আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা যে দলের হোন না কেন, যে অঞ্চলের মানুষ হন না কেন, তাদের একাডেমিক ব্যকগ্রাউন্ড যাই থাকুক না কেন, সাবেক সামরিক-বেসমামরিক এ দু'য়ের মধ্য থেকে যে ঘরানার আমলা হন না কেন, রাজনীতির ময়দানে লড়াই-সংগ্রাম করে তিলতিল করে গড়ে তোলা তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার হোক না কেন, অথবা তারা নারী কিংবা পুরুষ যাই হোন না কেন কিচ্চু যায় আসে না। বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, রাজনৈতিক দল এমনকি সময়-কাল, কোন ভিন্নতাই তাদের মধ্যে ভিন্নতা তৈরি করতে পারে না। দলমত ও মতাদর্শ নির্বিশেষে সাদৃশ্যপূর্ণ আচরণ প্রকাশের এক সফল উদাহরণ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা। একই তাল, লয়, সুরে তারা বক্তৃতা দেন। বিবৃতি দেন। বুঝিবা কোন এক চিরায়ত সুর স্রষ্ঠা স্বরলিপিগুলো তৈরি করে গেছেন। এখন কেবল সে একই স্বরলিপিতে গান গেয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে কথার বদল। প্রতিপক্ষকের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়া অথবা নিজের দায় মুক্তির জন্য যতটা দরকার ঠিক ততখানি। কিন্তু সুরের বদল নয়। অথবা একই কথা একই সুরে গেয়ে যাওয়া। পুরনো গানের রিমিক্সের মতো। আমার বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যারা সরকারি আমলা আছেন, কর্মচারী আছেন, একদা তারা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়েছেন, কষ্ট করে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পেয়েছেন, এখন যাদের কাজ বক্তৃতা বিবৃতি তৈরি করা, এতে তারা অনেক আরামে আছেন। আয়েশে আছেন। কম্পিউটার মানে ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সুবাধে তাদের এ আরাম-আয়েশ আরও বেড়েছে। এখন হাতে বিবৃতি তৈরি করতে হয় না। এমএসওয়ার্ডের নির্দিষ্ট ফাইলে কপি-পেস্ট করলেই হলো। শুধু কিছু নাম, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও চরিত্রের পরিবর্তন করে দিলেই কর্তব্য খালাস।
এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে। এমন একটা প্রচার খুব জোরেশোরে আছে। প্রচারটা তৈরি হয়েছে, ডালপালা গজিয়েছে হয়তো গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী মানুষের নিরন্তর প্রত্যাশা থেকে। আকাঙ্খা থেকে। কিন্তু সে আকাঙ্খার মুখে ছাই দিয়ে গণতন্ত্রের শামুকটা মুখ লুকিয়ে আছে কেবল রুটিন মাফিক নির্বাচনের মধ্যে। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হয়। জনগণ বিপুল প্রত্যাশা আর উদ্দীপনা নিয়ে ভোটে ঝাপিয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত প্রবল রাজনৈতিক দ্বিমেরুকরণ প্রক্রিয়ায় জনগণ একবার এ দলকে বেছে নেয়। পরের বার অন্যদলকে। তারপর আবার আগের দলকে। প্রতিবার সরকারি দল পরিবর্তনের পথ ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদটিতে নতুন ব্যক্তি আসেন। নতুন চেহারার মানুষ আসেন। কিন্তু কাজে কর্মে কোন নতুনত্ব আসে না। জনসন্তুষ্টির কোন কার্য-কারণ তৈরি হয় না। নব্বইয়ের গনআন্দলনে সূচিত বিজয়ের পথ ধরে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আজ অবধি যতজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই যেকোন রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, ক্যাম্পাস সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মুহুর্তে গণমাধ্যমের কাছে বিবৃতি দিয়েছেন। কখনও স্বপ্রণোদিত হয়ে আবার কখনও চাপে পড়ে। গণমাধ্যমের যাচিত-অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে। কিন্তু সেসব বিবৃতি সাধারণ মানুষ আস্থার সাথে নিয়েছে, বিশ্বাস করেছে বলে আমাদের জানা নেই। আমাদের কোন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোন নাজুক উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য দায়িত্ব শিকার করেছেন, অনায়াসে নিজের ব্যর্থতার কথা বলে সত্যের প্রতি অঙ্গীকারদ্ধ ছিলেন এমন উদাহরণও খুঁজে পেতে গবেষণা প্রকল্পের দরকার পড়বে। বরং উল্টো প্রত্যেকেই দাবি করেছেন যে, তার সময়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব চেয়ে ভাল আছে। অথবা ভাল ছিল। এখন যদি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতিগুলো একসাথ করে একটি আধেয় বিশ্লেষণ করা হয় (কন্টেন্ট এনালাইসিস), তাতে কেবল কন্ঠের ভিন্নতা ছাড়া আর কোন ভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রায় সকল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার পদ হারাবার আগে সবচেয়ে বেশি অসংলগ্ন বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। নিজের কল্পিত সাফল্যের একতারায় সুর তুলেছেন। দলমত নির্বিশেষে ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির ঐকতার সূত্র সম্ভতত এখানেই। এ সূত্রের সীমা রেখায় যিনি পড়েন তিনিই বদলে যান। অথবা আগে থেকেই বদলে থাকেন। সে বদলে যাওয়ার প্রয়োগিক রূপটাই কেবল আমরা দেখতে পাই। আর হতাশ হই। এবং হতাশ হই। এবং হতাশ হতেই থাকি।
নাগরিক প্রেসনোট-১: লাশের গাণিতিক হিসাবই এখন পারফরেন্স সূচক অথবা পরিণত মৃত্যুই যেন একটি দুর্ঘটনা !!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


