somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লতা বাওয়ার কাজবাজ প্রায়শই জাদু বাস্তবিক হয়ে যেতে চায়

২৪ শে অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'ম্যাজিক রিয়ালিজম, ও হ্যাঁ, বাংলায় যাকে বলে জাদু বাস্তবতা, এটি হলো কল্পগল্পকে সত্যস্বত্বের পোশাক পরানো, সত্যের মতো দেখতে-শুনতে সত্যোপম সব আখ্যান বানানো। জানো, নামবন্ধটি প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান শিল্প সমালোচক ফ্রাঙ্ক রোহ, উনিশ শ' বিশ-এ। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে আছে ও ছিল, ছিল অন্য বহু স্থানে এবং কালেও। আলেহো কার্পেন্তিয়ার--- কিউবার, চল্লিশে জানান দেন যে, অধিকাংশ লাতিন আমেরিকান সাহিত্যেরই এটি মৌলিক চারিত্র্য।' ছোট্ট একটা আড়মোড়া ভেঙে ও বলে, 'কলাম্বিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চিলির ফিকশনে ওটার ঠাসবুনোট লক্ষণীয়, চাও তো বলতে পার, মাখামাখি।'

টিভিতে তখন মূর্ছিত সেতার

'তোমার জানা আছে যে, ম্যাজিক রিয়ালিজম কোনো শিল্পান্দোলন বা দর্শন নয়, একটা অ্যাখ্যান-ঘরানা মাত্র। মার্কোয়েজ, আমাদো, বোর্হেস, কার্তেজার, আলেন্দে... (এরপরই নিজের নাম বলতে ইচ্ছে করে পাখিটার) ম্যাজিক রিয়ালিজমের একেকজন মহান স্রষ্টা।' একটু পাখা ঝাপটিয়ে বলে যে, 'মার্কোয়েজ বিশ শতকের অমর সাহিত্যস্রষ্টাদের একজন। মিস্ত্রাল, নেরুদা, আস্তুবিয়াস ও বোর্হেসের পর তিনি চতুর্থ লাতিন আমেরিকান শিল্পতারকা।'

স্বকণ্ঠনিঃসৃত 'মাখামাখি' শব্দটা তিতলি পাখির মাথা থেকে কিছুতেই সরছে না, যদিও পরে অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। শব্দটির গন্ধে আনমনা হয়ে যায় ও, উড়ে এসে লতার নিকট জুড়ে বসে, নড়ে ওঠে তরু বল্লরী বীথি। অবসন্ন দেখায় পাখিটাকে। বলে, 'শোনো, মার্কোয়েজের কারুগদ্যের মডেল ছিলেন দু'জন--- ফকনার ও হেমিংওয়ে, উত্তর আমেরিকান মহাজন।'

ইত্যবসরে তিতলি পাখির ভিতরে কিছু একটা বদল ঘটে গেছে, তার হয়ত কোনো প্রকাশও ছিল, টের পেয়ে যায় লতা। সহজাত আগ্রহ জাগে তার মধ্যে, দেখে, পাখির চোখ চকচক করে উঠছে। নেতিয়ে পড়ে ও আরো। এক ফোঁটা কুয়াশার ভারও যেন আর বইতে পারছে না, এমন লাগে ওকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিতান্ত অনিচ্ছা থেকে ও বলে, 'মার্কোয়েজ বলেন...'

তবলায় তিন তাল, জাকির হোসেন

পাখিটা হঠাৎই চরকি ওড়া দিয়ে এসে আরোহণ করতে থাকে পাতা থেকে পাতায়। তারপর একইভাবে অবরোহণ। লতার আঁকশিতে আটকে থাকে খানিক। ঠিক পরের বোলে ফ্রি। কিন্তু মার্কোয়েজের কোন কথাটি বলতে চেয়েছিল, তার কিছুই আর বলে না ও। লতার পক্ষে জানার ইচ্ছেও তখন মৃতপ্রায়।

পাখিটিকে বেশ পটিয়স লাগে, তেতালে যদিও আগে লতা বায় নি ও। রঙেরূপে অনাকর্ষণীয় এবং গানবোবা বলে কখনো কেউ ফিরে তাকায় নি ওর দিকে। সে আরো দ্রুত হয় ও ঘন শ্বাস ফেলে। পথ ছেড়ে দিয়েছে লতার পাতা ও আঁকশিরা, ততক্ষণে। খেলাচ্ছলে আরেকটি ওড়া দিতে গিয়ে পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপে চোখ পড়ে ওর। দেখে স্বয়ংপ্রকাশিত দু' দু'টি চিনামাটি হিল, বিজয়পুরে। ক্রোকারিজ ব্যবসায়ীদের ইজারায় এখন। প্রতিদিনই ট্রাক ট্রাক সরে যাচ্ছে মাটি। সার সার কর্কট দাগ। নেমে এসে সহসাই ঠোঁট বসিয়ে দেয় একটি ফুলে। রস ফুরোলে অন্যে। এরই ঢালে কিয়দ্দুরে মরা সোমেশ্বরী। নিচে শুকনো খাদ। ওর এক কিনারে পৌঁছেই বিবর্তনের নিয়ম ভেঙে তিতলি পাখি সরীসৃপ হয়ে যায়। ঊষর প্রান্তর চষে ফেলে স্রোতস্বী ক্যানেলের খোঁজে। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা।

ডিসকভারিতে বিচ ডকুমেন্টারি, উঁচু ঢেউ আর সানবাথ

ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে ও অস্বচ্ছন্দ, ক্রোশ কয় দূরের সাগরে আরো বেশি, তবু এগোয়। নিষ্কেশা সরীসৃপ সাগরসঙ্গমে অনভিজ্ঞ, আযৌবন ব্যাক পেইনের ভারে পীড়িত, চিররোগা। গায়ে বাতাস লাগলে কুঁচকে যায়, উড়তে পারে না ঝড়ের বিপরীতে। ফুঁ দিয়ে চা খায়, ফুঁ লাগলে ওড়ে যায় দূরে।

লতা ততক্ষণে কুয়াশাসিক্ত ছোট নদী, এই লতাই নাকি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মাসকাটা নাম ধরেছে, শোনা গল্প, তারপর ছোটবড়ো আরো নদী, এরওপরে পাতরার জঙ্গল, বালুঢাল ও মোহনা, বঙ্গোপসাগরের।

ঐশ্বর্য রাইয়ের ডলনাচ

রাইয়ের মুদ্রাবাহুল্যে ভরা নৃত্যপ্রয়াসটিও আগে মন দিয়ে দেখত পাখি, এবার তার অন্যথা হলো। নাচ ভুলে ও সমুদ্রমন্থন শুরু করে, মন্থন আর লেহন, লেহন আর মন্থন। ও খোঁজে অমৃত, পায় না। গরল ওঠে দ্বিতীয়বারেও, তৃতীয় চেষ্টার আগেই ওর শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যায়, সাগর মোহনায় তখন তরঙ্গিত শুধু ফেনা আর বালিজল।

মার্কোয়েজ মাত্র চুয়ান্ন বছর বয়সে নোবেল জিতেছিলেন, আর লতা জিততে চায় সন্তুষ্টি, জ্যেষ্ঠতার অধিকারে, ধৈর্যেরও ওটা দাবি। কিন্তু সফেন সমুদ্রের তুলনায় অত্তটুকুন সরীসৃপ, ভয়ে কুঁজো হয়ে যায়। অর্ধমুদিত চোখে বলে, 'আই কান্ট কিস, আই কান্ট, আই...', শতবর্ষের নীরবতা নামে ওর অবয়বে।

মার্কোয়েজ স্বীকৃতির ভিতর দিয়ে মারা যান উনিশ শ' বিরাশিতে, সরীসৃপ বিনা স্বীকৃতিতে, ঠিক তার তেইশ বছর পরে, অ্যাডভেঞ্চারে।

লতা উলম্ব, লতা আনুভূমিক, লতা সূর্যমুখী, লতা বহমান। লতা স্পর্শ ও জ্ঞানকাতর, লতা প্রেমপ্রতারিত। লতা মা, লতা দিদি, লতা বন্ধু, লতা রতিতরঙ্গিনী। লতা পাতাদের ঝোপ, লতা রহস্যসরোবর। লতার ভিতরের ছন্দনাচ তার নিজের কাছেই ভীষণ অপমানকর লাগে তখন, এলিয়ে পড়ে' সে কাঁদতে থাকে। প্রশ্রয়টাকে, যা তার থেকেই উৎসারিত, অপরাধ বলে মনে হয়, অক্ষমার্হ এখন নিজের কাছে সে নিজে, পয়জন আইভি ভাবতে লাগে সে এবার নিজেকে।

লতা বিশ্বাস করে, ম্যাজিক রিয়ালিজম উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখাজোখার এক সহজাত উদ্ভাস, তাই মার্কোয়েজের জন্মকে সে নিতান্তই ঠাট্টা ভেবেছিল।
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×