আজ সকালে টিভিতে সিএনএন দেখছি, এমন সময় আমার মা খুবই বিচিত্র একটি কথা বললেন। কথাটা হল, এই ব্যাটায় নাকি সবাইরে গ্রিণকার্ড দেবে। টিভিতে তখন বারাক ওবামাকে দেখাচ্ছিল।
আমেরিকা খুবই বিচিত্র একটা দেশ। আমি কখনও আমেরিকায় যাইনি, তবুও দেশটিকে বিচিত্র বললাম এই কারণে যে, আমার সেকেলে মা যিনি মিরপুর-১ নম্বর থেকে ১০ নম্বরে যেতে ১০ বার হারিয়ে যান, তার মনেও আমেরিকা, তার নির্বাচন এবং গ্রিণকার্ড- বিষয়গুলো ঢুকে গেছে। আমি দেখেছি, শতকরা আশি ভাগই লোকই আমেরিকাকে কথায় কথায় গালি দেয়। আবার শয়নে , স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে - আমেরিকা যাবার স্বপ্ন দেখে- ওই আশিজনই।
স্কুলে পড়ার সময়কার একটা মজার ঘটনা বলি। থার্ড পিরিয়ড়ের ঘন্টা পড়ার পর খুব টেনশন নিয়ে বসে আছি। অংকের কাস শুরু হবে, স্যার এসে উপপাদ্য ধরবেন। আইডিয়াল স্কুলের দেলোয়ার স্যার, খুবই কড়া মেজাজের মানুষ। কী আশ্চর্য, অংকের সেই কড়া স্যারের বদলে কাসে চলে এলেন ভূগোলের স্যার। অংকের স্যার কোন কারণে কাসে আসেননি, এজন্য ইনি এসেছেন। এই রকম কাস সাধারণত খুবই আনন্দের হয়, এটিও তার ব্যতিক্রম হল না। অংক-ভূগোল বাদ। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন , আমাদের যদি একদিনের জন্য প্রেসিডেন্ট বানানো হয়, তাহলে কে কি করবে।
ততদিনে গুছিয়ে মিথ্যা বলা শিখে গেছি। বানিয়ে বানিয়ে প্রচুর ভালো ভালো কথা বললাম। আমাদের মধ্যে একজন ছেলে ছিল, খুব ঠোঁটকাটা, একটু পাগলাটে ধরণের। ও দাঁড়িয়ে বলল, স্যার একদিনের জন্য আমি প্রেসিডেন্ট হইলে আমেরিকার ভিসা লাগাইয়া ... তারপর নাইক্কা ...
গোটা ক্লাস হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল, স্যার নিজেও অনেকক্ষণ হাসলেন। বললেন, সত্য কথা বলার জন্য ধন্যবাদ।
আমেরিকা আসলে খুবই শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। আমাদের অধিকাংশের মাথার অনেকটা দখল করে আছে আমেরিকা। এজন্য আমরা সব জায়গায় আমেরিকার ছায়া দেখতে পাই। দেশের কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে আমরা বলি, এর পেছনে আমেরিকার হাত রয়েছে। তেল কিংবা চালের দাম বাড়লে- সেটাও আমেরিকার কারসাজি। আমার এক মামার এমনই এক আমেরিকা ম্যানিয়া বা ফোবিয়া রয়েছে। চট করে দীর্ঘ সময়ের জন্য লোডশেডিং শুরু হলে তিনি এটাকে মার্কিন চক্রান্ত ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে নারাজ। বাংলাদেশ- নিউজিল্যান্ডের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে। জিততে জিততেও জিতলো না বাংলাদেশ- এর পেছনে আমেরিকা কোন সুক্ষ্ম চাল থাকতে পারে বলে - মামার বিশ্বাস। এই মামাই গত কয়েক বছরে বিভিন্ন নামে প্রায় ২০-২৫ টা ডিভি আবেদনপত্র ছেড়েছিলেন। প্রতিবছরই এই কান্ড করেন। আমেরিকা নিয়ে তার এই পাগলামির নাম কি- আমার জানা নেই।
আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যদি কেউ আমেরিকাবাসী হয়, তাহলে বাজারে তার সেইরকম কদর। বিশেষ করে বিয়ে শাদীর ব্যাপারে তা খুব কাজে লাগে। বিয়ের কথা পাকা হওয়ার সময় মুরুব্বী শ্রেণীর কেউ বললেন, মেয়ের এক মামা তো আমেরিকায় থাকেন। ব্যাস!! মেয়ের দাম বেড়ে গেল। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সম্পর্কটি খুবই লতায়পাতায়। এই মেয়ে কোনদিন তার মামাকে দেখেনি, তার ওই আমেরিকাবাসী মামাও জানেন না, তার এই ভাগ্নিটির কথা। কিন্তু আমেরিকার গন্ধটি এমনই তীব্র- ক্ষীণতম সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দিব্যি সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।
এসব ক্ষেত্রে ছেলে পক্ষের কোন মুখরা আত্মীয় পাল্টি দেয়ার জন্য বলে ওঠেন, আমাদের ছেলেরও চাচা বা ফুফা একজন আমেরিকায় থাকেন। খোঁজ নিলে দেখা যাবে , আসলে ব্যাপারটি সত্য নয় মোটেও। ছেলের চাচারা সব থাকেন বরুন্ডী, আমেরিকার ত্রি সীমানা তো দূরের কথা , তারা কোনদিন মানিকগঞ্জ সদরেই আসেননি। আর ছেলের কোন ফুফু নাই, কাজেই ফুফা থাকার ব্যাপারটা পুরোটাই জাল। কথাটি নিতান্তই পাল্টি দেয়ার জন্য বলা, বিয়ের কথা পাকা হওয়ার সময় এইরকম পাল্টি দেয়া কথা তাৎণিকভাবে বানিয়ে বানিয়ে বলতে হয়, এতে দোষের কিছু নাই।
ইরাকে মার্কিনীদেও অন্যার্য্য ও বর্বর হামলার সময় দেশে মার্কিন বিরোধী আন্দোলন হয়। আমেরিকান পণ্য বর্জন, ওদের পতাকা পোড়ানো, বুশের কুশপুত্তলিকা দাহ আরও কত কি !!! এই আন্দোলনে অংশ নেননি- এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একজনকে পেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্টকে ইচ্ছেমত গালিগালাজ করা যায়, কটা দেশের গণতন্ত্রে এটা আছে ?
হোয়াইট হাউসের সামনে কখনও যাওয়া হয়নি। গেলে কিছু্ক্ষণ গালাগালি করে ঘটনার সত্যসত্য অবশ্যই যাচাই করবো।
ছেলেবেলায় বইতে পড়েছি, কলোম্বাস নামের জনৈক নাবিক আমেরিকা আবিষ্কার করেন। তথ্যটি যথেষ্ট কৌতুহল জাগ্রত করে। রাষ্ট্র বা দেশ সম্পর্কে আমার সাদামাটা ধারণা হল, কোন কোন দেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়, কোন কোন দেশ নিজের সীমানা ভাগাভাগি করে আলাদা হয়ে যায় আবার কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে দিয়ে একটি দেশে পরিণত হয়। কিন্তু একটা দেশ আবিষ্কার করা- এটা কেবল আমেরিকার পক্ষেই সম্ভব।
আমার এক ভাই, আমার মাকে ফোন করে বলেছেন, ওবামার জন্য দোয়া করতে। ওবামা নির্বাচিত হলে , অবৈধ অভিবাসীদের গ্রিনকার্ড দেবেন। এবার যদি দুইজন প্রার্থীই শ্বেতাঙ্গ হতেন, আমার মা তাদের দুইজনকে আলাদা করতে পারতেন কিনা- সন্দেহ। ওবামা কালো হওয়ায় তাকে সহজেই শনাক্ত করা গেছে। গ্রিণকার্ড কি জিনিস- আমার মা সেটা জানেন না। তবে এই টুকু বুঝতে পেরেছেন- ওটি খুবই মহার্ঘ্য বস্ত। দোয়া করেছেন নিশ্চিত, কেননা খবর শুনে মা ভীষণ খুশি। এখন উনার প্রশ্ন হচ্ছে, সবাই গ্রিণকার্ড পাবে তো? এটি এই সময়ের জন্য একটি গুরুতর প্রশ্ন বটে।
আমেরিকা একটি বিচিত্র রাষ্ট্র। তারা চাঁদে মানুষ পাঠায়, আবার অকারণে প্রচুর রক্তপাতে তাদের দ্বিধা নেই। তারা প্রেসিডেন্ট ভবণের নাম দেন হোয়াইট হাউস। যেখানে অবৈধ অর্থ মানে ব্ল্যাক মানি, চোরাই মার্কেট মানে ব্ল্যাক মার্কেট, নোংরা রসিকতা মানে ব্ল্যাক হিউমার। সেখানেই, তারাই আবার সকল সংশয় মুছে ফেলে একজন কালো মানুষকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে পাঠায়- ওই হোয়াইট হাউসেই।
আমি অবাক হয়ে দেখি।
জয়তু আমেরিকা।!!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



