মানুষের ভীরে... ( দ্বিতীয়ের পরে )
০৬ ই আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০৮
রোদের উঞ্চতা কমে এসেছে। বিকেলের প্রথম আলোতে খরতাপের প্রভাব ম্লান করে দিচ্ছে। প্রভাত বিকেলের নরম রোদে নিজেকে সমর্পন করে দিয়ে হাঁটতে থাকে আপন মনে। বিকেল শুরু হলেই প্রভাতের মনের মধ্যে এক প্রশান্তির ভাব অনুভব করে। কেমন যেন এক নীরবতা এসে গ্রাস করতে থাকে। বিকেলে পরে সন্ধ্যা, সন্ধ্যার পরে রাত আর রাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পর্যায় ক্রমে সে বিচরন করতে থাকে ভাবনার গভীর থেকে আরও গভীরে। গভরি রাতের যে কি মহিমা ! এ রাতেই চোরের চুরি, খুনির খুন আর সাধকের সাধনা। সবই যেন এই গভীর রাতে। এই গভীর রাতে সে যেন ভাসতে থাকে ভাবনার মহাশুন্যে। সে যেন এই গ্রহের বাসিন্দা নয়। শুন্যে ভেসে ভেসে সে দেখছে পৃথিবীকে। দেখছে পৃথিবীর পানি আর ভূমির পরিমান। পুরোটাই যেন পানি আর পানি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু কিছু ভূ-খন্ড। সেখানে সামান্য মানুষ ও দেখতে পায়। আস্তে আস্তে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ যতই বাড়ছে ততই ভাগ হতে শুরু করেছে। গোত্রে - গোত্রে, জাতিতে - জাতিতে, দেশে - দেশে। সেই ভাগের হাওয়া ভাগের হাওয়া একেবারে সমাজে - সংসারে আপনমনে বইছে। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই কি অপুর্ব এক ভাগের হাওয়া পৃথিবীতে বইছে, যেন শেষতক বইবে ! এই ভাবনা শেষ হয় আবার শুরু হয় অন্য ভাবনা। কখনও খুব শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কি উদার এই আকাশ, দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভহীন ছাদের মত। আলো-আঁধার, দিন - রাত, কতভূমি কতজল, কত নীরবতা কত কোলাহ, জগতের পর জগত - মহাজগত, সব যেন তার বুকে ঠাঁই নিয়ে আছে। আকাশও যেন সব বুকে নিয়ে লালন করছে নিপুণ হাতে। আকাশ দেখে প্রভাতের এমনই মনে হয়।
মাঝে মাঝে ভাবে সিমাহীন আকাশের নীচে আর কোথাও কি আছে এমন একটা সৌরজগত ! যার মাছে আছে পৃথিবীর মত এমন এক সজীব গ্রহ ? যেখানে মানুষ আছে, সংসার আছে, প্রেম আছে, দূঃখ আছে আবার সুখের আশায় হাতরে মরা আছে। আর থাকলে তা কতদুরে ? আদৌ মানুষ ছূঁতে পারবে কি সেই সীমানা ! পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহটির দুরত্ব ফোর লাইট ইয়ার। মানুষের আবিস্কৃত সবচেয়ে দ্রুত যানে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগবে দুইশত বছর। আর যদি আলোর গতি সম্পন্ন কোন যানে যেতে লাগবে চার বছর। আলোর গতি সম্পন্ন কোন যানে মানুষ কি পারবে ভ্রমন করতে ! আইনস্টাইনের মতে আলোর গতিসম্পন্ন যে কোন বস্তুই তখন নিজেই রুপান্তরিত হবে এনার্জিতে। তো কিভাবে পারবে মানুষ ? জানবার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ আর জানার বিষয় যে সিমাহীন। ঠিক ঐ আকাশের মত। এমন সব ভাবনা ভাবতে ভাবতে পুরো রাতটাই কেটে যায়। যেমনটি হয়েছে আজ। ফজরের আযানের ধ্বনি কানে আসছিল, সে আর ঘুমোলো না। গুমোলে তাই হত, যা নিত্যদিনকার ঘটনা। ভাবীর রুদ্ররুপ। হাঁক ছেড়ে ছেড়ে বলবেন, নবাবজাদা দিনভর ঘুমোচ্ছে খাবার যেন আকাশ থেকে আসে। একই রেকর্ড প্রতিদিন শুনতে ভাল লাগেনা। আজ আর ঘুম নয়। আজ সে ঘর ছাড়ল ভোরের নগর দেখবে বলে। যেখান থেকে শুরু হয় একটি দিন, শুরু হয় নাগরিক ব্যাস্ততা। তাই সে সেই ভোরেই ঘর ছেড়েছে, পথ হাঁটতে শুরু করেছে। সকাল দেখেছে, দুপুর গেছে, বিকেলও প্রায় শেষ। একটু পরেই মাগরিবের আযান পড়বে। সারাদিন কেউ তার খোঁজও নেয়নি আর তার পেটেও কিছু পরেনি। পকেটে হাত দিতেই সম্বল বেরুল তের টাকা। একটু সামনেই ছোট খুপরির মত একটা দোকান দেখতে পেল, সে সেদিকেই এগিয়ে গেল।
দোকানে পিঁয়াজু, আলুরচপ, সিঙ্গারা আর ডালপুরি ভাজা হচ্ছে। একটাকা সাইজের। সিঙ্গেল চায়েরও ব্যবস্থা আছে। এ যেন একটাকার দোকান একটাকার মানুষদের জন্য। প্রভাত গোটা দুই সিঙ্গারা আর ঢক্ঢক্ করে গ্লাস তিনেক পানি তার ক্ষুধার্ত পেটে পুরে নিল। ব্যাস ক্ষুধার মৃত্যূ হল। ভাবল মানুষ চাইলে কত অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে, তাইনা ! সিঙ্গেল কাপ চা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে কিছু না কিছু ভাবছে সে। বিল হল তিনটাকা, হাতে থাকল দশ। থাক এই দশটাকা ভবিষ্যতের জন্য। আগামীর জন্য ! প্রভাতের মুখে মৃদু হাসি। চারদিকে শুধু অনিশ্চয়তার খেলা তবু মানুষ সেখানে খুঁজে ফিরছে নিশ্চয়তা। চিন্তা করছে আগামীর। আচ্ছা এখনই যদি মৃত্যূ এসে বলে চল আমার সাথে। তখন কি লাভ আছে এই দশটাকার ! দশলক্ষ থাকলেই বা কি ? মন বলে কি লাভ প্রভাত। তুই আর ঘরে ফিরিসনা। চলে আয় আমার বুকে। এক বিশালতা তাকে টেনে নিতে চায়। বিশাল এক পাহাড় যেন তার সামনে দাড়িয়ে এখনই সে উঠে যাবে সেই পাহাড়ে। কিন্ত ! কিন্তু বাবার কি হবে তাহলে ? বাবার সেই স্বপ্নগুলোর কি হবে ! বাবার সেই স্বপ্নগুলো। এই কিন্তু এলেই আর হলনা। এই শব্দটাই পথ বদলে দেয়। আগামীর বোধ জাগায়। যে মন তাকে পাহাড়ে নিয়ে যেতে চায় সেই মনই আবার তাকে ফিরিয়ে আনে বাস্তবতার সংসারে। কোন মানুষই যেন একজন নয়, দুজন। একজন যোগী আর একজন ভোগী। দুটোর সমন্বয় সাধন করেই মানুষকে চলতে হয়। নয়তো ছিটকে পরার সম্ভাবনা থাকে। আবার ছিটকে পরলে ট্র্যাকে ফেরার উপায় নেই। পাহাড়ে উঠলে তো চলবেনা আবার পাহারেও চলে যেতে চায় মন। কি আর করা পাহাড়কেই নিয়ে আসে নিজের মাঝে। মানুষ চাইলেই সব করতে পারেনা, মানুষের ক্ষমতাতো সীমাবদ্ধ ! তবু মানুষকে বেধে রাখা যায়কি কোন সীমানায় ?
চা শেষ। দাম চুকিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল ধীরে ধীরে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ফুরফুরে হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় ভেজা মাটির গন্ধ। হয়তো দুরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃতির স্বভাবটাও কেমন যেন এলোমেলো, এই মেঘ এই বৃষ্টি। মানুষ ও কি তেমন নয় ! এই ভাল এই মন্দ। তবে বৃষ্টি প্রভাতের খুবই ভালো লাগে। মনে হয় দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা কংক্রিটের জঙ্গলকে বৃষ্টি ভিজিয়ে শান্ত করে দেয়। বড্ড ভাল লাগে প্রভাতের। পশ্চিম কোনে কালো মেঘের পাহাড় জমতে শুরু করেছ। থেমে থেমে বিজলি চমকাচ্ছে। আজ মাঝরাতে নিশ্চিত মুশলধারে বৃষ্টি হবে। প্রভাত খুশী হল, যাহোক ঘরে বসে বৃষ্টি দেখা যাবে। কিন্তু প্রভাত যে আর ঘরে ফিরবেনা ! আবার হাঁটতে থাকে প্রভাত।
চলবে...
আমি ও আমরা বলেছেন:
ভাবুক ভাই প্লাস দিলাম আগের পর্বের জন্য, এখনো দেখিনি শেষ টা , সময় করে ভাল ভাবে দেখতে চাই। অবশ্যই দেখব, ইচ্ছা আছে আবারও প্রথম থেকে পড়ার।
লেখক বলেছেন:
প্লাস এর চেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমার ভাবনাগুলো কেউ পরছে বা জানছে। আর সেবি ভাবনা থেকে কেউ যদি খোরাক পায় তবেই আমার স্বার্থকতা।
ভাল থাকবেন।
আমি ও আমরা বলেছেন:
নতুন কবিতা লিখেছি সময় পেলে দেখবেন।
লেখক বলেছেন:
যাবোতো অবশ্যই। শত কাজের চাপ থাকলেও আপনার লেখা পরতে আমি যাই। আজই যাবো।
শুভেচ্ছা রইল।
চিটি (হামিদা আখতার) বলেছেন:
আপনি চমৎকার লিখেন।প্রভাতের মত আপনি হাটঁছি মনে হচ্ছে ............
চলুক.......।সাথে আছি।
শুভেচ্ছা
লেখক বলেছেন:
আমিতো হাটিই। আমার মন খারাপ থাকলে আমি হাটতে থাকি।
আজকে বাকী অংশ দিয়ে শেষ করে দেব।
ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন:
হ্যাঁ, তাতো অবশ্যই। এছাড়া কোন পথ নেই। তবু সত্যটাতো প্রকাশ করতেই হবে।
লেখক বলেছেন:
আপনিতো প্রথম আর ৩য়টা পরলেন ২য়টা পরেছেন ?
আজকেই শেষ পর্ব দেব।
আপনার অপেক্ষায় রইলাম।
শূভেচ্ছা।
পুষ্প বলেছেন:
এতটা কষ্ট ভরা লেখাটা মন খারাপ হয়ে গেল।নিজেকে সবসময় দুঃখি ভাবা ,সবসময় বিষন্ব আমার স্বভাব।কিন্তু কত কষ্টে মানুষ বাচে।
আরও কি জানেন আপনার সব লেখাই প্রথম থেকে পড়ে দেখেছিলাম ওগুলাতে সবসময় একটা দুঃখবোধ থাকে।
লেখক বলেছেন:
আসলে দূঃখ মানুষকে অনেক কিছু জানতে আর বুঝতে শেখায় যা সুখ দিতে পারেনা। গভীর কিছু দূঃখবোধ নিয়ে আসে অযাচিত প্রশ্ন, যা ভাবতে শেখায় খুজতে শেখায় উত্তর। সেই ভাবনা থেকেই খুজে নেয়া যায় জীবনের নিগুর সত্য। লেখার শেষ অংশটা পরলেই বুঝবে মানুষ দূঃখের মাঝেও কিভাবে জীবনে ফিরে আসে।
তাই এই দূঃখবোধের প্রতি এতোটা আকর্ষন। বোঝানো গেল ?
হাজারো কষ্টের মধ্যে ভাল থাকাটাই আসল কথা।
ভাল থেকো।


















