somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফুলের রঙ লাল - কৃষণ চন্দর

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফুলের রঙ লাল

আমাদের কারখানার মেইনগেটের সামনে ওকে প্রায়ই ঘোরাফেরা করতে দেখি। বারো তেরো বছর বয়েস। রোগা-পাতলা চেহারা। গায়ের রঙ শ্যামলা। মুখে বসন্তের দাগ। রোজ কারখানার মেইনগেটের সামনে -- সকালে যখন হাজিরা হয়, দুপুরবেলা যখন খেতে যাওয়ার ছুটি হয়, সন্ধ্যেয় যখন আমরা কারখানা থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরি - ওখানেই দেখতে পাই ওকে। কারখানায় কাজ করার জন্যে ও আসে না। কারণ ওর দুটো চোখই অন্ধ। এ দেশে চোখ আছে যাদের, তারাই তো কাজ পায় না, অন্ধেরা আর কি পাবে! যা দিনকাল পড়েছে, অন্ধের পক্ষে এখন ভিক্ষে চাওয়াও কঠিন।
কিন্তু এই অন্ধ ছেলেটি খুব হুঁশিয়ার। আমি তাকে কখনও ভিক্ষে চাইতে দেখিনি। তার গলার স্বর খুব মিহি, সুরেলা -- ভারি চমৎকার। সব সময় ডান হাতে থাকে সিনেমার গান ও কাহিনীর বই। সিনেমার নতুন নতুন গান গেয়ে কারখানার সামনে ঘুরে ঘুরে সে বইগুলো বিক্রি করে। এক আনা করে দাম। আমাদের মধ্যে কেউ-না-কেউ তার কাছ থেকে বইগুলো কেনে। আমার সিনেমা দেখার খুব শখ। শখ সবারই। একেই তো কারখানায় সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খুব খাটতে হয়। খাটতে খাটতে শরীর অবসন্ন হয়ে হয়ে পড়ে। তারপর এত খাটা-খাটুনি করেও যা মজুরি পাই, তাতে সংসার চালাতে গিয়ে থৈ পাই না। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। না জোটে দু’ বেলা খাবার, না জোটে পরনের কাপড়, না আছে ঘরে সুখ-শান্তি। আবার ওদিকে দিনভর খাটুনি। সন্ধ্যে হতে না হতেই তাড়ি খেতে কিংবা সিনেমা দেখতে মন তো চাইবেই। আমি কখনও তাড়ি খাই না; তবে হ্যাঁ, সিনেমা অবশ্য দেখি। সিনেমায় নাচ থাকে, গান থাকে, চমৎকার চমৎকার বাড়ি থাকে। নারী-পুরুষেরা সুন্দর সাজ-পোশাক পরে গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। আর পরস্পরের সঙ্গে প্রেম করে। যাকেই দ্যাখো, প্রেম করছে, নয় তো প্রেম করতে যাচ্ছে, আর না হয় প্রেম-ভালবাসার পাট চুকিয়ে মরতে যাচ্ছে। ওরা কাজ করে কখন, বোঝাই যায় না। কখনো কি কারখানায় যায়, না যায় না? কাপড়ের দাম এত চড়া, তা সত্ত্বেও এমন ভালো ভালো কাপড়-চোপড় পরে কি করে? অমন যে জাঁকজমকে থাকে, অত পয়সা পায় কোথায়? আমরা তো সাতজন্ম ধরে খাটলেও অত পয়সা কামাতে পারব না। আরও এক আজব কাণ্ড -- সিনেমাতেই দেখি, বড়লোক গরীবকে ভালোবাসছে। কারখানার মালিকের ছেলে, শ্রমিকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে। যে মজদুরের ছেলে, মিল মালিকের মেয়ের সঙ্গে তার ভালোবাসা। আর মেয়েও বলিহারি, মাথা লোটাচ্ছে তার প্রেমিকের পায়ে। শেষে মিল মালিক নিজে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে গরীবের মঙ্গল কামনা করছে। তোমরা যদি কেউ এমন মিল মালিক এবং তাদের মেয়েদের খবর পাও, তাহলে আমাদের জানিয়ে দিও ভাই। সেই আশাতেই রয়েছি আমরা।

মিল মালিক তো দূরের কথা, একজন ফোরম্যানও যদি আমাদের সঙ্গে ভালো করে কথা বলে! তবে এ কথা সত্যি, সিনেমা দেখতে দেখতে সময়টা বেশ কাটে - মাত্র চার আনায়। কিন্তু রোজ রোজ সিনেমা দেখাও সম্ভব নয়। নতুন নতুন ছবি কত আসছে, চলেও যাচ্ছে, আমরা দেখতে পারছিনে। কারণ একটা সিকিও কাছে থাকে না তখন। অগত্যা অন্ধ ছেলেটার কাছ থেকে সিনেমার বই কিনে নিই। ছবির গল্পটা পড়ে ফেলি। তার কাছ থেকে গানগুলো শুনি। আর শুনে নিজেরাই গুনগুন করতে থাকি। এক আনাতেই নেশা গলে জল হয়ে যায়। আমাদের জীবনে এতই ঊষরতা, কোথাও একটু আলোর কিরণ নেচে উঠলেই আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ি। আর ভাই, ভাবতে থাকি, এই আলোর কিরণ কখনও কি আমাদের অদৃষ্টে জুটবে! এই শ্যামলিমা কখনও কি আমাদের উঠোনে নেচে উঠবে! কখনও কি সৌভাগ্য-তরঙ্গ আমাদের জীবনসঙ্গীতে পরিণত হবে! কাজ করতে করতে আমরা এসব ভাবি। অন্যদের জন্যে চমৎকার কাপড় বুনতে বুনতে নিজেদের সুখ-স্বপ্ন রচনা করি। হঠাৎ ফোরম্যান এসে আমাদের গালাগালি করে। স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, ভালো ভালো কাপড়ের গাঁটরিতে সব স্বপ্ন বন্দি হয়ে চলে যায় -- আর নগ্ন হয়েই থাকে আমাদের শরীর, আমাদের স্বপ্ন।
তাই খাপ্পা হয়ে একদিন আমরা কারখানায় ধর্মঘট করেছিলাম। লাল ঝাণ্ডাওয়ালারা এসেছিল। ওরাই ধর্মঘট করিয়েছিল। আগেও আসত ওরা। কিন্তু আমি কখনও ওদের ইউনিয়নের শরীক হইনি। সারাদিন কাজ করতাম। সন্ধ্যেয় কখনো-সখনো সিনেমা দেখতে যেতাম। সিনেমার গান গুন্.গুন করতে করতে বাড়ি ফিরতাম। শুকনো-বাসি যা পেতাম, তাই খেয়ে পরম করুণাময় ঈশ্বরের কৃপা স্মরণ করে শুয়ে পড়তাম। কিন্তু যখন খাদ্যশস্যের দাম বাড়ল, কাপড় চোপড়ের দাম চর্তুগুণ হলো, আর কয়লা, উনুন জ্বালানোর জন্যে রোজ দরকার যে সব জিনিসের, বস্ন্যাকমার্কেট ছাড়া কোথাও পাওয়া যেত না, তখন হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমরা যা মজুরি পাই তার দাম কমে সিকি হয়ে গেছে। মজুরি যা ছিল তাই, টাকার পরিমাণও একই। তবু আর যেন চলে না। না পেট ভরে খাবার, না ছেলেপিলেদের কাপড়-চোপড়। ঝুপড়ির ভাড়া দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে সিনেমা দেখা বন্ধ করতে হলো। আগে সিনেমার গান শুনে শুনে নিজেই গলা ভাঁজতাম, সিটি মেরে গান গেয়েই খুশি হতাম। এখন ঠোঁট দুটো চেপে বসে থাকে। না গানের গুন্.গুনানি, না গলা ভাঁজা। কখনো কখনো ভাবি, সিনেমার মিল-মালিকদের সেই মেয়েরা, যারা মজদুরের সঙ্গে প্রেম করে, কোনো রকমে তারা জুটে গেলে বেশ মজা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে তা কোথায়! আমাদের মিল মালিকের মেয়ে আকাশি নীল রঙের একটা গাড়িতে চেপে মাঝে মাঝে কারখানায় আসে। গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কিন্তু ওইটুকুই; গাড়িতেই আসে, গাড়িতেই যায়।

যখন আর কোনো উপায় রইল না, তখন লাল ঝাণ্ডার নীচে দাঁড়িয়ে শ্রমিকরা ধর্মঘটের শপথ নিল। আমিও তাদের সঙ্গে শামিল হলাম। সেই প্রথম। ধর্মঘট করা সোজা কাজ নয়। দিনরাত পরিশ্রম করা যাদের অভ্যেস, চারদিন বেকার বসে থেকে তারা কুড়ের বাদশা বনে যায়। নিজের নিজের মেশিনের যন্ত্রপাতিগুলো চোখের সামনে ভাসে। তার ওপর উদরান্নের সংস্থান থাকে না। উপোস থেকে ধর্মঘট করতে হয়। ব্যাংকে টাকা জমা নেই যে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনব আর মজা করে ঘরে বসে পা দোলাব! আমাদের মিল মালিকের পক্ষে সেটা সম্ভব। কেউ কেউ বলেন, শ্রমিকদের ধর্মঘট করা উচিত নয়। তাদের বেশি কাজ করা উচিত, বেশি পরিশ্রম করা উচিত, আরও বেশি বেশি কাপড় বোনা উচিত। আমরাও মানি সে কথা। কাজও বেশি করি আমরা, কাপড়ও বেশি বুনি। কাপড় যতই বেশি বেশি বোনা হয়, বাজারে তেমনি কাপড়ের দামও চড়তে থাকে। একদিকে মিল মালিকের ভুড়ি ফোলে, অন্যদিকে আমাদের পেটের খোরাক কমে যায়। তোমরা তো বলছ ভাই, আমাদের এ দিকটা অন্তত একটু ভাবো। আগে একটা সিকি দিয়েই সিনেমা দেখতাম, এখন আর সে রেটও নেই। তাহলে বলো, কি করি!

যাক সে কথা। আমরা ধর্মঘট করলাম। চারদিকে শোরগোল পড়ে গেলো। আট-দশটা বোকা পাঁঠা ছাড়া একজন শ্রমিকও কারখানায় গেলো না। খুব খুশি আমরা। পুলিশ পাহারা শুরু হয়ে গেছে। আমরা কারখানার বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে আলাপ-সালাপ করছি। সে-দিনও সেই অন্ধ ছেলেটা কারখানার সামনে ঘুরে ফিরে গান গাইছে। কিন্তু কেউ তার কাছ থেকে একখানাও বই কিনছে না। ছেলেটা তার মিষ্টি-মধুর গলায় প্রাণপণে গেয়ে চলেছে, তবু পকেট থেকে এক আনা পয়সাও বার করল না কেউ। কারণ আমরা তো এখন ধর্মঘটে রয়েছি, জানিনে কদ্দিন চলবে। এক আনা বলতে তো এক আনাই। অন্তত সকাল-সন্ধ্যের ছোলাটা জুটবে। আমার হাসি পায়, লোকদের যখন বলতে শুনি, শ্রমিকদের শিখিয়ে-পড়িয়ে ধর্মঘট করানো হয়! ধর্মঘট না-কি শ্রমিকদের আনন্দ উৎসব! তারা কি জানে, শ্রমিকরা মুরগি-পোলাও খেয়ে ধর্মঘট করে না? ওই সামান্য ছোলা খেয়ে, আর হাতের মুঠো পাকাতে পাকাতে একজন শ্রমিক ধর্মঘট করে। বুকের রক্ত শুকিয়ে যায়। ছেলেকে না খেয়ে মরতে দেখে। স্ত্রীকে ঘাস-পাতা সেদ্ধ করতে দেখে। দেখে, আর চোখ নীচু করে দাঁতে দাঁতে পিষতে পিষতে কারখানার গেটে গিয়ে দাঁড়ায়। ভেতরে যায় না। খানিকটা দুর্বলতা, খানিকটা লোভ আর ধোঁকাবাজি তাকে ধাক্কা মেরে কারখানার ভেতরে নিয়ে যেতে চায়, তবু সে ভেতরে যায় না। সত্যিই বলছি তোমাকে, গুলি খাওয়া সোজা, কিন্তু ধর্মঘট করা সোজা নয়। হ্যাঁ, ধর্মঘটের সেই প্রথম দিন, অন্ধ ছেলেটা গান গেয়ে গেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, সিঁড়ির কাছে লেটারবক্সে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। মুখ শুকিয়ে গেছে একেবারে। আমাদের চেয়ে ওর কষ্ট কম নয়। হয়ত সকাল থেকে কিছুই খায়নি। আমি এক পা এক পা করে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম -
- ‘আজ ক’খানা বই বিক্রি হলো?’
ও জবাব দিলো -
- ‘একটাও না।’
- ‘এখন এখানে বই বিক্রি হবে না; এখানে ধর্মঘট চলছে।’
- ‘ধর্মঘটে কি হয়?’
- ‘মজদুররা কাজে যায় না।’
- ‘কেন যায় না? কোনো অসুখ?’
- ‘অসুখ ঠিক না; তবে এক ধরনের অসুখও বলতে পারো। যদি ঘরে শান্তি না থাকে, গায়ের কাপড়, পেটের খোরাক না জোটে, তবে লোকে কাজ করবে কি করে?’
শুকনো ঠোঁটে জিভ বোলাতে বোলাতে ও বলল -
- ‘আজ একটা বইও বিক্রি হয়নি।’
বললাম -
- ‘আজ ধর্মঘট যে!’
- ‘সে-দিনও বই বিক্রি হয়নি, সেই যে, যে-দিন স্বাধীনতা এসেছিল -- পনেরোই আগস্ট। মানুষজন খুশিতে কি নাচানাচিই করেছিল।’
- ‘তুমিও নেচেছিলে তো?’
- ‘আমি? আমি তো তখন খিদেয় মরছি!’
আমি চুপ করে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে পকেট থেকে এক আনা পয়সা বার করে ওকে দিতে গেলাম, ও নিল না! বলল --
- ‘আমি অন্ধ। কিন্তু ভিখারী নই। আমার বাবা এই কারখানায় কাজ করত। একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।’
- ‘কি হয়েছিল?’
- ‘ফোরম্যানের দোষে মেশিনে চেপ্টে গিয়েছিল। পরে বলা হয়, দোষটা নাকি আমার বাবার নিজেরই ছিল।’
- ‘তুমি এই পয়সাটা নাও।’
- ‘না। আমি ভিক্ষে নেব না।’
ও জোরে ঠোঁট কামড়ে রইল। আমি ওর কাছ থেকে চলে এলাম।
ধর্মঘটের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ দিনেও আমি তাকে যথারীতি আসতে দেখেছি। হাতে বই নিয়ে গান গাইতে দেখেছি। কিন্তু কেউ তার কাছে থেকে বই কেনেনি। যখন গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন সে পোস্টাপিসের লেটারবক্সে হেলান দিয়ে দাঁড়াত।
আমি তাকে বললাম -
- ‘আজকাল এখানে ধর্মঘট। সিনেমার গানে রুচি থাকবে কার! তুমি বরং অন্য কোথাও যাও।’
সে বলল -
- ‘কোথায় যাব! আমি রাস্তা চিনতে পারি না।’
- ‘ফোর্টে যাও না, বড়লোক ভদ্দরলোকের এলাকা। ওখানে তোমার বই কাটবে খুব। চলো, আমি ওখানে তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি।’
আমি তাকে ফোর্ট এলাকায় পৌঁছে দিলাম। কিন্তু পরদিন সে আবার ফিরে এল কারখানার সামনে। বলল -
- ‘ওখানকার লোক সব ইংরেজি বই দ্যাখে। দেশী ফিল্মের গান রেডিওতে শোনে। ওরা আমার বই কেনে না।’

এমন সময় লাল ঝাণ্ডাওয়ালারা এল। তাদের সঙ্গে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরাও ছিল। আমরা সবাই কারখানার সামনে জড়ো হয়ে শ্লোগান দিতে লাগলাম। তারপর গণসঙ্গীত শুরু হলো। গাইতে গাইতে লক্ষ করলাম, অন্ধ ছেলেটাও লেটারবক্স ছেড়ে আমাদের জমায়েতে চলে এসেছে। আস্তে আস্তে আমাদের গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। গাইতে গাইতে সুর যখন বেশ রপ্ত হলো তার, তখন সে সবচেয়ে জোরে গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো। আমরা সবাই তার গানে দোহার দিতে লাগলাম। তার গলার স্বর খুব মিহি, মিঠে আর সুরেলা। ভারী চমৎকার। গান শেষ হলে আমরা খুব প্রশংসা করলাম তার। শ্রমিকরা তাকে কাঁধে তুলে নিল। তার হাতে লাল নিশান ধরিয়ে দিলো। বলল -
- ‘এ আমাদের ফজলু চাচার ছেলে।’
দেখলাম, অন্ধ ছেলেটার চোখমুখ আনন্দে চকচক করছে। সবাই চলে গেলে সে কাঁপা কাঁপা গলায় আমাকে বলল -
- ‘গানগুলো আমার খুব ভালো লেগেছে।’
বললাম -
- ‘এগুলো আমাদের গণসঙ্গীত।’
- ‘ওরা আমার হাতে নিশান ধরিয়ে দিয়েছে। আমি তো খুব ছোট।’
- ‘তুমি একজন শহীদের ছেলে। চাচা ফজলুর রহমানের ছেলে।’
- ‘নিশানটার রঙ কি?’
- ‘তুমি কি করে বুঝবে! তুমি কখনও লাল রঙ দ্যাখোইনি। মানুষের কলজের রক্তের রঙ যেমন, ঠিক তেমনি। এটা আমাদের শ্রমিকদের মেহনতের রঙ।’
সে অনেকক্ষণ নিশানের ওপর হাত বোলালো। তারপর বলল -
- ‘এ রঙ আমি কোনোদিন আর ভুলব না।’
- ‘কি করে?’
- ‘সেটা বলব না।’
সে হাসল, একটু থেমে বলল -
- ‘গানগুলো খুব ভালো। এখন অন্য কোনো গান গাইতে ইচ্ছে করছে না আমার। ওই রকম আর গান আছে?’
আমি এদিক-ওদিক তাকালাম। তারপর চুপিচুপি বললাম -
- ‘কাউকে বলো না যেন। আমিও গান লিখি। ঠিক এই রকম। আমি কিন্তু কাউকে দেখাইনে।’
- ‘তুমি গান লেখো - আমি গাইব। ঠিক এই রকমই লাল গান লিখতে হবে কিন্তু।’

রাত্রে আমি একটা গান লিখলাম। বিশ্রী, কর্কশ, চ্যাটাং চ্যাটাং ভাষা। বড় কষ্টেই লিখলাম। কিন্তু লিখলাম মনপ্রাণ দিয়ে। গানে আমার মনের সমস্ত দরদ, স্ত্রীর সব দুঃখকষ্ট, ছেলেপিলের সব ক্ষুধাযন্ত্রণা ঢেলে দিলাম। তারপর আমি আমার ক্ষুধা-পিপাসা-কাতর গান নিয়ে গেলাম আমার অন্ধ বন্ধুর কাছে। সে তার অন্ধ হৃদয়ের সমস্ত দৃষ্টিশক্তি, তার অন্ধ পৃথিবীর সমস্ত ব্যাকুলতা, তার অন্ধকারের সমস্ত আলো সেই গানে ঢেলে দিলো। জমায়েত যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠল। হাজার হাজার তরবারি যেন কোষমুক্ত হয়ে কারখানার দরজায় নাচতে লাগল। পাহারাদারদের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। আমরা এগোতে এগোতে একেবারে কারখানার গেটে এসে পৌঁছলাম। ম্যানেজার সেনাবাহিনীর জন্যে টেলিফোন করল।
এভাবেই চলল কিছু দিন। আমাদের যা-কিছু সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে এল। আশা-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে পড়তে লাগল। অনেক শ্রমিকই কাজে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে। কারণ কারখানার মালিক একই রকম জিদ ধরে বসে রয়েছে। যাঁরা মধ্যস্থতা করতে এসেছিলেন, তাঁরাও আমাদের ভৎসনা করলেন। খবরের কাগজ বড়লোকদের - তারাও আমাদের দোষ দিতে লাগল। আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না কেউ। চারিদিক থেকে শুধু উপদেশ। এই রকম জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটছিল আমাদের। কোনো মীমাংসাই হচ্ছিল না। অনেক শ্রমিকই মনে মনে ঠিক করল, পরদিন থেকে তারা কাজে যোগ দেবে। আমরা অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তারা কোনো কথাই মানতে চাইল না।
আমি খুব বিমর্ষ। আমার অন্ধ বন্ধুটিও খুব মনমরা। আমরা আস্তে আস্তে কারখানার গেট থেকে ফিরছিলাম। ও জিজ্ঞেস করল -
- ‘কাল থেকে মজদুররা সব কাজে যাবে?’
আমি হতাশ গলায় বললাম -
- ‘হ্যাঁ।’
- ‘তুমিও যাবে?’
- ‘না।’
- ‘তাহলে কি করবে?’
আমি চুপ করে রইলাম।
- ‘ওরা আমার হাতে লাল ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিল।’
আমি তবুও নিশ্চুপ।
- ‘কালকের জন্যে একটা গান লেখো। খুব ভালো গান।’
তবু আমি কোনো কথা বললাম না। একটা ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। তারপর বলল -
- ‘আমি ফুল খুব ভালোবাসি। কেমন চমৎকার মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। ইচ্ছে করছে, কেউ আমাকে ফুলগুলো সব দিয়ে দেয়! অনেক অনেক ফুল।’
আমি বললাম -
- ‘আমার পকেটে দুটো পয়সা আছে।’
ও বলল -
- ‘চলো, ছোলা কিনে খাই।’

পরদিন আমরা দু’জনে খুব সকালে কারখানার গেটে এসে পৌঁছলাম। ওর হাতে নিশান; মুখে আমার লেখা নতুন গান। এর চেয়ে ভালো গান আমি আজ পর্যন্ত লিখিনি। এর চেয়ে ভালো গান সে আজ পর্যন্ত গায়নি। এ-গান যেন আমাদের দু’জনের শেষ চেষ্টা - অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, কিন্তু আলোর শেষ রশ্মিটুকু যেন কেউ নিভিয়ে দিতে না পারে, দিনরাত্রির শ্রম-সঙ্গীতের সমুদ্র কেউ যেন অতিক্রম করতে না পারে। প্রত্যহের অনশনের ইঁট যেন একটা একটা করে কারখানার দরজায় প্রাচীরের অবরোধ সৃষ্টি করেছে। যারা ভেতরে যেতে চায়, তাদের পথ যেন অবরুদ্ধ। একজনও ভেতরে গেলো না। যে এল, সেই গানের সমুদ্রে ডুবে গেলো। কারখানার গেট খোলা। কিন্তু গেট পেরিয়ে কেউ কারখানায় ঢুকল না। উদ্দেশ্য বানচাল হচ্ছে দেখে মিল মালিকের পোষা গুন্ডারা আমাদের ওপর হামলা করল। আমরা তাদের হামলার জবাব দিলাম। ফলে গুলি চলল। চারদিকে ছুটোছুটি, শোরগোল। হঠাৎ দেখলাম, অন্ধ ছেলেটা পড়ে যাচ্ছে, তার হাত থেকে অন্য একজন শ্রমিক নিশান তুলে নিচ্ছে। আমি দৌড়ে গিয়ে অন্ধ ছেলেটাকে দু’হাতে তুলে নিলাম। ভীড়ের বাইরে নিয়ে এলাম তাকে। তারপর হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।
হাসপাতালে তার খাটের চারপাশে অনেক শ্রমিকের ভিড়। কারণ ডাক্তার বলে দিয়েছে -
- ‘ও বাঁচবে না। দু’ এক ঘণ্টার অতিথি মাত্র।’
ও জিজ্ঞেস করল -
- ‘কারখানার ভেতরে কেউ যায়নি তো?’
আমি বললাম -
- ‘না।’
- ‘একজনও না?’
- ‘একজনও না।’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে বলল -
- ‘ওরা আমাদের হাতে লাল নিশান তুলে দিয়েছিল।’
আমার চোখে জল এল। নার্স তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার নাকের ডগা কেঁপে উঠল। বলল -
- ‘কি চমৎকার গন্ধ, কারোর কাছে ফুল আছে?’
নার্স সেন্ট মেখে এসেছিল, সে কিছু বলার চেষ্টা করতেই আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। একজন শ্রমিককে চুপিচুপি একটা কথা বললাম। সে বাইরে চলে গেলো।
ও আবার জিজ্ঞেস করল -
- ‘কারো কাছে ফুল আছে?’
আমি বললাম -
- ‘ফুল আছে বাইরের দোকানে। তোমার জন্য আনতে পাঠিয়েছি।’
ও চুপ করে রইল। শ্রমিকটি চামেলী ফুলের একটা বড় তোড়া এনে আমার হাতে দিল। আমি সেটা অন্ধ ছেলেটার কাঁপা-কাঁপা হাতে ধরিয়ে দিলাম। তার দুর্বল শ্যামল হাতে চামেলীর ঝকঝকে সাদা সাদা ফুল।
ও বলল -
- ‘কি চমৎকার ফুল! কেমন মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ! কেমন বাহারে রঙ!’
ও চামেলীর কোমল-মসৃণ সাদা সাদা পাপড়িগুলোর ওপর হাত বোলাতে লাগল। আনন্দে ওর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল -
- ‘এগুলো লাল ফুল, তাই না?’
নার্স কি বলতে যাচ্ছিল, আমি আবার তাকে থামিয়ে দিলাম। ধরা গলায় বললাম -
- ‘হ্যাঁ, লক্ষ্মী ভাইটি, ওগুলোর রঙ লাল। একেবারে লাল।’
ও আবার জিজ্ঞেস করল -
- ‘আমাদের নিশানের মতো লাল? মানুষের কলজের রক্ত যেমন লাল, ঠিক তেমনি?’
আমি খুব কষ্টে চোখের জল চেপে বললাম -
- ‘হ্যাঁ ভাই, এ ফুল একেবারে লাল।’
ও খুশির নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে থেমে থেমে বলল -
- ‘ফুলগুলো খুব ভালো ... খুব ভালো। লাল লাল ফুল। ... আমার ইচ্ছে করছে, এই লাল ফুল দিয়ে যদি কেউ আমাকে ঢেকে দেয়!’
সে নিজের গালে ফুলগুলো চেপে ধরল। চোখ দুটো বন্ধ করল চিরদিনের মতো।
ওয়ার্ডে কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কারোর কারোর চোখে অশ্রুর ঢল নামল। কেউ বা মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

*** *** ***

সে আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। আমি তার কবর দেখে এলাম। কবরটা কাঁচা। তার ওপর কোনো গাছ নেই, ফুল নেই। আমি যখন তার কবর দেখতে গিয়েছিলাম, আমাকে সে যেন জিজ্ঞেস করছিল -
- ‘দাদা, আমার কবরে কবে লাল লাল ফুল ফুটবে?’
আমি বলেছিলাম -
‘ছোট্ট ভাইটি, আজ আমি এক জায়গায় তোমার গল্প শোনাতে যাচ্ছি। ওদের আমি এ কথাটা অবশ্যই জিজ্ঞেস করব।’

[মূল অনুবাদঃ আশরফ চৌধুরী]
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×