আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে কতোই না ভালোবসি! একজন বাবা অথবা একজন মা তার সন্তানকে কতোটা ভালোবাসেন তা কোনোদিন পরিমাপ করা যায় না, পরিমাপ করা উচিৎ নয়ও। একজন মা কিংবা একজন বাবাই জানেন কতো কষ্টে পাওয়া তার এই সন্তান। নিজের সন্তানকে জীবনের শেষটুকু নিংড়ে দিয়ে বড় করেন বাবা-মায়েরা। আমাদের বাচ্চাদেরকে আমরা অনেক অনেক ভালোবাসি। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বটাও কিন্তু অভিভাবকদের ওপরই। খুব খুব খারাপ লাগে যখন পত্রিকায় দেখি খুবই সামান্য কোন একটা কারনে কারো ছেলে বা মেয়ে কোন দুর্ঘটনার পড়ে মারা যায়, অথচ সেই দুর্ঘটনাটা হয়তো খুব সহজেই এড়ানো সম্ভব ছিলো। আপনার সামান্য সতর্কতা, সামান্য সচেতনতাই যথেষ্ঠ আপনার প্রাণপ্রিয় সন্তানের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিৎ করতে:
* যখন কারো বাসায় বেড়াতে যাওয়া হয়, দেখা যায় বড়রা সব একজায়গায় একত্রিত হয়ে বাচ্চাদেরকে আলাদা খেলতে পাঠিয়ে দেন - তারপর আর কোন খোঁজ খবর নেন না। একদমই অনুচিৎ। এতোগুলো বাচ্চা একসাথে হওয়া মানে হচ্ছে বিপদের সম্ভাবনা আরো বেড়ে যাওয়া। অনেক সময় দেখা যায় এরকম বাচ্চাদের একটি গ্রুপে একটি বা দু'টি বাচ্চা থাকে যারা হয়তো বয়সে অন্যান্যদের চেয়ে বড় বা সাহসে অন্যান্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এরা কিছু এমন দুষ্টামির আয়োজন করে যা তারা নিজেরা সফলভাবে করতে সমর্থ হলেও গ্রুপের অন্যান্য বাচ্চারা এতে স্বস্তি বোধ করবে না। ধরুন একজন বললো সে টেবিলের উপর থেকে লাফ দিতে পারে এবং সে সেটা করেও দেখালো। কিন্তু আরেকটি বাচ্চা যে বয়সে বেশ ছোট, সে হয়তো টেবিল থেকে মাটিতে লাফ দিতে পারে না কিন্তু ঐ বাচ্চার দেখাদেখি ঠিকই দিলো - দুর্ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক। অনুরোধ থাকলো এরকম বাচ্চাদের গ্রুপের সাথে একজন বড় মানুষ যেনো থাকে অন্ততঃ দেখার জন্য তারা কি করছে। সেটাও যদি সম্ভব না হয় অন্ততঃ কিছুক্ষণ পর পর খোঁজ নিন কি করছে - একদম আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দেবেন না।
* গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে বাচ্চাদের জন্য বিপদের উৎস আরো বেড়ে যায়। তন্মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে পুকুর, জলাশয় বা অন্য যেকোন পানির উৎস। সাঁতার না জেনেও হয়তো পানিতে নামার চেষ্টা করে বাচ্চারা অথবা হয়তো তার প্রিয় খেলনাটি পানিতে পড়ে গিয়েছে আর তাই সমূহ বিপদের কথা চিন্তা না করেই সে পানিতে নেমে গেলো, তাকে বাঁচাতে হয়তো আরো ২ জন যারা সাঁতার জানে না তারাও নেমে গেলো - ভেবে দেখুন ব্যাপারটচা কতোটা ভয়ংকর! বাচ্চাদেরকে যতোটা সম্ভব একা একা পানির কাছে যাওয়া থেকে বিরত রাখুন।
* বাসা বাড়ির ভেতরেও বাচ্চাদের জন্য বিপদজনক জিনিসের অভাব নেই। প্রথমেই বলবো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির কথা। প্রায়ই দেখা যায় বাচ্চারা বিদ্যুতের প্লাগ-পয়েন্ট বা মাল্টিপ্লাগের ভেতর কিছু দিয়ে খোঁচাখুঁচি করে - খুবই বিপদের কথা। বাজারে বিশেষ ধরনের প্লাগ-পয়েন্ট ও মাল্টিপ্লাগ পাওয়া যায় যাতে এক ধরনের ক্যাপ থাকে যা শুধু কোন প্লাগ ঢুকালে খুলবে, আর কোন কিছু দ্বারা নয় - এগুলো ব্যবহার করুন। যেকোন বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা দ্বারা বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার আশঙ্কা আছে ও লাইট জ্বলে (লাইট জ্বলে এমন যে কোন কিছুর প্রতি শিশুরা আকর্ষিত হয়) যতোটা সম্ভব শিশুদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখুন। বাসার কোথাও কোন ত্রুটিপূর্ণ, ভাঙ্গা সুইচ রাখবেন না। কোন জায়গায় খোলা ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার (এমনকি টেপ ট্যাঁচানো থাকলেও) রাখবেন না। সম্প্রতি ব্লগে দেখেছিলাম একজন লিখেছিলেন একটা বাচ্চার কথা, যে বাসার বারান্দা/জানালা (ঠিক মনে নেই) থেকে বাসার একদম পাশাপাশি অবস্থান করা ট্রান্সফর্মারে খোঁচাখুঁচি করে প্রচন্ড বৈদ্যুতিক শক খায় ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
* আগুন ও তাপ - দু'টাই বিপদজনক। শিশুদের একা রান্নাঘরে যেতে দেবেন না। বাচ্চারা বিভিন্ন জিনিস (কাগজ, দড়ি, প্লাস্টিকের ব্যাগ) আগুনে পুড়িয়ে মজা পায়। কিন্তু কোনভাবে যদি একবার আগুন নিয়ে আপনার বাচ্চাটা বেকায়দায় পড়ে যায় জেনে রাখুন নিয়ন্ত্রনে আনতে আপনি হিমশিম খাবেন। বাচ্চারা আতশবাজি বা তারাবাতি পোড়ানোর সময় তাদের সাথেই থাকুন। বাসায় ইস্ত্রি থাকলে তা হিট করতে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন না যেনো, খেয়াল রাখুন আপনার বাচ্চা যেনো কোনোমতেই উত্তপ্ত ইস্ত্রির সংস্পর্শে না আসতে পারে। গরম পানি, গরম চা বা তরকারীর পাতিল বহনের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন , কখনোই এগুলো বাচ্চাদের মাথার ওপর দিয়ে বা পাশ দিয়ে নেবেন না - নেয়ার আগে বাচ্চাকে দূরে সরতে বলুন।
* বাচ্চা ঘুমানো অবস্থায় কখনোই রুমে এরাসোল প্রয়োগ করে দরজা জানালা বন্ধ করবেন না। এতে করে বাচ্চার দম বন্ধ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এ কাজটি বাচ্চাকে রুমে আনার পূর্বেই সম্পন্ন করুন। কখনোই বাচ্চাদের হাতের নাগালে সুপার গ্লু রাখবেন না। এমন অনেক নজির আছে যেখানে বাচ্চার চোখে সুপার গ্লু চলে গিয়েছে বা কোন বড় মানুষের চোখে ঢেলে দিয়েছে। যেকোন ধরনের ওষুধ (সিরাপ/ট্যাবলেট/ক্যাপসুল) বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখুন। ইঁদুর মারার ওষুধ, কীটনাশক প্রভৃতি বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখুন।
* ছুরি, কাঁচি, এ্যান্টিকাটার প্রভৃতি ভুলেও খোলা যায়গায় ফেলে রাখবেন না। বাচ্চারা এগুলো হাতে পেলেই কাগজ কাটাকাটিতে মেতে উঠতে ভালোবাসে। এটি করতে গিয়ে প্রায়ই বাচ্চারা হাত কেটে ফেলে। ছোট বাচ্চাদের জন্য আলাদা প্লাস্টিকের কাঁচি পাওয়া যায়, সেটা আপনার বাচ্চার হাতে দিন। আর যদি ধারালো কাঁচির প্রয়োজন পড়েই তাহলে কাটাকাটির সময়টায় বাচ্চার পাশে থাকুন। বটি দিয়ে মাছ বা সবজি কাটলে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বটি গুটিয়ে রাখুন বা সারিয়ে রাখুন। সুঁই, পিন, পেরেক ও যেকোন ধরনের সূক্ষ্ম জিনিস শিশুদের আওতার বাইরে রাখুন। কটন বাড বা কান খোঁচানোর বাড বাচ্চাদের নিজের কানে বা অন্য কারো কানে ঢুকিয়ে দেবার প্রবনতা আছে, এগুলোর ব্যাপারেও সাবধানে থাকুন।
* অনেককেই দেখা যায় ছোট বাচ্চাদেরকে শুধু মোজা পড়িয়ে বাসার ভেতরে ছেড়ে দেন - এটাও উচিৎ নয়। কারন এত করে বাচ্চা হাঁটার সময় বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পায়ে গ্রিপ ধরে রাখতে পারবে না ও পিছলে পড়ে যেতে পারে। কখনোই খোলা ছাদে বাচ্চাকে ছেড়ে দেবেন না। নির্মায়মান ভবনের কাজ চলার সময় সিঁড়িতে কোন রেইলিং থাকে না, এমন সিঁড়িতে বাচ্চাকে হাত ধরে নিয়ে চলুন। আমি স্বচক্ষে এভাবে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। রাস্তা পার হবার সময় বাচ্চাকে হাত ধরে রাস্তা পার করান। অনেককেই দেখেছি বাচ্চা ৮-৯ বছর হলেই একা রাস্তা পার হতে দেন, মোটেও উচিৎ নয়।
উপরের কথাগুলো শুধু আপনার জন্য বা কোন বাবা-মা'র জন্যই নয়, এ কথাগুলো আমাদের সবার জন্যই। শুধু নিজে সতর্ক হলেই চলবে না, বাচ্চাদেরকেও যতোটা পারা যায় এসব ব্যাপারে সতর্ক করুন। বাচ্চারা দুষ্টামি করবেই, ওরা ছুটে বেড়াবেই - ওদের বেড়ে ওঠার জন্য এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এসব কিছু করতে গিয়ে ওদের যেনো কিছু না হয় তা নিশ্চিৎ করার দায়িত্ব আপনারই। সবকিছু আপনার হাতে নেই, কিন্তু যতোটুকু আছে তার পূর্ণ ব্যবহার করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

