স্কুলে আসতে হতো দুই কিলো কাঁচাপথ পায়ে হেঁটে। বনেবাদাড়ে বেড়ে ওঠা গেঁয়োছেলের পক্ষে দুই কিলো পথ হাঁটবার নিমিত্তে কোনো পথই নয়। ওই বয়সে রোদবৃষ্টিও খুব একটা আমলে নিতাম বলে স্মরণ করতে পারি না। যেকোনোভাবে স্কুলে পৌঁছবার একটা মহাতৎপরতা ছিল। স্কুলে যে বান্ধবকুলকে বাগে পেয়েছিলাম, একদিন না-এলে ওদের জন্য বিরহদগ্ধতা বোধ হতো। বৃষ্টির দিনে পিছল পথে বইপত্র নিয়ে আছাড় খেয়ে ওঠবার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই ছিল। তবু ন-পরোয়া। ওরকম হলে বরং বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফুটবলকে ঘিরে মাঠে মেতে থাকবার সুযোগ তৈরি হতো। তাই বৃষ্টির কারণে স্কুলে না-এসে ঘরে বসে থাকা ছিল দারুণ এক ক্ষতিকেই স্বীকার করে নেয়া। এরকম মানসদেশকাঠামোয় এক আশ্বিন শেষে দাদু জানান দিয়েছিলেন, আইতান-কাইতানের কথা। নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, এরকম দিনে স্কুলে যাবার দরকার নেই। আইতান-কাইতান কী দাদু ? 'ওরা দু'জন অনাথ ছেলেমেয়ে, ভাইবোন। কাইতান মেয়েটা নিরীহ, ধরে নিয়ে গেছে দস্যুরা। ওর কান্নাই তো ঝরছে পুরো আশ্বিন জুড়ে। আর আইতান খুব রাগী ছেলে। বোনকে দিনের পর দিন খুঁজে ফিরছে পথেঘাটে। গত ক'দিন থেকে যে ঝড়বাতাস দেখছিস ওটা ওরই যাতায়াতের ফল।' আমরা ওদের দেখি না তো ? 'আমরা কি ভূত-প্রেতও দেখি ? দেখি না। কিন্তু বাগে পেলে তো ওরা ঘাড়টা ঠিকই ভেঙে দেয়।' অন্য কোনো কারণে নয়, ঠিক এই ঘাড়ভাঙার ভয়ে সেবার আশ্বিনশেষ-কার্তিকশুরুতে বেশ কদিন স্কুলে অনুপস্থিত থেকে আইতান-কাইতানকে অনেক ভেবে উঠেছিলাম। নিজের ছোট বোনকে কাইতান ভেবে কল্পিত অপহরণকারীদের প্রতি এমন ক্ষ্যাপামো তৈরি হয়েছিল যে মনে হয়েছিল আইতানকে একবার সত্যি সত্যি দেখতে পেলে ওর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাইতানকে উদ্ধার করে আনবই এবং অপহরণকারীদের দেব ভয়ানক এক শিক্ষা!
আশ্বিন-কার্তিকের গ্রামপথগুলো অনাথ কাইতান বালিকার ক্রন্দনে আজো প্রতিবারই সিক্ত হয়ে ওঠে, ক্ষ্যাপা বালক আইতানের ক্ষ্যাপামোতে চুরমার হয়ে যায় অনেক ঘরবাড়ি, গাছপালা। অপহৃত বোনকে অন্বেষণ তার ফুরায় নি আজো। এই খোঁজাখুঁজি তার কতদিন ধরে চলবে গো! বুড্ডিস্ট মঙ্কেরা কি জানেন, যারা গোটা 'ভাস্যা'জুড়ে বাড়ি বাড়ি দান আহরণ করে ফিরেন, প্রার্থনার অংশ হিসেবে ?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


