গত ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ও ১৩ডিসেম্বর বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ইশতোহার রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বচন পূর্ববর্তী তামাসা ছাড়া কিছুই না। অতীতেও আমরা বহু নির্বচনী ইশতোহার দেখেছি। এবারও নির্বচনী ইশতোহারগুলোর একই পরিনতি হবে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নির্বচনী ইশতোহারে প্রচুর মিল রয়েছে। এই দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বচনী ইশতেহার বিষয়ক সবচে’ বড় মিল হল দুটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গেলে ইশতেহারের কথা ভুলে যায়। তাই আমি কখনোই নির্বচনী ইশতেহারে আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু এবার খবরে প্রতিবেদনে ইশতেহারগুলোর সার সংক্ষেপ দেখে বেশ কৌতুককর জিনিস বলে মনে হয়েছে, এই জিনিস আমরা আগেও চেখে দেখেছি, এইসব গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি আমরা আগেও পেয়েছি। এবং এর পরিণতিও আমাদের জানা।
চমৎকার সব গালভরা বুলি সমৃদ্ধ ইশতেহার দুটো পড়ে বুঝলাম যে, যদি এই দুটোর কোন একটিও পুরো বাস্তাবায়ন হয় তবে আগামী পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে আমাদের দেশটি স্বর্গপুরীতে পরিণত হবে। কিন্তু আমরা জানি যে অবস্থা খুব সামান্যই উন্নতি হবে। ইশতেহারদুটোর বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আমি একমত একই সাথে আরো একমত যে এগুলোর বাস্তবায়ন হবে না। ইশতেহার দুটোর যেসব বিষয়ে আমি একমত হতে পারি নি ও যেসব বিষয়ে আমার কিছু বলার আছে তা-
আওয়ামী লীগের ইশতেহার:
১. ইশতেহারের ২ ধারায় বলা আছে, “রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের ঘুষ, দূর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ধারখেলাপী, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, কালোটাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”।
৫. ৬ ধারায় বলা আছে, “দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে”।
মাননীয় নেত্রী, আপনি যদি এসব বাস্তবায়ন করেন তবে আপনার দল দূর্বল হয়ে যাবে। আপনার কর্মী, নেতা, দাতা কেউই আপনাকে সমর্থন দেবে না। আপনার বিশাল কর্মীবাহিনী যে পাড়ায় পাড়ায় মিছিল করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে, তা কিসের জন্য? জেনে রাখুন দেশকে ভালবেসে নয়। কিছু বাড়তি সুবিধা যদি তারা না পাবে তবে খাটবে কেন? আপনার দল ক্ষমতায় যাবে নেতারা সব টেন্ডার বাগিয়ে নেবে, তারা চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদীতে সুবিধা পাবে, পাবে সামাজিক ক্ষমতা যার প্রায়ই স্বার্থজনিত কারনে অপব্যবহার হবে এই জন্যই তো। আপনি যদি ধারাগুলো বাস্তবায়ন করেন তবে তারা ক্ষুব্ধ হবে, মুখ ফিরিয়ে নেবে। মাননীয় নেত্রী, ইশতেহারের এই আত্মঘাতী ধারাদুটো পাল্টে একটি বাস্তবসম্মত ধারা যোগ করুন।
২. ধারা ৭.৪: নেত্রী, খেয়াল রাখবেন আপনার নেতারাই আবার ভূমিহীন, মৎসজীবী সেজে না যায়। উল্লেখ্য উক্ত ধারায় ভূমিহীন, প্রকৃত মৎসজীবী দের জন্য খাস জমি, জলাশয়ের বন্দোবস্ত করা হবে।
৩. ধারা ৭.১-এ বলা হয়েছে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। আবার, রুপকল্পে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। নেত্রী, আগে স্থির হোন যে কত সালের মধ্যে এটি করবেন (নাকি এটি পৃন্টিং ভুল)।
ধরা ৪-এ বলা আছে, ‘২০১৩ সালের মধ্যে দারিদ্রসীমা ও চরম দারিদ্রের হার যথাক্রমে ২৫ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে"।
আমার সাধারন জ্ঞান থেকে বুঝি এত অল্প সময়ে (মাত্র চার বছর) এগুলো সম্ভব নয়। তবে আমাদের নেত্রী কাগজ কলমের অংকে খুব পারদর্শী।
৪. রুপকল্পে বলা হয়েছে, “২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে নীট ভর্তির হার হবে ১০০ শতাংশ।“ মাত্র দুই বছরে এটিও সম্ভব নয়।
৫. ৫.৪ ধারায়, “ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে"। কিন্তু ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যাগুরুদের কি হবে? বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কখনোই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার বাস্তবায়ন হয় নি। এটা অস্বীকার করবেন কিভাবে? কোন রকম শ্রেনীকরণ ব্যতিত সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করুন।
৬. ১৫.৬ ধারায়, "প্রাচ্য ও পশ্চাত্যের সংযোগস্থল হিসেবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষে সর্বাধুনিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নতুন বিমানবন্দর নির্মান করা হবে"। যায়যায়দিনে প্রকাশ (১৩.১২.০৮) এটি নির্মান করা হবে ঢাকায়। আহ! কি চমৎকার! শুনলে মনে হয় নেত্রী কত আন্তরিক আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে। কিন্তু সুধীগণ, ভেবে দেখবেন কি আমাদের নতুন আরেকটি বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা কতটা প্রয়োজন? একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মানে কত টাকা অপচয় হবে এবং কতটা যৌক্তিক? যেটি আছে সেটিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুবিধা বৃদ্ধি ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক উন্নয়নের মাধ্যমে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই ভাল নয় কি? এবং একই সাথে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দর যেমন, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনার বিমানবন্দরের মান উন্নয়ন করা অধিক প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রামের বিমানবন্দর অধিক আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনার উপযোগী করা জরুরী। এতে ঢাকার উপড় চাপ কমবে। উত্তর বঙ্গের দিকেও তাকানো উচিৎ।
বিএনপি’র ইশতেহার:
বিএনপি’র ইশতেহারটিতে নেত্রী বিএনপি’র বিগত শাসনামলগুলো স্মৃতি রোমন্থন ও বর্তমান ত্বাবধায়ক সরকারের মুন্ডুপাত করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। বিএনপি’র ইশতেহার আওয়ামী লীগের ইশতেহারের মতই গতানুগতিক। তবে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের মত বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হয় নি।
১. ৩৬(ক) ধারায়, “৩০ মে জাতীয় শোক দিবস ও সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করা হবে"। ৩০ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু দিবস। স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ মারা গেছেন, এখনো সীমান্তে প্রায়ই প্রতিবেশী সীমন্তরক্ষীদের হাতে মানুষ মারা যায়। প্রতিদিন অপঘাতে কত আপন জন মারা যায়। তারপর দু চার জন রাষ্ট্রপতির মৃত্যূতে আমাদের বাড়তি শোকের অনুভুতি জাগে না। আর তার জন্য ছুটির তো কোন দরকারই নেই। বছরের ৩৬৫ দিনই যে জাতির জন্য শোকের, তার আবার আলাদা করে শোক দিবস কিসের?
২. ৩৬(খ) ধারায়, “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ছুটি বহাল করা হবে”। এটিও চরম অপ্রয়োজনীয়।
আগামী নির্বাচন প্রায় পুরোটাই জোটবদ্ধ। জোটবদ্ধ দলগুলো আলাদা আলাদা ইশতেহার প্রকাশ করবে। ক্ষমতায় গেলে একই জোটভুক্ত ভিন্ন ভিন্ন দল কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন ইশতেহার বাস্তবায়ন করবে? নাকি স্কুল পার্যায়ের নোট বইয়ের মত করে ইশতেহার প্রাকশ করবে (কোন কোন প্রশ্নের জবাবে লেখা থাকে ‘সারমর্ম দেখ’)? যেমন মহাজোটভুক্ত অন্যান্য দল নির্বচনী ইশতেহার প্রাকশ করবে, “আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দেখুন”। চারদলীয় ঐক্যজোটভুক্ত অন্যান্য দল, “বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহার দেখুন”।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



