মানুষের ভীরে... ( প্রথমের পরে )
০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:২০
গন্তব্যেহীন গন্তব্যের পথে চলছে প্রভাত। একটুও যেন ভীত নয়। ভয় ! আচ্ছা ভয়টা কি খুবই খারাপ ? কিছু কিছু ভয় কি থাকতে নেই ! ভয়তো কিছুটা হলেও ভালোর পথ দেখায়। প্রভাতের মন চলে যায় সেই ছোট বেলায়। প্রইমারীর গন্ডিতে জীবন, মায়ের কঠোর নিয়ম। সন্ধ্যের আযানের আগেই ঘরে ফিরতে হবে। কোনদিন দেরী হয়ে গেলেই স্বঘোষিত অপরাধীর মত মাথা নিচু করে ঘরে ফেরা। তা কেন ? কারন মায়ের কঠোর নিয়ম আর শাষনের ভয়। এমন ভয় কি মানুষকে সুপথে পরিচালিত করেনা ! কিছু কিছু ভয় থাকতে হয়। ভয় থাকলে যেমন কোন কিছু জয় করা যায়না তেমনি কিছুটা নাকলেও যায়না। বড় হিসেব নিকেশের এই জীবন। প্রতিটি মানষের জীবন। কিন্তু সেই সময় কোথায় ? মানুষতো ছুটছে, কোথায় ছুটছে ? কেন ছুটছে ? কোথায় তার গন্তব্য ! জানা আছে কি কারও। কুয়াশার ভোরে নদীর এক তীড়ে দাড়িয়ে অন্য তীড়ের সন্ধান করার মত, সব ঘোলাটে। তবুও মানুষ ছুটছে। ছুটছে সবাই, না ছুটে আর উপায় কি, নুন আনতে পান্তা ফুড়ায়। এত ভাববার সময় কোথায়। বাস্তবতা তো এই দিল আমাদের বিরামহীন ছুটেচলা। ভাববার কোন অবকাশ নেই, জীবনের গভীর থেকে আরও গভীরে যাবার সময় কোথায়। সেখানেইতো লুকিয়ে আছে সমস্ত সত্য। কিন্তু সময় নেই। ছুটতে ছুটতে মানুষ ক্লান্ত। চাই আশ্রয়, চাই বিশ্বাস। সেখানেও কি বাস্তবতা ঢুকে পরেনি ? কঠোর বাস্তবতা কোথায় নেই। রান্নাঘর, বেডরুম থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত কোথায় নেই বাস্তবতা নামক এক চাহিদার দানব ! সবখানে, সবখানে জুড়ে আছে। বাস্তবতার দানব দাবরে বেরাচ্ছে আর মানুষ সেই তোড়ে ছুটে বেরাচ্ছে দিশেহারার মত। আচ্ছ এভাবে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে পৌছাবে মানুষ আর পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ! প্রভাত থেমে গেল, স্থির দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথাটা যেন টগবগ করে ফুটছে। সুর্য যেন মাথার কাছে চলে এসেছে, হাসরের ময়দানের মত। ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছে। হ্যাঁ, খুঁজে পেয়েছে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ফুটপাতের পাশে একটা পাকুর গাছের নিচে বসল। এতো চিরাচরিত ছায়াবৃক্ষ নয়, যেন দন্ডয়মান রুগ্ন শিল্পের মত। এমন এক প্রশান্তি জুড়ে দিল তাকে এই প্রকৃতির ছায়া, যেন সে হাসরের মাঠ থেকে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। আপন মনে বসে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে মানুষের তৈরী কঠোর বাস্তবতার ভয়ে মানুষের ছুটে চলা দেখছে। সত্যকে আড়ালে রেখে মিথ্যের তাড়নায় ছুটছে মানুষ। প্রভাত দেখছে আর মুখে ফুটে উঠেছে উপহাসের হাসি।
নিঃস্বঙ্গ গাছের নিচে বসে আছে প্রভাত। নগরায়নের নামে এই কংক্রিটের জঙ্গলে গাছগুলো যেন দাড়িয়ে আছে এখানে - ওখানে, এলোমেলো। কোন ছন্দ নেই, ছন্দহারা দন্ডয়মান জীবন। তবে গতিটা আছে আজও, সেই জোড়েই বেঁচে থাকা। গতিহীন তো প্রানহীন। প্রভাত ও তো তেমনি।
গাছের সাথে হেলান দিয়ে একা একা ভাবে, হ্যাঁ নিস্বঙ্গই তো। কে আছে তার ? কিসের টানে সে ঘরে ফেরে ? মায়ের কথা মনে পরে যায়। মায়ের কড়া শাষনের মাঝে জীবন - যাপন। মায়ের বকুনি আবার শেষ আশ্রয়ও সেই মায়েরই বুক। এমন গভীরভাবে তো তখন ভাবা যায়নি যখন এসব ছিল। আর যখন ভাবার সময় এলো তখনই মা চলে গেলেন জীবনের খেলা সাঙ্গ করে। মা নেই গৃহে সংসার অরণ্য তার। সেই নিয়মেই সংসারে আস্তে আস্তে আগাছা জন্মাতে লাগল। পুর্বের গতি হারিয়ে চলতে থাকলো শুধু প্রয়োজনের পথ ধরে মন্থর গতিতে। এভাবেই চলতে থাকলো দুই ভাই আর বাবাকে নিয়ে চারজনের ছন্দহারা সংসার। কখনও ছন্দ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বড়ভাই এর বৌ এনে। শেষ চেষ্টা যদি রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা যায়। সেখানেও বাঁধা দিতে লাগল সময়। ছোট ছোট দ্বন্দ এসে জড়ো হতে লাগল। অবশেষে বড় বৌ আসলো। কিন্তু এর মাঝে চলে গেছে ছয়-ছয়টি বছর। বাবার ও সময় হয়েছে চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার।
কিছুটা সময় ভালই কাটল। সেই ভালটা যেন সময় মানতে পারছিলনা হাসিমুখে। সময় আবারো আঘাত হানল দুর্বল সাম্রাজ্যের ওপর। যে ধীরে ধীরে জেগে উঠতে চেয়েছিল। ঠিক তখনই সময় যেন নেশার রুপ ধরে কেড়ে নিল মেঝভাইটাকে। একসময় গভীর আসক্তি কেড়ে নিল তাকে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও ব্যার্থতায় পর্যবতি হল। একদিন রাগ করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। সেই যে গেল একেবারে লাপাত্তা। অনেক খোঁজাখূঁজি করেও আর তাকে পাওয়া যায়নি। এই আঘাত সইতে না সইতেই বাবা অবসর নিলেন। সংসার গিয়ে চাপলো বড়ভাই এর উপর। বড়ভাই এর রোজগার আর বাবার পেনশন এতেই সংসার চলতে থাকলো কোনমতে। বাবা কিছুটা টাকা সরিয়ে রাখেন প্রভাতের জন্য। একেতো বাবার মন আবার ছোট ছেলে। সবে মাত্র এম. এ দিয়েছে। এখনই কি চাকরী জুটবে। কিছুটা সময়তো লাগবেই। হয়তো সেই সময়ের দিকেই বাবা তাকিয়ে থাকেন নির্বাক। চশমাটা হাতের মুঠোয় চেপে ইজি চেয়ারটাতে শরীর এলিয়ে দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। চোখদুটোর স্থির আর উদাস চাহনী চলে যায় সময়ের দুর সীমানায়। যেখানে খেলা করছে আশা, প্রভাতের একটা কিছু হবে। কিছুটা হলেও গতি বাড়বে সংসারের। কিছুটা স্বচ্ছলতা সাথে কিছুটা চাহিদাও। এটাই হয়তো বাবার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সেটাওতো হচ্ছেনা। টাকার জোর আর মামার জোর না থাকলে কি আর চাকুরী পাওয়া যায় ? ঘরে ফিরে সে কি দেখবে ? বাবার উদাসী চোখ, যেখানে খেলা করছে চাওয়া আর না পাওয়ার এক উম্মাতাল নৃত্য। বড়ভাই এর হাতে সংসার চলে যাবার পরে ভাবীর পরিবর্তন। তার একক কতৃত্ব, যা প্রভাতের মন মানতে চায়না। তবু মানতেই হবে, কারন সে তো এখন সময়ের নিয়মের কাছে উপায়হীন।
মানুষ ঘরে ফেরে শান্তির আশায়। কিন্তু সেখানেওতো শান্তির হননকারী বেশে ঘারে চেপে আছে সময়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে যন্ত্রনার বীজ, আপনমনে। তবে সেখানে ফিরে গিয়ে কি লাভ ? না, সে আর কোন দিন ফিরবেনা সেই দূঃখপুরীতে। সেও উধাও হয়ে যাবে মেঝভাইটার মত। উঠে দাঁড়ালো, আবার হাঁটতে শুরু করল অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে।
চলবে...
লেখক বলেছেন:
আসলে লেখার সময় পেলে একবারেই লিখতাম। যেহেতু একবারে পারবোনা তাই এমনভাবে লিখছি যাতে পরবর্তীটা পরার একটা আকর্ষন থেকে যায় (যারা পরবে)।
আপনার ভাল লেগেছে এটা জেনে আমারও ভাল লাগছে। কারন এটা আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা লেখা।
লেখক বলেছেন:
তাই মন ছূঁয়েছে ?
আজকেই বাকী অংশটা শেষ করে দেব।
পুষ্প বলেছেন:
বলেছিলেনতো একটা গল্প দিয়েছেন,কিন্তু পড়ে মনে হল জীবনের ডায়েরী লিখেছেন,এনা ফ্রাঙ্ক যেমন লিখেছিল।মাকে ছাড়া জীবনটা আসলেই বাধনহারা হয়ে যায়।অনেক নিয়ন্ত্রন আর শাসন আছে যা মানুষকে সুখি করে।
লেখক বলেছেন:
হ্যাঁ অনেকটা ডায়েরীর মতই। এনাফ্রান্ক তো তার নিজের জীবনের পুরোটাই সত্য লিখেছেন। আর আমার এখানে কিছুটা বাস্তব আর কিছুটা কল্পনা।
মাকে ছাড়া জীবনটা আসলেই বাধনহারা হয়ে যায়, হ্যাঁ এই ব্যপারটা আমি খুবই ফিল করি কারন মা হারা তো তাই।
ভাল থাকবেন।



















লিখাটা ভালো লাগছে আমার কাছে। প্রতিটা কথা চিন্তায় ভরপুর। রাতে আরেকবার পড়ব।