বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক গোষ্ঠী হচ্ছে সেনা শিল্প গোষ্ঠী।
পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজির যে মৌলিক চরিত্র – সেনাবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ট্রাষ্ট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যাতিক্রম ঘটেনি।ছোট ব্যবসা যেমন মাঝারী ব্যাবসায় উন্নীত হতে চায় – মাঝারী ব্যবসা যেমন বড় ব্যবসায় রুপান্তরিত হতে চায় – তেমনই উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যক বাসনা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে দেখা গেছে।
ফাস্টফুড থেকে সিমেন্ট তৈরী , সাধারণ হোটেল থেকে বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেল , ব্যাংক , সিএনজি – পেট্রল , বৈদ্যূতিক বাতি , পাখা, জুতা এসবকিছুর ব্যবসাতেই এখন সেনাবাহিনীর নাম যুক্ত রয়েছে। আর, সেনাবাহিনীর প্রস্তাবিত প্রকল্পের তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ। যেমন তাঁদের আকাঙ্খা রয়েছে নিজস্ব একটি বীমা কোম্পানীর। পরিকল্পনায় আছে ওষুধ তৈরীর কারখানা, বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্র, প্যাকেজিং, চট্টগ্রামে আরেকটি পাঁচতারা হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি।
সেনা কল্যাণ সংস্থার সচল প্রতিষ্ঠানগুলো:মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরী , ডায়মন্ড ফুড ইন্ডাষ্ট্রিজ , ফৌজি ফ্লাওয়ার মিলস , চিটাগাং ফ্লাওয়ার মিলস , সেনা কল্যাণ ইলেক্ট্রিক ইন্ডাষ্ট্রিজ , এনসেল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড , স্যাভয় আইসক্রিম , চকোলেট এন্ড ক্যান্ডি ফ্যাক্টরী , ইষ্টার্ণ হোসিয়ারী মিলস , এস কে ফেব্রিক্স, স্যাভয় ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী , সেনা গার্মেন্টস , ফ্যাক্টো ইয়ামাগেন ইলেক্ট্রনিক্স , সৈনিক ল্যাম্পস ডিষ্ট্রিবিউশন সেন্টার , আমিন মহিউদ্দিন ফাউন্ডেশন , এস কে এস কমার্শিয়াল স্পেস , সেনা কল্যাণ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স , অনন্যা শপিং কমপ্লেক্স , সেনা ট্রাভেলস লিমিটেড , এস কে এস ট্রেডিং হাউস , এস কে এস ভবন – খূলনা , নিউ হোটেল টাইগার গার্ডেন , রিয়েল এস্টেট ডিভিশন – চট্টগ্রাম এবং এস কে টেক্সটাইল।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের ষোলটি প্রতিষ্ঠান:আর্মি শপিং কমপ্লেক্স , রেডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল , ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটিড , সেনা প্যাকেজিং লিমিটেড , সেনা হোটেল ডেভলেপমেন্ট লিমিটেড , ট্রাষ্ট ফিলিং এন্ড সিএনজি ষ্টেশন , সেনা ফিলিং ষ্টেশন- চট্টগ্রাম , ভাটিয়ারী গলফ এন্ড কান্ট্রি ক্লাব , কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব , সাভার গলফ ক্লাব , ওয়াটার গার্ডেন হোটেল লিমিটেড - চট্টগ্রাম , ট্রাষ্ট অডিটোরিয়াম এবং ক্যাপ্টেনস ওর্য়াল্ড।
সামরিকবাহিনী ইতোমধ্যেই যেসব নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং প্রকল্পে জড়িত হয়ে পড়েছে তার সম্পদমূল্য অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘস্মারকে আনুষঙ্গিকভাবে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো :ঢাকায় আবাসিক হোটেল এবং বিপণী কেন্দ্র , বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানী, জঙ্গল বুট ফ্যাক্টরী, চট্টগ্রামে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, কাদিরাবাদে একটি চিনি কল, যশোরে ফ্লাওয়ার মিলস, ফাউন্ড্রি এবং পেট্রল পাম্প, গলফ ক্লাব, বিভিন্নজায়গায় বিপণী কেন্দ্র, কার সার্ভিসিং এবং ওয়াশিং সেন্টার, রেন্ট এ কার সার্ভিস, প্যাকিং এন্ড কুরিয়ার সার্ভিস, নারায়ণগঞ্জে ফ্যাব্রিক ডায়িং এন্ড স্ক্রিনপ্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জে হোশিয়ারী মিলস, সব সেনানিবাসে ব্রাস এন্ড মেটাল ইন্ডাষ্ট্রি, কুমিল্লায় বিদ্যূৎ প্রকল্প, রংপুরে ওষুধ শিল্প এবং ক্লিংকার প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প, বগুড়ায় সিমেন্ট প্রকল্প, সিলেটে রেস্তোরা এবং পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সি, ঢাকায় হাসপাতাল , সব সেনানিবাসে মৎস্যচাষপ্রকল্প এবং পোল্ট্রি খামার।
উপমহাদেশে সেনাবাহিনীর বাণিজ্যে জড়িত হবার ইতিহাসের সূচনা পঞ্চাশের দশকে। যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের জন্য গঠিত যে তহবিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছিলো তাতে পাকিস্তানের অংশটি পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করার পর পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী ভারত সরকারের মতো যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের মধ্যে তা বিতরণ না করে তা দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠা করে।পঞ্চাশের দশকেই প্রথমত,
পাকিস্তানের সামরিকবাহিনীর একটা আলাদা এবং জোরালো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিলো; আর দ্বিতীয়ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একটা ভিন্নধরণের বাহিনী হতে চেয়েছিলো যারা শুধুমাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করার কাজেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে রাজী ছিলো না বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও একটা ভূমিকার কথা ভাবছিলো। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে, ১৯৫৩-৫৪ তে এভাবেই ফৌজি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়।
পাকিম্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যে বৈষম্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পৃথক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ সেই বৈষম্য থেকে সেনাবাহিনীও বাদ যায় নি। ফলে, ফৌজি ফাউন্ডেশনের বেশীরভাগ সম্পদই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার হিসাবে যা পাওয়া যায় তার পরিমাণ ছিলো সামান্য। ১৯৭২ এ যখন বাংলাদেশ সেনাকল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার মূলধন ছিলো আড়াই কোটি টাকার মতো৻ তবে, মাত্র চারবছরের মধ্যেই ঐ সংস্থার নীট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় প্রায় একশো কোটি টাকা।
গত আটত্রিশ বছরে ধারাবাহিকভাবে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছেসশস্ত্রবাহিনীর।সশস্ত্রবাহিনীর সংস্থাটির অধীনে এখন রিয়েল এষ্টেট এবং শিল্পের সেবামুখী চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও রয়েছে।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্য্যত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে ইতোমধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে – যেমন ফৌজি চটকল এবং ফৌজি রাইস মিলস।
১৯৯৮ সালে এই ট্রাষ্ট কোম্পানী আইনে রেজিষ্ট্রি করা হয়। এই ট্রাষ্টের বিনিয়োগও যেমন বিপুল , তেমনি তার বাণিজ্যিক আকাঙ্খাও বলা চলে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী
সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর আগ্রহের কারণে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের কয়েকটি লোকসানী প্রতিষ্ঠানকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এরমধ্যে সেনাবাহিনী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেডের স্থাপনার মধ্যেই প্রতিষ্ঠা রেছে আরো তিনটি নতুন বাণিজ্যিক ইউনিট। এর একটি হলো বিএমটিএফ সিএনজি কনভার্সন লিমিটেড এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিএমটিএফ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র৻ আর তৃতীয়টি হলো হংকংয়ে রেজিষ্ট্রিকৃত প্রতিষ্ঠান ট্রেড মিউচূয়াল হংকংয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফুটওয়্যার এন্ড লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড।
আর নৌবাহিনীর পরিচালনায় রয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এবং ডকইয়ার্ড অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড।
কল্যাণ ট্রাষ্টের বাইরে প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর এভাবে সরাসরি বাণিজ্যে যুক্ত হবার ইতিহাস হচ্ছে খুবই সাম্প্রতিক – মাত্র বছর দশেকের।
সেনা কল্যাণ সংস্থার বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের প্রসার অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও আটানব্বুই সালের জুন মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান মরহুম লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের সময় প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট।
অবশ্য বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘ স্মারকে যেসব লক্ষ্য বর্ণিত আছে তার প্রথমটিতে বলা হয়েছে :
‘‘সাবেক সেনাসদস্য এবং তাদের সন্তান ও পোষ্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও তার বিকাশের ব্যবস্থা করা।
আর দ্বিতীয় লক্ষ্যটিতে বলা হয়েছে সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত ও শহীদ পরিবারের কল্যাণের কথা।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের এই সংঘ স্মারক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যিক বাসনা নিয়েই এই ট্রাষ্ট প্রতিণ্ঠিত হয়েছে।
সশস্ত্রবাহিনীর নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণের পিছনে পাকিস্তান যে শুধু একটি মডেল হিসাবে বিবেচিত হয়েছে তাই নয় – বরং অন্তত একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।
তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া,বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী ওয়েব পেইজ, বি.বি.সি।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী
বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক গোষ্ঠী "সশস্ত্রবাহিনীর" ব্যবসা কিস্তি-১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এমন কেন?
একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।