে আত্মনির্ভরশীল হবে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে পরিবারের-সমাজের পাশে এসে দাঁড়বে, যে বাবা-মা তার প্রিয় সন্তান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীটে পড়ে বলে গৌরবের হাসিতে বুক ফুলাতো, সে মা-বাবা আত্বীয়-স্বজনরা কোথায় শান্তনা খুঁজে পাবে? কী বলে নিজেদের বুঝাবে? আবু বকরের মা-বাবা-প্রিয়জনদের বুকের ক্ষত কোন দিন কি দূর হবে? তারা কি কোন দিন ভুলতে পারবে তাদের প্রিয় সন্তান, প্রিয় মানুষটির ভুল রাজনীতির ভুল শিকার হয়ে এভাবে চলে যাওয়া?
একজন আবুবকরের মৃত্যুতে আজ হয়তো রুটিন মতো কয়েকটি বিবৃতি আসবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় প্রেসনোট দিবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রেসরিলিজ দিবে। সাংবাদিক সম্মেলন করবে। ছাত্রলীগ তার দায় অস্বীকার করবে। আর ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিশেষ করে ছাত্রদলও সক্রিয় হয়ে উঠবে। সুযোগ নেবে। লাশ নিয়ে জমে উঠবে লাশের রাজনীতি। শিক্ষক রাজনীতির সাদা-গোলাপী-নীল রঙের বাহারীপনায় আরও একটু রঙ লাগবে। আমরাও রঙিন বিবৃতি পাবো, পড়বো এবং আশা-নিরাশায় দুলতে থাকবো। অতীতের মতো। আর আমাদের প্রিয় সন্তান, ভাই-বোন-অনুজদের তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে লাশ হয়ে পড়ার আশংকা আরও বিস্তৃত হবে!
মাননীয় ভিসি
আপনি আমার প্রিয় মানুষদের একজন। নিরবে-নিভৃতে-অনেক দুর থেকে আমি যে কয়জন মানুষকে শ্রদ্ধা করি আপনি তাদের অন্যতম। আমি বিশ্বাস করি, এ বিদ্যাপীঠের অভিভাবক হিসেবে যেকোন বাবার প্রিয় সন্তান হারানোর মতো আপনার বুকও ডুকরে কেঁদে উঠছে। একবার নয়, বারবার। আমি বিশ্বাস করতে চাই আপনার অবস্থা একজন অভিভাবক এর চেয়েও কঠিন। একদিকে প্রিয় শিক্ষার্থীর লাশ, উদ্ভুত পরিস্থিতি, তার রাজনৈতিক অপব্যবহারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আপনার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান, সব মিলে সত্যি সত্যি এ এক কঠিন সময় আপনার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য। তবু আমরা আপনার কাছ থেকে দেখতে চাই কালোকে কালো এবং সাদাকে সাদা বলার সৎ সাহস। যা আপনার অগ্রজ সহকর্মীরা, সাবেক ভিসিরা করে দেখাতে পারে নি শুধু দলীয় দায়বদ্ধতার কারণে। আমরা আশা করি, যেসব ছাত্রলীগ কর্মীরা সেদিন মধ্যরাতে শান্তপ্রিয় শিক্ষার্থীদের ঘুমভাঙিয়ে চরদখল স্টাইলে সিট দখলে মত্ত হয়ে উঠেছিল, যার ধারাবাহিকতায় আবুবকরকে জীবন দিতে হলো, তাদের ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে নয়, আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অযোগ্য শিক্ষার্থী, অপরাধী-সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করবেন। তাদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবার জন্য নিজেই উদ্যোগী হবেন। নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক দাসত্বের জন্য আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-শিবিরের সন্ত্রাসের কাছে বন্দী হয়ে থাকবে, অনাগতকাল ধরে, এটি মেনে নেয়া যায় না।
প্রিয় আরেফিন স্যার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিয়ে আজ প্রমাণ করুন আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়, এর প্রশাসন, অভিভাবকরা কোন রাজনৈতিক দাসত্ব মানে না।
আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে আমরা আর কোন লাশ দেখতে চাই না।
আমরা আর কোন অকাল মৃত্যু দেখতে চাই না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


