somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজনৈতিক ভেনচার (প্রথম অংশ)

১১ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজনৈতিক ভেনচার (প্রথম অংশ)

রাজনৈতিক ভেনচার বাস্তবায়নের ক্লাসিক্যাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের নিজস্ব কর্মকান্ডে। ইংরেজ বেনিয়াদের সেই সময়কার কোম্পানী বাণিজ্য নীতিই বর্তমান সময়ের কপোর্রেট অর্থনৈতিক ম্যানেজমেন্ট। আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় সেই বাণিজ্যিক কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বেনিয়াদের প্রত্ক্ষ্যভাবে লড়তে হতো; ইলেকট্রনিক মানি আবিষ্কার হবার পর এখন আর তার প্রয়োজন নেই। শিল্প বিপ্লবের পর শিল্পে একচেটিয়া উৎপাদন বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন নগদ অর্থের। নগদ অর্থ তৈরী হয় টাকা-পণ্য-টাকা সার্কিট অনুসরন করে। সংক্ষেপে এই সার্কিট যে কাঠামোর সাহায্যে পরিচালিত হয় তার নাম ব্যাংক। তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত দেশসমুহ নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিও দ্বারা; উপরন্তু, এটা সকলেই জানে যে এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারীরা ব্যবসা ও বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রন করে থাকে।

“পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ” বইতে অধ্যাপক রজনীকান্ত রায় লিখেছেন, “এ কথা ভাবলে ভুল হবে যে একমাত্র ফিরিঙ্গী বণিকরাই রাজনীতির কলকাঠি নাড়তে জানতো, আর দেশীয় বণিকেরা এ ব্যাপারে নিতান্তই অদক্ষ ও অপটু ছিল। তবে তুলনামূলক বিচারে ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসী কোম্পানীর সঙ্গে জগৎশেঠ, খাজা ওয়াজেদ ও আমীরচান্দ এদের বড় একটা তফাৎ চোখে পড়বে। দেশীয় শেঠ-সওদাগররা যতই বড় হোননা কেন, কেল্লা বসিয়ে (বাই-পাস গর্ভমেন্ট তথা নিজেদের দুর্গ, নিজেদের আইন আদালত, নিজেদের নৌবহরের আওতায় থেকে নিষ্কর বাণিজ্য চালানোর জন্য ইংরেজরা যুদ্ধ করতে তৈরী ছিল), নৌবহর সাজিয়ে, বাণিজ্য করার ফিরিঙ্গী রীতি তারা আয়ত্ত করতে পারেননি (যেমন বর্তমান সময়ের রাজনীতি ও অর্থনীতি জানে না কিভাবে বিশ্বয়াণের নামে শোষন ও শাসন করবার কৌশল প্রতিহত করা যায়)। বস্তুতপক্ষে সিরাজউদ্দৌলাহর সঙ্গে ইংরেজদের যে সংঘর্ষ বাঁধল, তার মুলে ছিল ফিরিঙ্গীদের বাণিজ্য করবার ভিন দেশী রীতি, তথা “ডমিনেশান স্ট্রাট্রেজি”।

সেদিনের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর লর্ড ক্লাইভরা কি বিচনক্ষণতার সাথে তাদের মিশন চালিয়েছে তার চমকপ্রদ বয়ান রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। বাংলার নবাবকে চ্যালেঞ্জ করে ইংরেজ কোম্পানী কিভাবে টাকশাল গড়ে তোলে তা বর্ণনা করেছেন রজনীকান্ত রায়, তার “পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ” বইতে। তিনি লিখেছেন “গাঙ্গেয় উপত্যকার সমস্ত টাকা-পয়সার লেনদেন ও বেচাকেনা ছিল জগৎ শেঠের নিয়ন্ত্রণে। ‘ইনভেষ্টমেন্ট’ আশানুরূপ না বাড়ার পেছনে টাকার বাজারের উপর (অন্যান্য পণ্যের মতো সোনা-রূপা, টাকা-কড়ি, এগুলিও পণ্য ছিল। এসব নিয়ে যে বেচাকেনা হতো এবং সুদে টাকা দিয়ে ও হুন্ডির মাধ্যমে যে টাকা সরবরাহ করা হতো, তাকে “অষ্টাদশ শতকের টাকার বাজার” বলা হতো) দখলের অভাব কোম্পানীর কর্মকর্তারা খুবই অনুভব করছিল। কোম্পানী মাদ্রাজ থেকে আর্কট রূপাইয়া এনে “ইনভেস্টমেন্ট” জিনিষ খরিদ করতেন। কিন্তু আর্কট রূপাইয়ার দাম খাজনা খানায় গ্রাহ্য সিক্কা রূপাইয়ার চেয়ে কম ছিল, এই জন্যে অনেক বাটা বা ডিসকাউন্ট দিতে হতো। সিক্কার তুলনায় আর্কট বা অন্যান্য প্রকার প্রচলিত মুদ্রার হার কি হবে তা শেষ পর্যন্ত জগৎশেঠের দফতর হতে নিয়ন্ত্রিত হতো। এতে কোম্পানীর স্বার্থে আঘাত লাগতো। এ সব সমস্যা ছাড়াও জলপথে বাইরে থেকে কোম্পানী যে রুপা বা টাকা আনতেন তা কোলকাতার ইনভেস্টমেন্টেই ফুরিয়ে যেত। জগৎ শেঠের একচেটিয়া টাকার ব্যবসা ভাঙ্গতে আলিবর্দী’র নবাবীর শেষ দিকে ইংরেজ কোম্পানী উঠে পড়ে লাগলেন। ভারতবর্ষের সর্বত্র এরা ব্যবসা করতো কিন্তু শুল্ক দিত না। বিনা শুল্কে ব্যবসার দরুন কোম্পানী তার অংশীদারদের বা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বাবদ প্রতি বছর দেড় কোটি রুপাইয়া ইংল্যান্ডে প্রেরণ করতো। ভারতবর্ষ থেকে অর্জিত বাণিজ্য মুনাফা তখন ইংল্যান্ডের কলকারখানায় পুঁজিরূপে বিনিয়োগ করা হতো। কারখানার উৎপাদিত পণ্য ভারতবর্ষের বাজারে বিক্রির জন্য আনা হতো। ভারতবর্ষ পরিণত হলো বাণিজ্যের “মৃগয়াক্ষেত্র” হিসেবে। ভারতবর্ষের মাটিতে উৎপাদিত কাঁচামাল (তূলা) ইংল্যান্ডে প্রেরিত হতো, সেই কাঁচামাল শিল্পদ্রব্যে (কাপড়) পরিণত হয়ে আবার ভারতবর্ষের বাজারে বিক্রি হতো। ফলে দেশীয় শিল্প বিকাশের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যায় যার ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষে স্বাধীনচেতা বুর্জোয়া সৃষ্টির পথও বন্ধ হয়ে যায়।

(তথ্য সহায়তা: "গ্রামীণ অর্থায়ণ কেন্দ্র")

চলবে-
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৩৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×