আমরা তিনজন , সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ ...
আমাদের তিনজনের বাসাই মিরপুর। আমরা তিনজন মানে ফিরোজ, টিটো আর আমি। ফিরোজ একটা অ্যানিমেশন ফার্মে কার্টুন আঁকে। টিটো অ্যাড ফার্মে কাজ করে, আর সময় পেলে এখনও গল্প লিখি নিকে ব্লগিং করে। আর আমি তো আমিই।
সন্ধ্যার পর মাঝে মাঝে আমরা তিনজন এক হই। তিনজনের মানসিকতা এবং মানিব্যাগের ওজন প্রায় এক হওয়াতে আড্ডাটা জমে ভাল। আমাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। চা, সিগারেট আর হাসাহাসি করা ছাড়া বিনোদনের অন্যকোন সাশ্রয়ী উপায়ও নেই। চা খাওয়ার বিলটা আমি দিলে, সিগারেটের বিলটা দেয় ফিরোজ, এর পরের রাউন্ডের চায়ের বিল অবশ্যই টিটোর ঘাড়েই বর্তায়। সারাদিন অফিসের ধকল, গুলশান, উত্তরা আর মতিঝিল থেকে বাসে ঝুলে ঝুলে ফেরার কান্তি আর জীবনের যাবতীয় না পাওয়ার চিকন কষ্টগুলি মুছে ফেলতে আমরা মাঝে মাঝে এভাবে জড়ো হই, হাসাহাসি করি এবং সবচে বড়ো কথা স্বপ্ন দেখি।
আজ রাত পৌণে দশটা, ঘটনাস্থল মিরপুর ...
নানান গোলযোগে সপ্তাহখানেক আমাদের দেখা হয়নি । আজ দেখা হল।
রাত পৌণে দশটা। আড্ডা প্রায়ই শেষের দিকে। শেষ রাউন্ড চা গেলা শেষ করে হাটছি। তিনজনের মধ্যে দুইজনের রিকশা দরকার, ফিরোজের বাসাটা কাছেই। হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে থেকে হেটে হেটে গ্রামীন ব্যাংকের উল্টো দিকের রাস্তা ধরে এগুচ্ছে, ফিরোজকে এগিয়ে দিয়ে ওখান থেকে আমি আর টিটো দুইজন দুইটা রিকশা নিয়ে চলে যাবো দুদিকে।
ফুটপাতের উল্টোদিক থেকে একজন মুরুব্বী টাইপের লোক আসছিলেন। টুপি, দাঁড়িতে মেহেদী আর পরণে পাঞ্জাবি পায়জামা। বেশ রুক্ষ গলায় রীতিমত চিৎকার দিয়ে বললেন, এ্যাই দাঁড়াও, এতো রাতে রাস্তায় কেন, বেতমিজের দল , দাঁড়াও ।
কি একটা বিজ্ঞাপনের আইডিয়ায় আমরা তিনজনেই ডুবে ছিলাম। আঁতকা এমন প্রশ্নবানে আমরা বেশ ভড়কে গেলাম। তিনি আঙ্গুল তুলে ঠিক আমার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন। প্রথমে চেনার চেষ্টা করলাম, আমার কোন আত্মীয় কিনা!!! কিন্তু আমার আত্মীয় আমার সাথে এভাবে কথা বলবেনই বা কেন? বললাম, আপনাকে ঠিক চিনলাম না...
আমার কথায় তিনি ভয়াবহভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। থাপপড়ের ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, আমি এখানকার প্রিন্সিফাল, ইউ আর সাপুজ টু নট দ্যা ইসট্রিট।
তার ইংরেজী ভাষা আর তার উচ্চারণের বহর শুনে ভয় খানিকটা কাটলো, বললাম, আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি আপনাকে চিনি না আর তাছাড়া এখন তেমন রাতও না, তারপরও এতো রাতে রাস্তায় থাকলে সমস্যা কি?
কথাটা শুনে এই বান্দা আমার প্রায়ই গায়ের উপর এসে পড়লেন, বেয়াদব। চিনো আমারে ...
দলের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু বলে , কথা আমি একাই চালিয়ে যাচ্ছি,কারণ ভীতুরা মাঝে মাঝে বোকার মতো সাহসী হয়ে যায়। বাকী দুইজন থ মেরে আছে। বললাম, জ্বী না চিনি না। আমি আপনাকে চিনি না, আপনিও আমাকে চিনেন না কিন্তু এইভাবে কথা বলাটা আপনার ঠিক হচ্ছে না।
- তুমি কে , তোমারে চিনতে হবে ?এতো রাত্রে রাস্তায় কেন তার উত্তর আগে দের... নামায পড়ো কিনা সেইটার উত্তর আগে দাও? উত্তর না দিয়া যাইতে পারবা না ...
আমি তখন মানিব্যাগ বের করছি
কি বাইর করতাছো তুমি ? অ্যাঁ? তুমি আমারে কি দেখাইবা .....আইজকা তোমাদের কি করি দেখে ... খবরদার কোথাও যাইবা তোমরা ...
তার কথার রেলগাড়ি থামাতে আইডি কার্ড বের করলাম। উনি আইডি কার্ড দেখলেন। তেলতেলে একটা হাসি ফুটে উঠলো মুখে। ও তুমি, আপনি সাংবাদিক?
আমি বললাম, জ্বী কিন্তু সেটা কোন বিষয় না। আপনি আগে বলুন, আপনি যে হঠাৎ করে আমাদের দিকে এভাবে তেড়ে এলেন এর কারণ কি? আমরা কি কোন আপত্তিকর কাজ করছিলাম ? বা আমাদের আচরণে কি এমন কোন কিছু ছিল কি যেটা আপনার খারাপ লেগেছে ।
ওই ব্যাটা ততক্ষণে আমার পিঠে হাত বুলানো শুরু করেছে। না না এমনিতে, বাজাইয়া দেখছিলাম।
এরপরের কথপোথন
আমি বিনয়ে নুয়ে পড়ে বললাম, আংকেল , আপনি কি করেন? কোথাকার প্রিন্সিপাল বলছিলেন ? আপনার বিস্তারিত পরিচয়টা বলেন তো?
এবার তিনি শক্ত গলায় বললেন, পরিচয় দিয়ে কি হবে?
বললাম, আপনার মতো সমাজ সচেতন মানুষ , এ যুগে খুব একটা নেই। পরিচয়টা পেলে কাজে দিতো? প্লীজ আপনার পরিচয়টা দিন।
তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, বিস্তারিত পরিচয় দেয়া যাবে না, শুধু জাইনা রাখেন দ্বীনের লাইনে আছি , তাবলিগ করি, .... আমি অ্যাডুকেডেট , তমিজের সাথে কথা বলেন। এগ্রি থিকা পাশ করছি ...
-জ্বী, তমিজের সাথে আপনিই বরং কথা বলেন। আমরাও পাশ করছি। যেখান থিকা পাশ সেইটা এগ্রি.থেকে খারাপ না বোধহয়।
-ও তাই নাকি?
-ঢাকা ভার্সিটি।
ইসলাম টু ইসলাম ভায়া পুলিশ
এরপর তিনি ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে গেলেন। এর মধ্যে দুএকজন লোক জমে গেছেন। এই সুযোগে তিনি গোটা আলোচনা ইসলামী লাইনে নিয়ে গেলেন। দেখেন ভাই, আপনারা দেখেন, দ্বীনের দু্ইটা কথা বলার জন্য এইসব পোলাপানরা আমার সাথে কেমন বেয়াদবি করছে। আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র ছিলাম, নটরডেম কলেজের গোল্ড টিমের বির্তাকিক ছিলাম, সেই জ্ঞান বহুদিন পর কাজে লাগল। ইসলামী লাইনে সুবিধা করতে না পেরে, তিনি আলোচনার ট্র্যাক চেঞ্জ করে বললেন, খবরদার আমার দুইজন এসআই আছে, আমার কথায় ওঠে বসে ...
বললাম, তাহলে তো ভালোই, বেশ চলেন থানা তো কাছেই ...
এবার তিনি আলোচনা তিনি গেলেন মুরব্বীদের শ্রদ্ধা এবং ইসলামী চেতনা ...সেইসব বর্ণনার রুচি আমার নেই।
এই ঘটনার ওজন কতো?
আমার কেন জানি মনে হয় আমরা খুব খারাপ একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। খারাপ সময়টা এজন্য নয় যে, দেশে এখন কোন নির্বাচিত সরকার নেই। খারাপ সময়টা এই কারণেও নয় যে, দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। মাদ্রাসার কিছু পোলাপান বাউল মুর্তি ভেঙ্গে ফেলেছে- এটাও কোন খারাপ সময়ের লক্ষণ নয়, নিশ্চিতভাবে।
ভয়ানক খারাপ সময়ের লক্ষণ একটাই , সেটি হচ্ছে , আমরা সবকিছু চুপচাপ মেনে নিচ্ছি। গা বাঁচিয়ে চলার সবগুলো কৌশল আমরা ইতমধ্যে রপ্ত করে ফেলেছি।
পাশের বাড়ির আগুন একদিন আপনার ঘরেই আসবে। আজ যেমন আমার ঘরে লাগলো।
এই কাজটা আমি একা করতে চাচ্ছি না
যদি কয়েকজন সঙ্গী পেতাম, তিনজন নয় , আরও কয়েকজন বেশি, মিরপুরের ঠিক ওই জায়গাটায় রাত ঠিক পৌণে দশটায় হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভোরের অপেক্ষায় ...
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



