জাহিদ ভাই ছিলেন শান্ত ও নিরীহ স্বভাব প্রকৃতির। তিনি সবসময় কম কথা বলতেন। কথা ও কাজে মিল রেখে চলতেন। অহমিকা বা কোনো ধরনে চতুরতা তার মধ্যে ছিল না। সংগঠনে সাধ্যমত সময় দিতেন। এক কথায় সহযোদ্ধার পূর্ণ অর্থ বলতে যা বুঝায় তা তার বৈশিষ্টের মধ্যে ছিল। ১৯৯৭-২০০০ সাল পর্যন্ত তার সাথে আমরা একত্র সংগঠন করেছি। জাহিদ ভাই-ই ৯৩’র পরে ১৯৯৮ সালে প্রথম স্বরূপকাঠী থানা সংসদের সভাপতি হন। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহসিন আর আমি ছিলাম সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
২০০০ সালের শেষে আমি ঢাকা চলে আসি। এখানে এসেও ছাত্র ইউনিয়নের যুক্ত থাকি। ২০০১ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হই। পড়াশুনা আর ছাত্র রাজনীতি চলতে থাকলো। এসময় আমি সাপ্তাহিক একতায় লেখালেখি শুরু করি। ২০০৩ সালের খুব সম্ভবত জুন মাসে সেলিনা নামের একটি মেয়ে সাথে আমার বিয়ে হয়। আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়ার কারণে আমরা ঘর-সংসার শুরু করতে পারিনি। তাছাড়া এই বিয়েতে আমার পরিবারের কেউ রাজি ছিল না। আমি তখন আমার বোনের বাসায় থেকে পড়াশুনা করছি। পড়াশুনা, ছাত্র রাজনীতি আর মাঝে মাঝে সেলিনাকে গিয়ে দেখা আসা এভাবে চললো ২০০৬ পর্যন্ত। ততদিনে আমি মোটামুটি লেখক হিসেবে নিজেকে দাড় করেছি। তখন আমি দৈনিক সংবাদে প্রতি মাসে সাহিত্য, রাজনীতি ও শিক্ষা বিষয়ে ৩/৪ পোস্ট লিখছি।
২০০৬ সাল ছিল রাজনৈতিক অরাজকতায় পরিপূর্ণ। ওই বছর প্রায়ই হরতাল-ধর্মঘট-অবরোধ লেগে থাকতো। একবার আওমীলীগ অনির্দিস্টকালের জন্য হরতাল-ধর্মঘট ডেকে ছিল। রাজনৈতিক পাড়া হিসেবে খ্যাত পল্টন-মুক্তাঙ্গনের রাস্তায় তখন জনসমূদ্র। কোথাও বত্তৃতাবাজী হচ্ছে, কোথাও সরকার পদত্যাগের মিছিল আবার কোথাও গণসঙ্গীত চলছে। ওই সময় মুকুন্দদাসের কয়েকটি গান প্রায় দিনই শুনতাম। ঢাকা এসে বহুবার উদীচীর অনুষ্ঠানে তাঁর শুনেছি। সবকিছু মিলিয়ে মুকুন্দদাসকে জানা আগ্রহ বেড়ে যায়। শুরু করি তাঁকে অধ্যায়ন। অধ্যায়ন শেষে হিসেব করে দেখলাম তাঁকে জানা খুব প্রয়োজন, বিশেষ করে আমরা যারা নতুন সমাজ নির্মানের জন্য কাজ করছি, তাদের তো অবশ্য। দুই বছর পর মুকুন্দদাসের রচনাসমগ্র বইটি বের করে নতুন সমাজ নির্মানের তরুণ, যুব, প্রবীণদের হাতে দিলাম। পরের বছর বিপ্লবী নলিনীদাস রচনাসমগ্র ও সরদার ফজলুল করিমের অগ্রন্থিত প্রবন্ধ সংকলন করলাম। এই বইগুলো সংবাদের মুনির ভাইকেও দিয়েছিলাম।
২০০৮ চলে গেল, ২০০৯ আসল। কোথাও আমার চাকুরী হল না। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার শুরু হতে ৩/৪ মাস বাকী। হঠাৎ একদিন পল্টনে হামিম ভাইয়ের সাথে আলাপকালে আমার কাজের কথা বললাম। তিনি বললেন পরীক্ষা শেষ করার পর তার ঢাকানিউজ২৪ডটকমে কাজ করার কথা। আমি রাজি হলাম। পরীক্ষা দিয়ে ঢাকানিউজ২৪ডটকমে কাজ শুরু করলাম। যুক্ত হলাম ডিজিটাল দুনিয়ায়। ঈশ্বর গুগোলের আর্শিবাদে প্রতিনিয়ত নানাকিছু জানতে থাকলাম, শিখতে থাকলাম। এবার সেলিনাকে নিয়ে ঘর-সংসার করার পালা। একটি বাসা বাড়া নিলাম। আমাদের ঘর-সংসার শুরু পূর্বেই একটি সন্তান হয়। ওর নাম সব্যসাচী। ওর নামের আগে ও পরে কিছু না থাকাতে পারিবারিকভাবে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অন্যদিকে ওই বছর ২৮ অক্টোবর ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিলাম। রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে একটি মাসিক পত্রিকা বের করা উদ্যোগ নেই। পত্রিকাটির নাম দেয় ‘বিপ্লবীদের কথা’। মুকুন্দদাস, নলিনীদাস রচনাসমগ্র করা ও কিংবদন্তী বিপ্লবীদের জীবনী পড়া এবং বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা ইত্যাদি কারণে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। আরেকটা বিশেষ কারণ এর সাথে জড়িত। আর তা হলো: কলেজ জীবন থেকেই বিপ্লবী হওয়ার এবং বিপ্লব করার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু সেই স্বপ্নটা ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বেই ভেঙ্গে যায়। তখন আমার সামনে যে সমস্থ বিপ্লবী মড়েল ছিল, তারা অতীতের বিপ্লবী মানুষগুলো থেকে এতটাই বিপরীত যে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। তখন প্রচন্ড হতাশ হলাম। নিজের এই হতাশা কাটাতে এবং আমার মত হতাশাগ্রস্থ তরুণদের হতাশা দুর করতে এবং নতুনদের হতাশায় না ফেলতে এই ‘বিপ্লবীদের কথা’ পত্রিকার মাধ্যমে বিপ্লবের নায়কদের তরুণ প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ২০০৯ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে মাসিক ট্যাবলওয়েড "বিপ্লবীদের কথা"।
প্রথম থেকেই এই পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙলা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সমকালীন বিপ্লবীদের জীবনী এবং তাদের আদর্শের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং সেই সাথে এই অঞ্চলের বিপ্লবী রাজনীতির একটা টাইমলাইন তৈরি করা। একটি "সমাজ বিপ্লব ও বিপ্লবী গবেষণা কেন্দ্র" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে গিয়ে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপ্লবীদের একটি এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরি করার। আমি ও পারভেজ আলম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তৈরী করি http://www.biplobiderkotha.com ওয়েবসাইটটি (২০১০ সালের শুরুতে)। সমাজ বিপ্লবীদের জীবনী, কর্মযজ্ঞ, আদর্শ আর সাড়াজাগানো সব লড়াই-সংগ্রামের অনলাইন অর্কাইভ গড়ে তুলতে নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে বিপ্লবীদেরকথাডটকম।
পেশাগত সাংবাদিকতা কিছু দিন ভাল লাগলেও পরে আর তা ভাল লাগেনি, প্রায় এক বছর পর্যন্ত। তার মূল কারণ ছিল প্রায় সময়ই সংবাদকে ছাড়-কাট করে অসল সংবাদ আড়াল করা হত। তাতে যা সত্য তা অনেক সময় হারিয়ে যায়। এটাও এক ধরণের নীতিহীনতা মনে করে নিজের পত্রিকায় পুরোদমে কাজ শুরু করি। ছেড়ে দেই অনলাইন নিউজ এবং সাংবাদিকতা।
২০১০ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা বের হওয়ার পর বরাবরের মত সাবেক বর্তমান ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ কর্মীদের হাতে তুলে দেয়। শাহাবাগের মোড়ে দেখা হয়ে যায় রাজশাহীর সাবেক ছাত্রনেতা প্রমথেশ দা’র সাথে। অনেকক্ষণ কথা হয়। তাকে বলি বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েব সাইটের জন্য ডোনার জোগাড় করে দিতে। এর আগেও আমি কমপক্ষ শতজনকে বলেছি এই পত্রিকাটিকে চালিয়ে রাখার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করতে। তারমধ্যে দু-একজন সহযোগিতা করছে। তারপরও আমাকে প্রতিটি সংখ্যায় সাবসিডি দিতে হয়ছে। পত্রিকাটি ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের মাধ্যমে প্রায় সারাদেশে যায়। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা থেকে প্রায় অস্টম সংখ্যা পর্যন্ত দাম ছিল ২ টাকা। যে কারণে সাবসিডি ছাড়া বের করা সম্ভব হত না।
প্রমথেশ দা সবকিছু শুনে সে আমাকে একজন ডোনারের কাছে পাঠানোর কথা দৃঢ়ভাবে বলল এবং তার সাথে অবশ্যই দেখা করতে বলল। আর বললেন যে তিনি আমার এই পত্রিকাকে সহযোগীতা করবেনই। আমি বললাম কে? প্রমথেশ দা বললেন আপনি তাকে চিনেন। নাম কি? দাদা বলল: অনন্য রায়হান, ড. অনন্য রায়হান, অর্থনীতিবিদ। জসিমউদ্দিন মন্ডলের নাতী। হ্যা, আমি চিনি। পার্টি অফিসে দু-একদিন কোনো সেমিনারে কথা বলতে দেখেছি।
তারপর ৫ মার্চ রায়হান ভাইয়ের সাথে দেখা করি। তিনি আমার কাজগুলোতে খুশি হলেন এবং আমাকে এই কাজগুলো করে যাওয়ার জন্য আরো অনুপ্র্রেরণা দিলেন। নানা বিষয় নিয়ে ঘন্টা দুয়েক আলোচনা হলো। তার মধ্য তিনি যে প্রতিষ্ঠানটিকে তীলে তীলে গড়ে তুলেছেন, সেটি সম্পর্কে আমাকে জানালেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম ডি.নেট। ডি.নেট তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে অধিক সম্পদ উপাদন এবং ওই সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যে দারিদ্রতা কমিয়ে আনতে কাজ করে। ডি.নেটের আইকন কর্মসূচী “গুণীজন” সম্পর্কে তিনি আমাকে বিস্তারিত বললেন। তিনি আমার এই সমস্ত কাজে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা করার কথাও বললেন। কথা অনুযায়ী তিনি তার সাধ্যমত বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েবের জন্য প্রতিমাসে সহযোগিতা করেন।
“গুণীজন” যাঁরা তাঁদের সৃজনশীল চিন্তা, মনন ও মেধা দিয়ে শান্তি, মানবতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন এবং এখনও যাচ্ছেন, যাঁরা তাঁদের লেখনী, শব্দমালা, বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের প্রিয় জন্মভূমির এসব গুণী ব্যক্তিবৃন্দকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলার একটি প্রয়াস এই গুণীজন উদ্যোগ। ‘গুণীজন ওয়েব জার্নাল http://www.gunijan.org.bd’ এই ওয়েব জার্নালে রয়েছে আমাদের দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের (ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ বিজ্ঞান, গণমাধ্যম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মানবাধিকার, নারী অধিকার আন্দোলন, সঙ্গীত, চিত্রকলা, দর্শন, ক্রীড়া, আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ইত্যাদি) গুণীজনদের বেড়ে ওঠার গল্প, তাঁদের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র, তাঁদের অডিও সাক্ষাৎকার, নির্বাচিত লেখা/সৃজনশীল কর্ম, পুরস্কার বা স্বীকৃতি, গুণীজনবৃন্দের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র ইত্যাদি। ১০২৩ জন গুণীজনকে নিয়ে গুণীজন কাজ করে যাচ্ছে। রায়হান ভাই এই উদ্যোগের সাথে আমাকে কাজ করার জন্য বললেন। আমি হিসেব নিকেস করে ‘গুণীজন’-এ কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম। ৮ মার্চ ‘গুনীজন’ টিম এর সাথে কথা হল। এই কমৃসূচীর সমন্বয়ক হলেন উর্মি লোহানী, রায়হান ভাই’র স্ত্রী, ভাবী। তার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা হল। এসময় তার সাথে ছিলেন, মৌরী তানিয়া, তিনি গুণীজনে ৩ বছরেরেও বেশী সময় ধরে কাজ করছেন। আমি ১৬ মার্চ গুনীজনে অফিসিয়্যালি যুক্ত হলাম। সেই থেকে আজ ৩০/০৬/২০১১ পর্যন্ত আমি গুণীজনে কাজ করছি। যে কারণে একই সাথে আমার স্বপ্নগুলো প্রতিনিয়ত একটু একটু বাস্তবায়ন করতে পারছি। অন্য কোথাও চাকুরী করলে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েবের জন্য কাজ করার সময় পেতাম না। আরো অসংখ্য হতাশাগ্রস্থ রফিকদের কাছে এই পত্রিকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। এমনকি হয়তো সম্ভব হতো না, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বসবাস করে তার সাথে থাকা। এখন আমি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আমার আশা, স্বপ্ন ও স্বপ্নের সমাজ, শোষণমুক্ত সাম্যের সমাজ নির্মাণের কাজ অনেকখানি নিয়ে যেতে পারছি। এই কাজগুলো করার ক্ষেত্র অর্ধেকেরও বেশীর কৃতৃত্ব রায়হান ভাই ও তার ডি.নেটের এবং বাকীটুকু আমার চেষ্ঠা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

