সামাদ আলীর আজ খুবই মন খারাপ। ছুটির দিন ভেবেছিলেন একটু আরাম করে ঘুমাবেন। গিন্নির চেঁচামেচিতে আর তা হলো না। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। আর আধা ঘন্টা ঘুমাতে পারলেই হতো । চোখ জ্বালা করছে। সাত সকালে এভাবে স্ত্রী হৈ চৈ করে মেজাজ বিগড়ে দিবে ভাবতেই খারাপ লাগছে। ভেবেছিলেন চুপ করে থাকবেন। তাই বলে সে কোন প্রতিবাদ করবে না? ভাবলেন জোরে একটা ধমক লাগাবেন। কিন্তু আবার মনে করলেন, নাহ্ থাক। ধমক দিয়েই কি হবে! ধমক দিতে গেলে আরেক সমস্যা। প্যান প্যানিতে সারা দিন মাথা খারাপ করে ফেলবে। ঘরের শান্তি পুরোপুরি বিনষ্ট হবার আশংকায় তিনি চুপ করেই থাকলেন।
গত ঈদে বউয়ের পছন্দ মতো শপিং হয়নি। শালা শালীর পোষাক পছন্দ মতো কেনা হয়নি, শ্বাশুড়ীর শাড়ীর রং উজ্জ্বল নয়, তোমার কোন রুচি নেই, তুমি কিভাবে পড়াশোনা শেষ করে সরকারী চাকুরী কর প্রতিদিন ইত্যাদি রকম বউয়ের খোটা শুনতে শুনতে তার মাথা ঠিক নেই। তার উপর অগ্রীম বেতন পেয়েছিলেন ঈদ উপলক্ষে, সেটাও ঈদের বাজার করতে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। এখন মাসের শুরুতে তাকে নিদারুণ অর্থ কষ্টে কাটাতে হবে। কার কাছে আবার ধার কর্জ করবেন? অফিসে হয়তো হেঁটেই যাবেন। এতে রিক্সা ভাড়াটা সাশ্রয় হবে। তাতেও তো কয় টাকা আর! ভাবতে ভাবতে সারা রাত পার করে দিয়েছেন। এই সকালে সেগুলো নিয়ে ভাবার সময় নেই। স্ত্রীর অগ্নি মূর্তি দেখে মূহুর্তের মধ্যে তার ঘুম দুর হলো।
ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাও। হা করে দেখছ কি? স্ত্রীর চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে পেলেন। কোন কথা না বলে কি কি আনতে হবে তার হুকুমের অপেক্ষায় থাকলেন। ঝাঁঝালো কন্ঠে স্ত্রী এক নাগারে প্রায় ১০/১১ টি আইটেম বললেন কয়টা মনে থাকবে সেটাই কথা।
বাজারের ব্যাগ নিয়ে তিনি বাসা হতে বের হলেন। আনমনে হাঁটছেন আর ভাবছেন, দেশে নারী নির্যাতন আর নারী অধিকার নিয়ে নানা সভা সমিতি আছে, আছেন বুদ্ধিজীবিবর্গ। যারা প্রতিদিন বিভিন্ন সভা সেমিনারে নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের উপর বক্তৃতা ফুলঝুরি ছোটান। হায় তিনি যে নিজ গৃহে পরবাসী। স্ত্রীর নির্যাতনের কথা ভেবে মুখ খোলেন না। সংসারে শান্তি বজায় থাকুক, নিম্ন মধ্যবিত্তের মানসিকতা তাকে গ্রাস করে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিধবা মায়ের জন্য ঈদ উপলক্ষে বিগত ৫ বছরে একটা শাড়ী দিতে পারেনি। পুরুষ নির্যাতন নিয়ে কেউ কোন কথা বলেন না। তিনি তো সত্যিই স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার! স্ত্রীর ইচ্চা অনিচ্ছাকে মূল্য দিতে গিয়ে তিনি তার ব্যক্তি স্বাধীনতাকে হারিয়েছেন, আত্নীয় স্বজন সকলেই জানেন সামাদ সাহেব স্ত্রীর কথায় উঠেন বসেন। এতো কিছুর পরেও স্ত্রীর গালমন্দ থেমে থাকে না। প্রতিদিন উঠতে বসতে কটু কথায় কান ঝালাপালা। স্ত্রী তার উপর মোটেও সন্তুষ্ট নন।
সকালে সুন্দর রোদ উঠেছে। একা একা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার অনেক কথা মনে পড়ে। একবার মনে হয় সংসার ছেড়ে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবেন। কিন্তু জীবন থেকে তিনি কোথায় পালাবেন? জীবন থেকে তো তিনি পালাতে পারবেন না। ৫ বছরের ছোট ছেলেটা হয়েছে তার ন্যাওটা। বাইরে থেকে ফিরলে এই মাসুম শিশুটাই প্রথম এগিয়ে আসে। নি:ষ্পাপ ছেলেটার হাসি মুখ দেখলে তিনি সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে যান। হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেন। ছোট ছেলেটা হয়তো বুঝতে পারে বাবার কষ্ট। বুকের সাথে লেপ্টে থাকে অনেক ক্ষণ। বাবার কথা মনে পড়ে, তিনিও সামাদ সাহেবকে এমন করেই আদর করতেন। পিতার ঋণ শোধ করার দায়েই হোক আর মমত্ববোধের কারণেই হোক তিনি ছেলেকে আদর করেন। কোলে তুলে নেন। স্ত্রীর চোখ রাঙগানিকে এড়িয়ে তিনি ছেলের সাথে খেলা করেন, নিজেও ছোট্ট শিশুটি হয়ে যান।
রিক্সার বেলের বেসুরে শব্দে তিনি বাস্তবে ফিরে আসেন। হ্যাঁ, বাজারে যেতে হবে। কি কি কিনতে হবে, কত খানি হিসাব করতে করতে বাজারের দিকে হন হন করে এগিয়ে যান। নারী নির্যাতনের পাশাপাশি পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি মাথা থেকে দুর হয়ে যায়। তিনি আর মনে করতে পারেন না আজ কি বার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



