প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন: একটি অসুস্থ চিন্তা
ইশতেহারে বলা হয়েছে, “পনের কোটি মানুষের এই সমস্যাসংকুল দেশ এককেন্দ্রিক সরকারের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে
শাসন করা সম্ভব নয়। তাই দেশকে ৮টি প্রদেশে বিভক্ত করা হবে। প্রত্যেক প্রদেশে একটি প্রাদেশিক পরিষদ ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা থাকবে। প্রাদেশিক সরকারই সংশ্লিষ্ট প্রদেশের উন্নয়নসহ সার্বিক শাসন কার্য পরিচালনা করবে”|
প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য :
* তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ গড়ে তোলা।
* প্রশাসনকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া।
* বিচার ব্যবস্থা সহজ করা।
* সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
* স্থানীয় উনড়বয়ন স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করা।
* সারাদেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
* নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের প্রয়াস গ্রহণ করা।
* স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধান করা।
* স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
* অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করা এবং স্থানীয় সম্পদের উনড়বয়ন ঘটানো।
* স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
* বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো যেখানে প্রাদেশিক ব্যবস্থা রয়েছে- তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া।
(প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কিত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রণীত একটি দিকনির্দেশনা সম্পর্কিত পুস্তিকায় বিস্তারিত ধারণা দেয়া হয়েছে।)
আমার বক্তব্য: এই দেশের জনসংখ্যা পনের কোটি হলেও দেশটির আকার ছোট। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এই দেশে লোকসংখ্যা পচিশ কোটি হলেও এককেন্দ্রীক সরকার দিয়েই এ দেশ শাসন করা সম্ভব। লেকসংখ্যার দোহাই একটি অথর্ব যুক্তি। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য যা দেখানো হয়েছে তা প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু যদি আন্তরিকতা থাকে তবে এককেন্দ্রীক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব।
প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম উদ্দেশ্য :
* তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ গড়ে তোলা।
এটি একটি থোরা যুক্তি। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ গড়ে তোলা’র জন্য প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা আবশ্যক নয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ গড়ে তোলা হয় এখনি সম্ভব নয় কখনোই সম্ভব নয়। এককেন্দ্রীক সরকার ব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ উঠে আসছে না যে কারনে প্রাদেশশিক সরকার ব্যবস্থায় তা হবে না একই কারনে। এই দেশে বিভিন্ন স্তরে হাজার খানেক রাজপরিবার আছে। যারা এদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি দখল করে রেখেছে। এই পরিবারগুলোর রাজতান্ত্রিক মনোভাবের কারনেই তৃণমূল হতে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ উঠে আসতে পারছে না। এই রাজপরিবার গুলোর প্রভাব হ্রাস করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মনোভাব সৃষ্টি করা না গেলে কোন দিনই তৃণমূলের সম্পদ আহরণ করা যাবে না। আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দুটি রাজপরিবারের সম্পদ। যদি এই দুটি রাজপরিবার যদি দলীয় প্রধানের পদ না ছাড়ে তবে অদুর ভবিষ্যতে এদের বাইরের কাউকে আমরা সরকার প্রধান হিসেবে পাব না। বিভিন্ন নির্বাচনী আসনেও একই অবস্থা। এই দলগুলোর উপজেলা কমিটিতেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। পিতা পর পূত্র প্রধানের পদ অলংকৃত করেন। এই সব পরিবারগুলোর প্রভাবের কারনে তৃণমূল হতে প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ উঠে আসার পথ অনেকটাই সংকীর্ণ। তাছাড়া রাজনীতিতে ব্যাপক দুর্বিত্তায়নের ফলে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা রাজনীতিতে আগ্রহী নয়। এই সব নিয়ামক সমুহ সংশোধন না করলে প্রাদেশিক সরকর ব্যবস্থাও রাজতান্ত্রিক হয়ে পড়বে।
* প্রশাসনকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া।
স্থানীয় সরাকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে এটি করা যায়।
* স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
এজন্য প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা দরকার নেই। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য এককেন্দ্রীক সরকার ও সহযোগী সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। এরশাদ সাহেব বোধহয় প্রাদেশিক সরকারের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে যে কর্মসংস্থান হবে সেদিকে ইংগিত করেছেন!
প্রাদেশিক সরাকার ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতাবাদ বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। বিশ্বের অনেক দেশ এর মধ্যে শক্তিশালী কয়েকটি দেশ রয়েছে যেমন, স্পেন, কানাডা, রাশিয়া, চীন, জর্জিয়া, ভারত, পাকিস্তান, তুরষ্ক, ইন্দোনেশিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদ দেশগুলোর অখন্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এবং অন্যান্য যে সব উদ্দেশ্য দেখানো হয়েছে আন্তরিকতা থাকলে কেন্দ্রীয় সরকারই তা অর্জন করতে পারে।
এটি একটি বিলাসী প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রের ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি করবে। প্রাদেশিক সরকাগুলো বাড়তি বোঝা হয়ে দাড়াবে। তখন প্রতিটি লোককে দুটি সরকারকে ভরণ পোষণ দিতে হবে। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থায় যে বাড়তি খরচ হবে তা দিয়ে এদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করা যাবে, খাল নদী বহুল এই দেশকে সেতু দিয়ে সেলাই করে ফেলা যাবে।
প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রীতা পরিহার এবং নৌ, সড়ক, রেল, ডাক, টেলি ও ইন্টারনেট যোগযোগ আধুনিকায়নের মাধ্যমে এককেন্দ্রীক সরকার ইশতেহারে বর্ণিত উদ্দেশ্য সমূহ অর্জন করতে পারবে।
বর্তমানে জাতীয় পার্টির যে অবস্থান তাতে কত দুর ভবিষ্যতে তার দল একক ভাবে ক্ষমতায় যাব তা বলা যায় না, তবে এরশাদের জীবদ্দশায় যে নয় তা তিনি নিশ্চিৎ। দিনে দিনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) উত্তর বঙ্গের আন্ঞলিক দলে পরিণত হয়েছে। উত্তর বঙ্গে এখনো জাতীয় পার্টির রয়েছে শক্ত অবস্থান। যদি প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু হয় তবে উত্তর বঙ্গে যে প্রদেশ হবে সেখানে জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় যাওয়া অনেক সহজ হবে। দিনে দিনে সংকুচিত হওয়া এই দলটির প্রধান ভাবছেন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা না হোক অন্ততঃ যদি দেশের কোন অন্ঞলের আন্ঞলিক ক্ষমতা পাওয়া যায় খারাপ কি!
উনাকে এধরনের বিধ্বংসী চিন্তা ভাবনা হতে বিরত রাখা সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
ইশতেহারে আছে:
"ছেলে ও মেয়েদের এইচ.এস.সি. পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে"।
একটি শ্রুতিমধুর ভাল প্রস্তাব। অনেক মেধাবী ছাত্রই টাকার অভাবে ঝরে পড়ে। তদের জন্য এটি উপকারী হবে। তবে ঝরে যাওয়া সব ছত্রকে এই ব্যবস্থায় ধরে রাখা যাবে না। শুধুই তারা ঝরে পড়বে না যারা টাকার অভাবে পড়া চালিয়ে যেতে পারছে না। যারা জীবিকা অর্জনে ব্যাপৃত হবে তাদের এই সুযোগ দিয়েও ধরে রাখা যাবে না।
এই প্রস্তাবটি আরও দু-একটি ইশতেহারে এসেছে। ছেলে ও মেয়েদের এইচ.এস.সি. পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করতে যে টাকা খরচ হবে তা শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও ভাল উপায়ে নিয়োগ করা যায়। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো সত্তরের দশকে পড়ে আছে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, কৃষি অর্থনীতি শিক্ষায় এখনো যুগোপযোগী নয়। দেশের গ্রামন্ঞলের স্কুলগুলোতে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরী ও লাইব্রেরী সুবিধা নেই। সব বিষয়ই মুখস্ত নির্ভর, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ কম। শিক্ষকদেরও বেতন কম। জীবন যুদ্ধে ধুকতে থাকা শিক্ষক ছাত্রদের কতটুকো দিতে পারবেন! এখনই ছেলে ও মেয়েদের এইচ.এস.সি. পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক না করে এই দিকগুলোতে আগে নজর দেয়া উচিৎ। অথাৎ গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে আগে শিক্ষার মান যুগোপযোগী করে পরে শিক্ষা অবৈতনিক করার দিকে নজর দিলে অধিক বাস্তবসম্মত হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

