somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অবিস্মরণীয় চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ এবং মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন (১)

১৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না' _ গোটা দুনিয়ার এ-প্রান্তে ও-প্রান্তে উপনিবেশ কায়েমকারী বর্বর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এই দম্ভে ছিল অন্ধ। আর ভারতবর্ষের বুকে তাদের শাসন-শোষণের প্রত্যাঘাত কেউ দিতে পারে _ এ ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে। কিন্তু বীরপ্রসূ বাংলার সাহসী যৌবন সেদিন অসীম স্পর্ধায় ব্রিটিশ রাজশক্তিকে পদাঘাত করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। পৃথিবীর মানুষের সামনে অন্ধকারে বিদ্যুৎ-চমকের মতো আরেকটি সত্য তারা তুলে ধরেছিল _ সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল যত দীর্ঘ এবং যত শক্তিশালীই হোক, দেশপ্রেমের আধারে যৌবনের শক্তি তাকে তুচ্ছ করে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সংগঠিত ওই বিদ্রোহের নাম 'চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ', যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। আর তার অনুসারী ছিলেন বীরকন্যা প্রীতিলতার মতো অসীম সাহসী অগণিত ছাত্র-যুবক, তরুণ-তরুণী। তারা সেদিন জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ, কালারপোল যুদ্ধসহ অসংখ্যা ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন _ যা শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষের বুকে বিপুল সাহস আর উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এদেশে প্রায় দুইশ বছর রাজত্ব করেছে। শুরু থেকেই একদল মানুষ ছিল যারা শাসকদের গোলামী করা আর লাথি-জুতা খাওয়াকেই নিজেদের নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল। সমাজের একটা অংশ ছিল এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। আর একটা অংশ ছিল যারা ইংরেজ রাজশক্তির প্রতি নিজেদের প্রভুভক্তির চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছে, ক্ষমতার হালুয়া-রুটির উচ্ছিষ্ট চেটেছে। এদের বাইরেও একটা অংশ ছিলেন যারা সংখ্যায় হাতে গোনা, কিন্তু তাঁরাই দেশপ্রেম আর মনুষ্যত্বের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে আহ্বান করেছেন মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তারা শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতার যূপকাষ্ঠে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দেশবাসীর ঘুমন্ত-নির্জীব বিবেককে জাগাতে সচেষ্ট হয়েছেন। পরাধীন দেশকে মুক্ত করতে ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে বিপ্লবীরা সেদিন নানা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। আর সমগ্র বিপ্লবী আন্দোলনের ভরকেন্দ্র ছিল বাংলা, বিশেষত আজকের বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য থাকায় বিপ্লবীরা সেদিন নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের নানা সীমাবদ্ধতাও ছিল। কিন্তু পরাধীনতার গ্লানি মোচন করে স্বাধীনতার লক্ষ্যে নিঃশঙ্ক চিত্তে নির্ভীক প্রাণে জীবনদান এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-প্রতিকূলতাকে বরণ করে নিয়ে তারা দেশপ্রেমের অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন। অগ্নিশিশু ক্ষুদিরামকে দিয়ে যার সূচনা, কানাইলাল, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, যতীন দাস, শান্তি-সুনীতি, বিনয়-বাদল-দীনেশ হয়ে প্রীতিলতা-সূর্যসেনে তার বলিষ্ঠ প্রকাশ।

মাস্টারদা খ্যাত সূর্যকুমার সেনের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ, চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোওয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম রাজমণি সেন, মায়ের নাম শশীবালা সেন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান। পাঁচ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর থেকে সূর্যসেন লালিত-পালিত হয়েছেন তাঁর বড় কাকা গৌরমণি সেনের কাছে। পরবর্তীতে জ্যাঠাতুতো দাদা চন্দ্রনাথ সেন তাঁর অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন মেধাবী। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসকদের চক্রান্তমূলক বঙ্গভঙ্গ রোধকল্পে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে তার ঢেউ বাংলার প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। বলে রাখা ভাল, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের এ উত্তাল সময়টাতেই সূর্যসেনের শৈশব কেটেছে। এ আন্দোলন তাঁর মাঝে গভীর রেখাপাত করেছিল নিঃসন্দেহে। স্কুলের লেখাপড়ার গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে চট্টগ্রাম কলেজে ও পরে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯১৮ সালে বিএ পাস করেন। জানা যায়, ওই কলেজের শিক্ষক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, যিনি নিজে যুগান্তর দলের সদস্য ছিলেন, তাঁকে বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি গণিতের শিক্ষক হিসেবে ওরিয়েন্টাল স্কুলে যোগ দেন। ১৯২০-২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় একটি জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। তিনি সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন। এর মধ্য দিয়েই তিনি খ্যাত হন মাস্টারদা নামে। আর দশজন শিক্ষকের মতো ছাত্রদের তিনি শারীরিক শাস্তি দিতেন না, স্নেহ-ভালোবাসা দিয় জয় করতেন। আর তাই ছাত্ররাও তাঁকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। এই স্কুলই তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
... (চলবে) ...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৮:২৫
২০টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×