somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তিম পতাকার জন্য বক্তাবলীর শহীদদের লড়াই

০৩ রা নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ভয়াল ২৯ নভেম্বর ১৯৭১। সে বড় গৌরবের সময়, সে বড় দু:খের সময়। গৌরব­ কারণ বাংলার মানুষ লড়াই করেছিল বীরের মতো। দু:খ­ কারণ বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষকে। সেই সাথে বাদ যায়নি নারায়ণগঞ্জ জেলা ফতুল্লা থানার অন্তর্গত বক্তাবলী পরগনার ১৩৯ জন মেধাবী ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ। যারা দেশের জন্য হাসতে হাসতে শাহাদতবরণ করেন।
২৯ নভেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী বক্তাবলী পরগনায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১৩৯ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার সাথে সাথে ১৪-১৫টি গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে ধলেশ্বরী নদীবেষ্টিত বক্তাবলী পরগনায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণকেন্দ্র। নারায়ণগঞ্জ শহরের আশপাশ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করে মুক্তিযোদ্ধারা বক্তাবলী পরগনার বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্খান করতেন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে এর শেষ প্রান্ত পর্যন্তও বক্তাবলী পরগনা ছিল ‘মুক্তাঞ্চল’ খ্যাত। কিন্তু সেই খ্যাতি আর ধরে রাখতে পারলাম না। সর্বশেষ দেশ বিজয়ের আগেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ২৯ নভেম্বর শীতের কুয়াশায় ঢাকা ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধলেশ্বরী নদীর চারদিক থেকে ঘেরাও করে অতর্কিত হামলা চালায়। গুলির শব্দে বক্তাবলী পরগনাবাসীর ঘুম ভাঙে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে মুক্তারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পিছু হটলে পাকিস্তানি হায়েনাদের দল ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন মেধাবী ছাত্র, শহীদ মনিরুজ্জামান, শাহ আলম, শহিদ উল্লাহ ও ফারুক মিয়ার মতো তুখোড় মেধাবী ছাত্রসহ ১৩৯ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করে। সকালের শিশিরভেজা মেঠোপথ হয় রক্তাক্ত। রক্তের স্রোতোধারা বয়ে চলে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পানিতে। অল্প সময়ের মধ্যেই বক্তাবলী পরগনা মানুষের মৃতদেহের বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়া হয় সমগ্র লক্ষ্মীনগর গ্রাম। বক্তাবলী পরগনার মুক্তিযোদ্ধা মনির, শাহ আলম, ইসহাক, সোনামিয়া ও ফারুকসহ এমন কিছু ব্যক্তিকে আমরা হারিয়েছি, যাদের কাছ থেকে আমাদের এই দেশ অনেক কিছু পেতে পারত। তাদের মহান আত্মত্যাগে অর্জিত হলো আমাদের স্বাধীনতা। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি সুন্দর লাল-সবুজের পতাকা ও মানচিত্র। স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার আনন্দ উপভোগ করার সৌভাগ্য এবং বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হিংস্রতা দেখার দুর্ভাগ্য কোনোটাই আমার হয়নি।
আমরা কি পেরেছি তাদের যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে? যাদের মহান আত্মত্যাগে আমরা আজ স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। তাদের পরিবারকে অসহায় জীবনযাপন করতে দেখে থমকে যাই। রামনগর গ্রামের শহীদ সুফিয়ানের স্ত্রী গোলেনূর বেগম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন­ ‘বর্তমানে মানুষের বাড়িতে কাজ পেলে খাই, না পেলে উপোষ থাকি।’ আমাদের দেশে শাসক আসে শাসক যায় কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবারের প্রতি কোনো সরকারের দৃষ্টি নেই। সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি বানাচ্ছে। কিন্তু যাদের মহান আত্মত্যাগে স্বাধীনতা অর্জিত হলো তাদের পরিবারবর্গ সরকার ও সমাজের কাছে আজ অবহেলার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহীদ পরিবারকে যদি আমরা সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিই তবেই দেশটা তাদের কাছে সুন্দর মনে হবে। শান্তি পাবে শহীদদের আত্মা। সার্থক হবে মুক্তিযুদ্ধ। ১৩৯ শহীদের রক্তের দামে ও হাজারো নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত ১৬ ডিসেম্বর।
কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের মাঝে মতবিভেদ থাকলেও আসুন না আমরা অন্তত এই একটি ইস্যুতে এক হই। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্মরণ করি সেসব শহীদকে, যারা দেশের জন্য নিজেদের জানমাল বিলিয়ে দিয়েছেন। তাহলে অন্তত তাদের আত্মা একটু শান্তি পাবে।

২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×