অনেকদিন পর পরিচিত নম্বরটি থেকে কল আসতেই মনে হলো এইরে এইবার খবর আছে ... কি জানি একটা কাজ করা হয়নি ... কিন্তু কি যে করা হয়নি তা আর মনে নাই ... যাই হোক, মোটামুটি একটা অস্হিরতা নিয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই শুরু হয়ে গেল ঝাড়ি ....
= দেশ থেকে এসে বুঝি একবারও এদিকে আসা যায় না ?
>> না মানে , আসলে ....
= জানি তো অনেক ব্যাস্ত হয়ে পড়েছ, আমাদের কারো কথা মনে নাই ...
>> সে কি কথা ? আরে না না ...
= না না করলে চলবে না, মনে যদি থাকতো তাহলে দেখা করতে তো আসতে পারতে
>> সেটা অবশ্য ঠিক ... কিন্তু ...
= কিন্তু মানে ? আমরা কি ভুলে যাওয়ার মত মানুষ ?
>> আরে তা হবে কেন ?
= আর কিছু বলার নেই ... টা টা
>> এ্যাঁ ...
(ফোনটা দেখি তখনো কাটেনি ... তাই কান লাগিয়ে শুনার চেষ্টা করছিলাম কিছু একটা .... একটু খানিক পরে ফিসফিসিয়ে শুনতে পেলাম )
= এদিকে কিন্তু ভয়ংকর অবস্হা হয়ে আছে , জলদি বাসায় আসো নাইলে তোমার খবর আছে ... পরে কিছু হলে আমি কিন্তু আর বাঁচাতে পারবো না ...
এইরে সেরেছে , এবার সত্যই ই আমার খবর আছে নাইলে আমার দেড়ফুটি কোকড়াচুলওয়ালীর মা এই কথা বলার প্রশ্নই আসে না ... সুতরাং আর কাল ক্ষেপন না করে হুটোপুটি করে রেডি হয়ে তাড়াহুড়া করে বের হতেই হঠাৎ মনে পড়লো আরে , ঘটনা মনে পড়েছে ... জলদি করে শোবার ঘরে ঢুকে ড্রয়ারে রাখা ছোট্ট প্যাকেট টা নিয়ে আমার পঙ্খিরাজে উড়ে রওনা দিলাম জানের টুকরার বাসায় ...
ডিং ডং ...
কেউ দরজা খুলে না
আবার দিলাম .... ডিং ডং ডিং ডং ...
এবার খটাখট কেউ একজন ধুম করে দরজা খুলে বলে উঠলো --
:: কারো বাসায় গিয়ে একবার বেল দিতে হয়, বুঝসো ?
>> না মানে একবারই দিতে চাইসিলাম , কিন্তু কেউ আসছিলো না তো তাই ...
:: স্যরি বলো
>> অনেক স্যরি
:: অনেক বলতে বলিনি তো , শুধু স্যরি বলতে বলেছি ...
>> স্যরি ... এখন কেউ কি আমার কোলে আসবে ?
:: নাহ , আসবে না ... ভিতরে আসো ...
গুটি গুটি পায়ে দেড়ফুটির সাথে হেটে ভিতরে চুকে ড্রইংরুমে বসতেই খেয়াল হলো তার লম্বা কোকড়া চুলের মধ্যে কি জানি আটকে আছে ... আমাকে ঐদিকে একটু খেয়াল করতে দেখেই চিৎকার করে উঠলো .....
:: সব দেখা লাগবে না , চুপ করে বসে থাকো ....
ঝাড়িটা খেয়ে আমি বেমক্কা চুপসে যাওয়ার মত করে কাচুমাচু করে বললাম ,
>> ওখানে কি হইসে ? আমি না হয় দেখবো না, কিন্তু কেউ কি আমাকে বলবে ?
:: না , কেউ বলবে না ...
>> (দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম) আচ্ছা ঠিকাছে, আমার মত পচা মানুষের কথা আর কি কেউ শুনবে ?
:: না শুমবে না ...
>> তাকে তার প্রিয় চুলটা একটু ধরে দেখতেও দিবে না ?
:: না দিবে না
>> কেউ কি আমার কোলে বসে চকলেট খাবে না ?
:: কি চকলেট আনসো ?
বুঝলাম এইবার বরফের পাহাড় গলা শুরু করবে .... পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুঠোভর্তি এত্তগুলো চকলেট বের করতেই দেখি সে আমার কাছে চলে এলো ..... চকলেট দেয়ার ফাঁকে কোন সময় যে তাকে কোলে নিয়ে ফেলেছি সে তো জানে ই না , একটু পরে দেখি তার এলোমেলো কোকড়াচুলের ফাঁকে জড়িয়ে আছে আমার অতি পছন্দের চিরুনিটা , দেশে যাওয়ার আগে যেটা সে আমার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছিল আমি না থাকলে সে নাকি ঐটা দিয়ে নিজের চুল নিজেই আঁচড়াবে বলে ... আলতো করে ওটা ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেই আবার ফোস করে উঠলো পিচ্চিটা .....
:: হাত দিবানা , হাত দিবা না আমার চুলে
>> ওটা তো চুলে জড়িয়ে আছে , ওটা খুলে পরে আচড়ে দেই চুলটা ?
:: না না না .... ধরবানা ঐটা
>> কোনটা ধরব না ?
:: চুলনি ধরবা না (এইটা ওর দেয়া চিরুনির নাম)
>> আচ্ছা আমি তোমার চুলনী ধরবো না , কিন্তু চিরুনি টা বের করে দেই ? নাইলে আমার রাজকন্যার চুল যে নষ্ট হই যাবে ...
হঠাৎ তার মনে হলো হাতের চকলেট শেষ, অমনি গাল ফুলায়ে বলে উঠলো
:: আমি যাই ...
>> আরো আছে তো চকলেট ওগুলো কে খাবে ?
পকেট থেকে বাকিগুলো বের করে ওর হাতে দিতেই সে চকলেটের রাজ্যের হারিয়ে গেল ..... সেই সুযোগে কোকড়াচুলের মধ্যে থেকে চিরুনী অভিযান সম্পন্ন করে বিজয়ীর বেশে ওটাকে সামনে ধরতেই চোখ পাকিয়ে জানটের টুকরাটা বলে উঠলো--
:: চুলনী খুললা ক্যান ? , লাগায়ে দেও .....
>> ওর বদলে যদি অন্য কিছু দেই তাইলে হবে না ?
:: আমার চুলনী লাগায়ে দিবা ?
>> এট্টা জিনিস দিতে চাচ্ছিলাম তো .....
:: আমি কিচ্ছু নিবো না .....
বলেই এক লাফে কোল থেকে নেমে আমার হাত থেকে চিরুনীটা নিয়ে এক দৌড়ে ওর রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো -- ধড়াম !!!
পাশ থেকে ওর আম্মু জিজ্ঞেস করলো --
= এনেছ জিনিসগুলো ?
>> সবগুলো তো নেই , কিন্তু কয়েকটা আছে ...
= ওগুলো না পেলে আজ ও তোমার কোনো কথাই শুনবে না বলে দিয়েছে আগেই
পকেট থেকে ছোট্ট প্যাকেট টি খুলে ছড়িয়ে দিলাম পাশে রাখা একটা কালো ডাইরির উপরে , জিনিসগুলো ও দেখতে চেয়েছিলো , বাংলাদেশের ওগুলো কেমন দেখতে হয় জানতে চেয়েছিল আর আমি কথা দিয়েছিলাম আসার সময় ওগুলো নিয়ে আসবো .... আসার ঠিক শেষ মুহুর্তে মনে পড়ায় কাছে যেগুলো ছিলো সেগুলো নিয়েই চলে আসতে হয়েছিল .... এখন কি আর করা ... ওগুলোই সামনে সাজিয়ে দিয়ে একটা বড় টিস্যু পেপার দিয়ে ঢেকে পুচ্চির আম্মুকে বললাম
>> এবার ডেকে নিয়ে এসো ...
= আমি শুধু আনবো বাকিটা তুমি সামলাবে কিন্তু
>> আচ্ছা ঠিকাছে ....
আম্মুর কোলে ছটফট করতে করতে এসে আমার জানের টুকরা দেড়ফুটি কোকড়া চুলওয়ালী টেবিলের সামনে দাড়াতেই বললাম
>> তুমি শুধু টিস্যুটা সরায়ে দেখ কি আছে ওখানে , আর কিচ্ছু করতে হবে না
অভিমানে গাল ফুলিয়ে একটানে টিস্যুটা সরিয়ে দিতেই বেরিয়ে পড়লো ওর জন্য আনা বাংলাদেশের কয়েকটি টাকার নোট আর পয়সা ... এই না দেখে ছলছল করা বড় বড় চোখে হঠাৎ খুশির ঝিলিক দেখে সাথে সাথে কাছে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরতেই ছোট্ট হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কানে কেন বলে উঠলো -- তুমি এট্টা অনেক যন্তন্না ....
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০১০ রাত ৮:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


