পালের নৌকা শুধুই রবে স্মৃতি হয়ে
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
নাজমুল ইসলাম মকবুল
ছোট্টকালে বর্ষা মৌসুমে যখন বিকেলে স্কুল মাঠে খেলতে যেতাম তখন প্রায় চার/পাঁচ কিলোমিটার দূরে সুরমা নদীর শাখা বাসিয়া নদীতে সাদা লম্বা গাছের মত কি যেন ধীরে ধীরে পশ্চিমের ভাটির দিক থেকে পূর্ব দিকে সিলেটের সুরমা অভিমুখে একের পর এক চলছে দেখে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকতাম। ভাবতাম এতো লম্বা সফেদ কাপড়ে একের পর এক কারা যায়। মানুষতো এতো লম্বা হবার কথা নয় আবার এত দূর থেকে প্রত্য করাও সম্ভব নয়। আগেকার বুড়োরা মজার মজার ভুতের গল্প করতেন নিশি রাতে নাকি তিন রাস্তার মধ্যখানে ভুত সফেদ কাপড় পরে আকাশ জমিন লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পথচারিকে ভয় দেখাত। ভাবতাম দিনের বেলায় তো এভাবে ভুত পেতœী প্রকাশ্যে লোকালয়ে চলার কথা নয়। পরণে জানতে পারলাম তা হচ্ছে পাল তোলা নৌকার উঁচু পাল। এমন মনমুগ্ধকর দৃশ্য এখন আর দেখা যায়না।
আগেকার যুগে মাঝিরা নৌকা চালাতেন বাতাসে ভর করে পাল তুলে। বাতাস অনুকূল না হলে দাঁড় টেনে গুন টেনে চলতে হতো গন্তব্যে। লুঙ্গি কাছা দিয়ে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘পেছকুন্দা’ মেরে সিমাহীন কষ্টে গুন টেনে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যেতে হত। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, পলি, কাঁদা উপো করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গুন টানতে হতো জীবন জীবিকার তাগিদে। দৃশ্যটি এককালের বাংলার পল্লী প্রকৃতির রূপের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল অনন্তকাল ধরে। দূর গন্তব্যে যেতে হলে মাঝিরা অনুকূল বাতাসের জন্য দীর্ঘণ অপো করতো যাতে পাল তুলে সহজেই কম সময়ে যাওয়া যায় গন্তব্যে। অনেক সময় মাঝিরা বাতাসের জন্য দুয়া দুরূদ করত। বাতাস শুরু হলে পাল তুলে দিয়ে নৌকার মাঝিদের গ্র“প লিডার কাড়ালে বৈঠা ধরে মনের সুখে গান ধরতো “ওরে ও.......ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া...........। নৌকা চলত পথ পথ করে দ্রুত গতিতে। বাকীরা আয়েশ করে ঘুমাত অথবা প্রাকৃতিক দৃশ্য প্রাণ ভরে উপভোগ করত। সারি সারি পাল তুলা নৌকার দৃশ্য নদীতে এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করত। অনেক দূর থেকে নৌকা না দেখলেও পাল দেখা যেত। মাল বহনের নৌকা ও গয়নার নৌকাসহ সব ধরনের নৌকায়ই বাতাস অনুকূল হলে পাল তুলা হতো। গয়নার নৌকায় লোকজন চলাচল করতেন এবং বিয়ে শাদীও হতো। পাল তুলা হলে নৌকার যাত্রীদের মধ্যে কি যে আনন্দ হতো তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পুরনো পাল ছিড়ে গেলে মাঝিরা তাতে রঙ বেরঙ্গের তালি দিয়ে চালালেও পালের সৌন্দর্য্যে ভিন্ন রূপ পেত। প্রতিকূল বাতাস হলে গুণ টেনে এবং সাথে তালে তালে দাড় টেনে গন্তব্যে চলতেন মাঝিরা। দাড় টানার দৃশ্য ও ছন্দময় শব্দ ছিল খুবই উপভোগ্য। ছাত্র জামানায় এ দৃশ্যের দিকে ল্য রেখে একটি কবিতা লিখেছিলাম যার একটি লাইন হল “দাড় টেনে আর পাল তুলে ওই নৌকা চলে দিক্বিদিক।”
বর্তমানে পালের নৌকা শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে। বেশির ভাগ নৌকায়ই ইঞ্জিন সংযোজন করায় নদীতে নৌকা চলে দ্রুত গতিতে। ইঞ্জিনের ভট ভট বিকট শব্দ আর কালো ধোঁয়ায় পল্লী প্রকৃতির দৃশ্য আজ বিষিয়ে উঠেছে। পরিত্যাক্ত তেল নদীর পানিতে ফেলায় পানি হচ্ছে দূষিত। মূল্যবান মৎস্য সম্পদ হচ্ছে ধ্বংস। নদীর তীরে যাদের বাড়ি তাদের ঘুমে হচ্ছে মারাত্মক ব্যাঘাত। বর্তমানে বিভিন্ন নদী পারাপারের খেয়া নৌকায়ও ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়েছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে চলাচলে সময় কম লাগলেও যান্ত্রিক এযুগে শব্দদূষণযুক্ত ও পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ও মৎস্য সম্পদ ক্রমান্বয়ে যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে সেদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের নজর দেয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
লেখকঃ সভাপতি, সিলেট লেখক ফোরাম।
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।