আমরা ঘটনার প্রথম আটচল্লিশ ঘন্টাকে বিবেচনায় নিয়ে পর্যবেক্ষন করবো।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার ১৯/০২/২০১, ভূমি বিরোধ নিয়ে দীর্ঘ দিনের বিরোধের অংশ হিসেবে বাঘাইছড়িতে গত এক মাস ধরে আদিবাসী-বাঙালি উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একপর্যায়ে ১৯/০২/২০১০ শুক্রবার রাতে বাঙালি ছাত্র পরিষদের একটি মিছিলের সময় বাঘাইছড়ি বাজারে এক আদিবাসীকে মারধর করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ১০ টার দিকে আদিবাসীরাও জোট বেঁধে বাঙালিদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। ওই সময় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় গঙ্গারামমুখ ও এসএসএফ পাড়া এলাকার ঘরবাড়িতে।
পরের দিন অর্থাৎ ২০/০২/২০১০ সকালে সেনাসদস্যরা গঙ্গারামমুখ এলাকায় পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখতে গেলে আদিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সকাল ১০টার দিকে আদিবাসীরা সেখানে জড়ো হয়ে সাদা পোশাক পরা সেনা সার্জেন্ট রেজাউলকে আঘাত করে। তারা দা দিয়ে রেজাউলকে কয়েকবার কোপ দিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে। এতে রেজাউল গুরুতর আহত হন। এর পরই সেনাসদস্যরা আদিবাসীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন।
এ ঘটনার পরই দুটি বৌদ্ধ মন্দিরসহ সাজেক ইউনিয়নের গঙ্গারামমুখ, রেতকাবা, পূর্বপাড়া, সীমানাছড়া, ভাইবাছড়া, আজাছড়া, গুচ্ছগ্রাম, লাঙলপাড়া এবং বঙ্গলতলী ইউনিয়নের চামিনিপাড়া ও দিপুপাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আদিবাসীরা জানায়, তারা অগ্নিসংযোগে বাধা দিতে গেলে সেনাবাহিনী গুলি ছোড়ে। আর এ সুযোগে বাঙালিরা লুটপাট চালায় ও বাড়িঘরে আগুন দেয়।
আদিবাসীদের দাবি, এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাতজন। ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে। এঁরা হলেন গোলকমাছড়া গ্রামের নতুন জয় চাকমা (৩২), চামিনিছড়ার শান্তশীল চাকমা (২৭), লাঙলমারার দেবেন্দ্র চাকমা (৪৩), গঙ্গারামমুখের বনশান্তি চাকমা (২৩), বাঘাইহাট বাজার গুচ্ছগ্রাম ঘাটের মাঝি উত্তম কুমার চাকমার স্ত্রী বুদ্ধপুদি চাকমা ওরফে লেশকুলি (৩২) ও একই গ্রামের লক্ষ্মীবিজয় চাকমা (৩০) বুদ্ধপুদির লাশ উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা নান্টু চাকমা জানান, বাঙালিরা বেলা ১১টার দিকে বাঘাইহাট বাজার থেকে কাচালং নদী পার হয়ে গুচ্ছগ্রাম আক্রমণের চেষ্টা করে। কিন্তু আদিবাসীদের বাধার মুখে তারা পিছু হটে। পরে একদল সেনাসদস্যের সহযোগিতায় বাঙালিরা নদী পার হয়ে আদিবাসীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় বুদ্ধপুদি চাকমা নামের অপর একজন গুলিবিদ্ধ হন বলে নান্টু জানান।
বেলা ১১টার দিকে বাঘাইছড়ি থেকে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে প্রথম আলোর বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি ও সমকাল পত্রিকার প্রতিনিধি বাঙালিদের সামনে পড়েন। বাঙালিরা তাঁদের ধাওয়া করলে সমকাল প্রতিনিধি সামান্য আহত হন। তাঁদের মোটরসাইকেলটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়ির একজন সাংবাদিক জানান, বাঘাইছড়ির ইউএনও এ এস এম হুমায়ুন কবিরসহ কয়েকজন সাংবাদিক গঙ্গরামমুখ এলাকায় পৌঁছার পরপরই একদল উত্তেজিত বাঙালি আদিবাসীদের গ্রামে গিয়ে আগুন লাগায়। ওই সময় ইউএনওসহ অন্যরা সেনাক্যাম্পে আশ্রয় নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায় আগের সন্ধা থেকে শুরু হয়ে ২৪ ঘণ্টায় এ সংঘর্ষ চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
পাহাড়ি-বাঙালি মুখোমুখি অবস্থানের কারণে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
ইউনও হুমায়ুন কবির জানান, তিনি বাঘাইহাটে পৌঁছার পর ব্যাপক গুলির শব্দ শুনতে পান। ওই সময় রাস্তার পাশে অনেক সেনাসদস্য টহল দিচ্ছিলেন। তারপর গঙ্গারামমুখে পৌঁছেও বিভিন্ন দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পান। বেলা ১১টা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে আগুন লাগানো হয় বলে ইউএনও জানান। বাঘাইহাট বাজার ছাড়া ওই এলাকায় আর কোনো গ্রাম ও ঘরবাড়ি অক্ষত নেই।
সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক জ্ঞানেন্দু চাকমা ও বঙ্গলতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অঙ্গদ চাকমা জানান, এ ঘটনায় শত শত আদিবাসী পরিবার বাড়িহারা হয়েছে। তাদের কিছু অংশ বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশ পরিবার গভীর জঙ্গলে পালিয়ে আছে।
সেনাবাহিনীর ব্রিফিং: সংঘর্ষের একপর্যায়ে দুপুরে স্থানীয় বাঘাইহাট সেনা অঞ্চল (জোন) সদরে তাত্ক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন বলেন, সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ওপর গুলি চালালে আত্মরক্ষার জন্য সেনাসদস্যরা তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। বাঘাইহাটের চলমান ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পাহাড়ের শান্তি নষ্ট করতে এসব ঘটনার পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে। তবে তিনি দলটির নাম বলেননি।
সালেহীন বলেন, সাজেক যাওয়ার পথে মাচালংয়ের কাঠের সেতুও সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেসামরিক প্রশাসন পাহাড়ি ও বাঙালি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ সময় বাঘাইহাট অঞ্চলের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ ওয়াসিম ও ইউএনও হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং চলাকালেও থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সাধন বিকাশ চাকমা, হামিদ উল্লাহ ও পলাশ বড়ুয়া}
কিছু মন্তব্য
দু:খ জনক। সেনা ও অন্য সব কর্মকর্তাদের আরও ধৈর্যের সাধে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কৌশল শিখতে হবে
এতজন পাহাড়ী বাংলাদেশী কিভাবে গুলিতে মারা গেলেন। আমার তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে সেনাবাহিনী তাদের দায়ীত্ব ঠিকমত পালন করতে পেরেছে। এটা কি আক্রোশ এর ফল।
পাহাড়ী এলাকার প্রশাসন সম্বন্ধে অনেকের ধারণা অস্পষ্ট। এ ঘটনায় আশাকরি কিছুটা ধারণা লাভ করা যাবে। পাহাড়ে এখনো চলছে সামরিক শাসন আর সমানতালে চলছে তাদের বাঙালি তোষণ ও পাহাড়ী নিধন। বাঙালি কর্মকর্তাদের কাছে পাহাড়ীরা কোন সহানুভূতি লাভ করে না। যদি কেউ সহানুভূতি দেখায় তাহলে তাকে শান্তিবাহিনীর এজেন্ট বলে প্রচার করে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
এদেশে কোন দিন কোন সত্য কোন বিভাগীয় তদন্তে এক ফোটাও বের হয়নি, হয়েছে কি ? না কখনও কোন সত্য জানার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য এ জাতির হয়নি। এই কাজটা কি এতই কঠিন ? চলুনতো শুধুমাত্র ঘটনার জায়গায় মানুষের মাথায় থাকা ঘটনাটা রি-কেপ করলেই দৃশ্যমান অতীত হিসেবে চোখের সামনে কি কি বিষয় চলে আসে ?
পাহাড়টাও কিন্তু আমাদেরই সম্পদ, সম্পদ সেখানের মানুষগুলোকে নিয়েই, আর তাদের ছাড়া পাহাড় সে শুধু বিরান ভূমি।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



