আমার নিজের না, আমার এক ঘনিষ্ঠ বড় ভাই, বন্ধুর মতো, তার মোবাইল। মধ্যম দামি। বিশ হাজারের উপরে দাম। তিনি কিনেছিলেন ইনস্টলমেন্টে। হারানোর দিন পর্যন্ত তার আরো ৮ হাজার টাকার কিস্তি বাকি ছিল। তার উপরে মোবাইলে অন্যান্য সবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফোন নাম্বার আর অন্যান্য জিনিসপত্রতো ছিলই। যার ফলে মোবাইলটা হারায়্যা উনি একটু মন খারাপ করছিলেন।
হারানোর ঘটনার দিনই কিংবা পরদিন সকালে সেই বন্ধু-ভাই, আমারে ফোনে জানাইলেন, ‘লাবু, আমার মোবাইলটা তো হারায়্যা গেল!’ আমি তারে তাৎণিক স্বান্তনা দিলাম, সমস্যা নাই পাইয়া যাইবেন। চিন্তা কইরেন না। এরপর থেকে মোবাইল উদ্ধারের শেষ দিন পর্যন্ত আমি এইটার সঙ্গে জড়িত ছিলাম।
আমরা সেই বন্ধু-ভাই, তার নাম সায়েদুল ইসলাম তালাত। তিনি বিডিনিউজ২৪.কমে চাকরী করেন। পেশায় সাংবাদিক, অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক। আমি নিজেও একই কাজের সঙ্গে যুক্ত, অন্য প্রতিষ্ঠানে। উনি, মানে তালাত ভাই অবশ্য কিছুদিন ধরে শেয়ারবাজারটাও কাভার করছেন।
যাই হোক, যেদিন মোবাইলটা হারালো সেদিন ছিল ১৪ ডিসেম্বর। অফিস থেকে বেড়িয়ে তালাত ভাই বাসায় যাচ্ছিলেন, মোটরসাইকেলযোগে। শেওড়াপাড়ায় বাসা। পথে অন্য একটি কল আসে। তিনি বাইক থামান, কার কল দেখেন, তারপর জিন্স প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা না ঢুকায়া, জ্যাকেটের পকেটে রাখেন। তারপর বাসায় গিয়া দেখেন মোবাইল নাই, যাহ্ শালা, পথে পইরা গ্যাছে।
পইরা যাওয়ার সম্ভাব্য জায়গা শেরেবাংলানগর এলাকা হওয়ায় পরদিন ওই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন তালাত ভাই। তারপর মোবাইলের আইএমই নাম্বারটা দিয়া দ্যান ডিবি অফিসে। আমরা মোটামুটি ৯০ ভাগ নিশ্চিত ছিলাম মোবাইলটা আবার উদ্ধার করতে পারুম। কারণ এখন পুলিশের কাছে যে প্রযুক্তি আছে, তাতে মোবাইল কেউ হজম করতে পারবো না। যদি সেটা না কেউ ভেঙ্গে ফেলে বা ইউজ না করে। ইউজ করলে ধরা খাইতেই হইবো।
যথারীতি ২-৩ দিন পর জানা গেল, মোবাইলটা (#######) নাম্বার ব্যবহার করতাছে। একদিন ডিবি পিআর অফিসের সামনে থেকে তালাত ভাই ওই নাম্বারে আমার মোবাইল থিকা একটা ফোন করলেন। ফোন ধরল এক মেয়ে।
তালাত ভাই বললেন, ‘এটা কি শামীম ভাইয়ের নাম্বার? উনি আমাকে ফোন করতে বলেছিলেন।’
অপরপ্রান্ত থেকে বললো, ‘রং নাম্বার। আপনি কোথা থিকা বলছেন?’
তালাত ভাই: ঢাকা থেকে।
মেয়েটি: আমিও তো ঢাকা থেকে।
তালাত ভাই: আপনি কি করেন? (আলাপ জমানোর চেষ্টা আরকি)
মেয়েটি: আমি ও আমার ভাবী মিলে একটা বিউটি পার্লার চালাই।
আরো কিছুণ কথা চললো। কথা শেষে তালাত ভাইয়ের মুখে হাসির রেখা দেখলাম। বললেন, মেয়ে কথা বলতে ইন্টারেস্ট। পটানো যাবে। মোবাইলটা উদ্ধার করা যাবে আশা করছি।
মেয়েটি তার নাম বলেছিল তাসলিমা। মৌচাকে বিউটি পার্লার। আর থাকে আশেপাশেই। তালাত ভাই মাঝে মধ্যেই কথা বলা শুরু করলেন। এদিকে মেয়েটির নাম্বারের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) বের করা হলো ডিবি থেকে। আমরা নিজেরাই সেইটা একটু গবেষণা করলাম। মেয়েটির কথা সত্যিই মনে হলো। কারণ তার বেশির ভাগ কল মগবাজার মীরবাগের। আবার মোবাইলে তালাত ভাইকে সে বলেছে সে গ্রামের বাড়ি বরগুণার বেতাগী গিয়েছে। আমরা তার ঢাকায় ফেরার অপো করছি।
পরিকল্পনা হলো সে যদি এমনিতেই দেখা করতে রাজী হয়, তাহলে তো হলোই। তা না হলো তার পরিচিত আÍীয়-স্বজনের যে নাম্বারগুলো আমরা পেয়েছি সেগুলো ব্যবহার করে ঠিকানাটা বের করবো। তারপর পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানো হবে। মেয়েটির সিডিআর ছিল ২-২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সে তখনো বরগুণায়। জানুয়ারীর প্রথম দিকে ঢাকায় ফিরে।
গত ৮ জানুয়ারি তালাত ভাই বললেন। মেয়েটি দেখা করতে রাজী হয়েছে, মগবাজার আড়ংয়ের সামনে, বিকেল সাড়ে ৪টায়। এখন কী করা যায়? সেদিন আবার আমাদের এক সিনিয়র সাংবাদিক বাস চাপায় মারা গেছেন। সেইটা নিয়া প্রেসকাবের সামনে হট্টগোল হচ্ছে। আমি, তালাত ভাই দুজনেই সেখানে।
আমি তালাত ভাইকে পরামর্শ দিলাম পরদিন সকালে দেখা করবার জন্য। কারণ বিকেল ৪টায় আমাদের অফিসে ঢুকে যেতে হয়। সেদিন আবার সিটিতে বড় ঘটনা। অফিস থেকে বের হওয়া একটু কঠিন হয়ে যাবে। তালাত ভাই মেয়েটিকে পরদিন দেখা করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু মেয়েটি জানালো, দেখা করলে সেদিনই করতে হবে। অগ্যতা তালাত ভাই একাই গেল।
সন্ধ্যায় যখন আমি আবার ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হলাম তখন মেয়েটিকে নিয়ে তালাত ভাই রমনা থানায়। মেয়েটি হাজত খানায়। তখনো মোবাইল উদ্ধার হয়নি, উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এর আগে তালাত ভাই কথামতো সন্ধ্যা ৬টার দিকে মগবাজার আড়ংয়ের সামনে যায়। সঙ্গে মিরাজ নামে তার এক বন্ধু। মেয়েটিকে নিয়ে তারা মগবাজার ক্যাডে ডি তাজে ঢুকে।
পুলিশকে আগে থেকেই বলা ছিল, রমনা থানার একটা সিভিল টিম ছিল পাশেই। রেস্টুরেন্টে বসার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ হাজির। মেয়েটিকে বলা হলো তোমার স্যামসাং সেটটি কোথায়? মুহুর্তেই বুঝে ফেলল সে ঘটনাটা কী ঘটতে যাচ্ছে। বলল, বাসায়। আর পুলিশি কেস বুঝতে পেরে সে নিজেই বলল, থানায় চলেন। তাকে থানায় আনা হলো।
থানায় গিয়ে মেয়েটি বললো। সে মোবাইলটি গ্রামের বাড়ি বরগুণায় একজনের কাছে ৩ হাজার টাকা আর পুরানো একটা সেটের বিনিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে, তার পরিচিত একজনের কাছে। পরে এখান থেকে মেয়েটিকে দিয়ে ফোন করানো হলে ওই ব্যক্তিকে। তাকে সেটটি ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলো। সে টাকা ছাড়া সেট দিতে রাজী নয়। এদিকে মেয়েটি অনুরোধ করেছে এসব ঘটনার কিছুই যেনো তার পরিচিত ওই লোককে জানানো বা তার আÍীয় স্বজনকে জানানো না হয়।
আসলে মেয়েটি ঢাকায় বিউটি পার্লারে কাজের কথা বলে কল গার্ল হিসেবে কাজ করে। সে নিজেই স্বীকার করেছে। তার অনুরোধের কারণে বিষয়টি তার পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি।
তালাত ভাইয়ের এক বন্ধু বরগুণার ওই এলাকায় চাকরী করেন। তাকে ফোন করে বলা হলো। সে স্থানীয় এক লোককে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে অপো করছিল। এদিকে মেয়েটির ফোনের নির্দেশনা অনুযায়ী এক লোক মোবাইলটি তালাত ভাইয়ের বন্ধুর হাতে দিয়ে যায়। বিনিময়ে তখন ওই লোকটিকে ২ হাজার টাকা দেওয়া হয়। যেহেতু বেচারা কিনেছে, তাই। না দিলেও কিছু করার ছিল না, কিন্তু মোবাইলটা উদ্ধার করতে আরো ২-৩ দিন লেগে যেত। ওই বেচারাকে ধরে আনতে হতো।
এদিকে মোবাইল হাতে পাওয়ার পর মেয়েটিকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যদিও মোবাইলটি আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকায় আসেনি, এখনো বরগুনায় আছে। দু-একদিনের মধ্যে ঢাকায় আসার কথা।
এইভাবেই একটি হারানো মোবাইল উদ্ধার করা হইলো।
বি. দ্র. মোবাইল হারানোর পর তা উদ্ধার সম্ভব। পুলিশ চাইলে তা পারে। অতএব দয়া করে কেউ চোরাই মোবাইল কিনবেন না।
একটি হারানো মোবাইল উদ্ধারের রোমাঞ্চকর কাহিনী...
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৩টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।