somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্তরসম বাবা

১৮ ই জুন, ২০১৭ দুপুর ২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




: আব্বু আমার কিছু টাকা লাগবে !

: কি করবে , কত টাকা?

: ২০০ হলেই চলবে খাতা কলম কিনব আব্বু ।

: এই নাও টাকা আমি তো অনেক ব্যস্ত থাকি, তোমাদের যখন যা দরকার কিনে নিও আর মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করবে । আমি চাই তুমি অনেক বড় হও ,জীবনে সুখী হও ।

টাকা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে ও বাবার কথায় রোহান থমকে যেয়ে বাবাকে প্রশ্ন করে আচ্ছা আব্বু তুমি কি সুখী ?

ছেলের এই প্রশ্নে জাফর সাহেব অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে ও বলে হ্যা বাবা আমি সুখী ।তোমার মা , তোমাদের নিয়ে আমার সুন্দর একটা পরিবার আছে পৃথীবীতে এর চেয়ে বড় সুখ আর কি আছে ।

: আব্বু আমি যতটুকু শুনেছি তোমার ছোটবেলাটা খুবই অভাবে কেটেছে , তুমি অনেক কষ্ট করে লিখা পড়া করেছ । আর এখন কলেজে চাকরী করছ ,কলেজ থেকে ফিরেই প্রাইভেট পড়ানো শুরু কর সেটা রাত ১০টা পর্যন্ত চলে ঠিকমত দুপুরে খাওয়ার সময়টা পর্যন্ত পাও না ।

: এটা ঠিক এখন তোমার টাকার কষ্ট নেই, কিন্তু তুমি কত কষ্ট করে টাকা উপার্জন করছ সে টাকা গুলো সবই আমাদের জন্য খরচ করছ ।
আমাদেরকে ভাল খাবার খাওয়াচ্ছ , দামী জামা ,জুতো পরাচ্ছ কিন্তু তোমার নিজের এখনো দুইটার বেশি শার্ট নেই , কখনো ছিড়া লঙ্গী দিয়েই চালিয়ে যাওকয়াক মাস , তাহলে তুমি সুখী হলে কি করে আব্বু ?

: আরে ব্যাটা !তোমরা আমার সন্তান তোমরাই আমার সব ,তোমাদের দেখা শুনা করে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া বাবা হিসাবে আমার দায়িত্ব । টাকা উপার্জন করা কষ্ট এটা ঠিক, সেই টাকা দিয়ে যখন আমার সন্তান আমার পরিবারের চাহিদা পূরন করি, তোমাদের মুখে হাসি ফুটে তখন আমার অন্তর কতটা আনন্দিত হয় সেটা একজন বাবা ছাড়া কেউ উপলদ্ধি করতে পারবে না ।

এখন তুমি এটা বুঝবে না যখন বাবা হবে তখন বুঝবে----

জাফর সাহেব তলিয়ে যান আজ থেকে ৪০ বছর আগে -------------------।

************ *********** ************ *************

বয়স তখন কত হবে ৭/৮ বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিলাম ।

: বাবা আমাকে একটা শার্ট কিনে দাও ।

: আজকে না আরেক দিন কিনে দিব বাজান ।

: না আজকেই কিনে দাও এই যে এই শার্ট টা আমার পছন্দ হয়েছে ।

: আজকে বাজার করে টাকা শেষ, রান্নার জন্য তেল কেনা হয়নি শার্ট কিনব কি ভাবে বাজান।

: না আমাকে আজকেই কিনে দিতেই হবে ,বুবুর ফ্রক পরে স্কুলে যাই সবাই আমাকে মেয়ে বলে ক্ষেপায় । শার্ট কিনে না দিলে আমি আর স্কুলেই যাব না ।

: জাফর বেয়ারাপনা করবা না বাবার কাছে আজকে টাকা নেই ।

: টাকা না থাকলে না থাক তবু আমাকে কিনে দিতেই হবে ।

এতে বাবা রেগে গিয়ে আমার গালে একটা চর মারে এতে আমি সারা রাস্তা

কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী এসে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি ।

হঠাত আমার গায়ে কারো হাতের স্পর্স পেয়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় চোখ মেলে দেখি বাবা । বাবার দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে ।

: বাবা তুমি কাঁদছ কেন ?

: কাদঁছি আমার অক্ষমতার জন্য ,আমি আমার সন্তানের আবদার পূরন করতে পারি নাই ।এর চেয়ে বড় কষ্ট আর নাই রে বাজান ।

বাবা ছোট বাচ্চাদের মত হুহু করে কাঁদতে লাগলেন ।

: বাবা তুমি কেঁদ না আমার শার্ট লাগবে না আমি বুবুর ফ্রক পড়েই স্কুলে যাব তুমি কেঁদ না বাবা !!

: বাজান আমি তোমাদের ভরন-পোষন ঠিকমত করতে পারি না কিন্তু আমি তোমাদের জন্য দুয়া করি আল্লাহ তোমাদের অনেক বড় করুন আমি যে কষ্ট পাই আল্লাহ যেন তোমাদের এরকম কষ্ট না দেয় ।

এর পর আর কখনো বাবার কাছে কোন জিনিসের জন্য বায়না করি নাই । অনেক কষ্ট করে লিখা পড়া করেছি একই কাগজে প্রথমে কাঠপেন্সিল দিয়ে এর উপরে কলম দিয়ে লিখেছি ।কবুতর পালতাম সেগুলোর বাচ্চা বিক্রি করে ,গাছের গাব, নাড়িকেল বিক্রি করে লিখা পড়ার খরচ চালিয়েছি ।কষ্টকর সেি দিনগোলোর কথা মনে পড়ে জাফর সাহেবের দুচোখ বায়ে পানি নামছে

: আব্বু তুমি কাঁদছ কেন ?

ছেলের কথায় জাফর সাহেব বাস্তবে ফিরে আসে হ্যা রোহান আমি অনেক সুখী ! যদিও আমার সন্তানেরা সবাই ভাল তোমারা কখনো অন্যায় বা অপ্রজনীয় দাবী কর না , আমি আমার পরিবারের ন্যায় সঙ্গত দাবীগুলো পূরন করতে পারছি, আমার সন্তানেরা যখন যা যাচ্ছে আমি দিতে পারি এর চেয়ে বড় সুখ একজন পিতার কাছে আর কি আছে ! এটাই একজন পিতার প্রকৃত সুখ ।

সন্তান যখন কিছু বায়না ধরে একজন বাবা যখন অভাবের কারনে দিতে পারে না এটা একজন বাবার জন্য কতবড় কষ্ট একজন ভুক্তভূগী বাবা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না ।

********* ********* ********** *********** **********

সময়ের চাকা ঘুরে রোহান এখন অনেক বড় অফিসার । ছেলের বাবাও হয়েছে ।ছেলেটার জন্য এত মায়া লাগে আর কারো জন্য এমন লাগে না ।মাঝে মাঝে ভেবে নিজেই অবাক হয় নিজ সন্তানের জন্য এত মায়া লাগে !! ছেলেটার মুখের দিকে তাকালে মনে পৃথিবীর সব সুখ এখানে ।

অফিসে কাজের মাঝে বার বার ছেলেটার কথা মনে হয় ।কাজ থেকে বের হলেই মন চায় ছেলেটার জন্য কিছু একটা নিয়ে যাই । যে দিন কোন কিছু কেনার মত সময় থাকে না সেদিনও কাছের দোকান থেকে দুইটা চকলেট এনেই যখন ছেলেটার হাতে দেয় ছেলেটা এত আনন্দিত হয় সেটা দেখে এত ভাল লাগে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না ।

রোহান নিজের মনেই বলে, আব্বু তুমি ঠিক বলেছ সন্তানের মুখের হাসি এর চেয়ে বড় সুখ একজন বাবার কাছে আর নেই ।

দেখতে দেখতে রোহানের ছেলেটা বড় হয়ে যাচ্ছে ক্লাস ফাইভে পড়ে । যুগ যেমন পাল্টেছে তমনি মানুষের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তন হয়েছে ।

: আমি স্মার্ট ফোন কিনতে চাই পাপ্পা ।

: কেন তোমার স্মার্ট ফোন লাগবে কেন ? তোমার এখনো স্মার্ট ফোন রাখার মত বয়স হয় নি ।

: আমার ক্লাসের সবার স্মার্ট ফোন আমাকে সবাই এটা সেটা বলে টিটকারি করে ।

: তোমার মাম্মা তোমাকে স্কুলে দিয়ে আসে নিয়ে আসে ।এর পর ও তোমাকে একটা ফোন দেয়া হয়েছে যাতে প্রয়োজনে তুমি আমাদের সাথে বা আমরা তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারি ।

এ ছাড়া বাসায় একটা ডেস্কটপ ও একটা ল্যাবটপ আছে তুমি তোমার প্রয়োজন মত ব্যবহার করছ । তোমাকে স্মার্ট ফোন ও দেয়া হবে সময় মত এখন না ।

: না আমাকে এখনি দিতে হবে !

: কেন এটা কি তোমার লিখা পড়ার জন্য দরকার ?

: না তবু আমি চাই ।

: না তুমি এটা এখন পাবা না । এখন এখান থেকে যাও মাহী ।

মাহী রাগ হয়ে বাবার রুম থেকে বের হয়ে যায় । রাতে খাবারে জন্য রোহান ছেলেকে ডাকতে যেয়ে দেখে মাহী ঘুমিয়ে পরেছে ।ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রোহানের বুকার ভিতরটা হাহাকার করে ।

রোহান ছেলের মাথায় হাত বুলায় আর মনে মনে বলে মাহী আমি তোমার বাবা আমি তোমার মঙ্গল চাই, তাই তোমার চাহিদা পূরণ করার মত সামর্থ থাকা সত্বে ও আমি তোমার চাহিদা পূরন করতে পারছি না । এতে তুমি যতটা কষ্ট পেয়েছ তার চেয়ে অনেক বেশী কষ্ট আমি পাচ্ছি ।

রোহানের মনে পড়ে বাবার সেই কথা বাবা হয়ে যখন সন্তানের চাহিদা পূরন করতে পারে না এর চেয়ে বড় কষ্ট আর একজন পিতার নেই ।

রোহান মনে মনে বলে ,আব্বু তুমি ঠিক বলেছ এর চেয়ে বড় কষ্ট আর নেই, ছেলেটার জন্য খুব মায়া লাগছে অন্তরটা ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে তবু আমি ছেলের ভবিষ্যত মঙ্গলের জন্য তাকে একটা স্মার্ট ফোন দিতে পারছি না ।

সময়ের পরিবর্তনে আমরা বাবা,থেকে আব্বু , আব্বু থেকে ড্যাডি,ড্যাডি পাপ্পা হয়েছি কিন্তু প্রতিটা বাবার অন্তরে সন্তানের জন্য মায়া একই রকম আছে ----------রোহানের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে ।



সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০১৭ রাত ৮:২৭
২৪টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটু এলোমেলো কথা আর একটু প্রকৃতির ছবি

লিখেছেন ইতি সামিয়া, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:০০



আমি আমার ভাই বোনের বিচ্ছু ছেলে মেয়েদের বলি আমি মরে গেলে খবরদার যেন কাউকে কাঁদতে না দেখি!! যদি কাউরে কাঁদতে দেখি তাইলে তোদের একেকটার খবর আছে!! চড় মেরে দাঁত... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাছ কাটা ব্যাটা

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:১৮



আমার গল্পের নায়কের নাম সবুজ। অবুঝ বালকের মতই তার বয়স নয়। সে ভাল ইনকাম করে, অন্তত আমার থেকে বেশি।
কাওরান বাজার আর শেওড়াপাড়া এলাকায় মাছ বাজারে সে মাছ কাটে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়, এক বয়সখেকো রাক্ষস

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৫৯




আমি যতবার পুরোনো দিনের সিনেমা দেখতে বসি- হার্টথ্রব ওয়াসিম, নায়করাজ রাজ্জাক- অমর সিরাজউদ্দৌলা আনোয়ার হোসেন, এমনকি তারুণ্যে যে এটিএম শামসুজ্জামানকে খুন করতে ইচ্ছে হতো- আর আমার স্বপ্নের অলিভিয়া, কবরী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

নায়ক রাজ্জাক এর জন্য এত হা-হুতাশ করার কি আছে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ রাত ১১:৩০



নায়ক রাজ্জাক মারা গেছেন। এতে এতো হা-হুতাশ করার কি আছে? তিনি ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন- এটা অনেক বড় ব্যাপার। ইতিহাসে দেখা যায়- অনেক গুনী মানুষ এত দিন বাঁচেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ ট্রিবিউট টু লিজেন্ড নায়করাজ রাজ্জাক!!!

লিখেছেন রেজা ঘটক, ২২ শে আগস্ট, ২০১৭ ভোর ৪:৩০



১৯৮৮ সাল। বিএমএ লং কোর্সে পরীক্ষা দিতে খুলনা গেছি। খুলনার জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্টে আমার পরীক্ষা ছিল। আগেই পরিকল্পনা ছিল পরীক্ষা শেষেই বন্ধু আজিজের সাথে ঘুরবো। আজিজের গার্লফ্রেন্ড পড়ে তখন খুলনার সুলতানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×