somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিলেতের হাওয়া (৬)

০২ রা জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকল ফরমালিটিজ শেষ করে এয়ারপোর্টের বাইরে বের হলাম। এবারে তাজুল ভাই’র সাথে যোগাযোগ করা দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার কাছে ফোন তো আছে মাগার সিম নেই। বাইরে বেরুতেই ছুটে এলো ইয়ামোটা বডিওয়ালা কুচকুচে কালো এক লোক। ট্যাক্সি চালক। এসে বললো, কোথায় যাবেন?
আমি বললাম, আমাকে নিতে একজনের আসার কথা, এসেছেন কিনা-বুঝতে পারছি না। তাকে একটা ফোন করা দরকার। আপনি কি আমাকে আপনার মোবাইলে এক মিনিট কথা বলার সুযোগ দিতে পারেন?

বিরস মুখে সে ফোন এগিয়ে দিল আমার দিকে। ফোন দিলাম তাজুল ভাইকে। তাজুল ভাই দু’টি নাম্বার ব্যবহার করেন। এই মুহুর্তে আমি যে নাম্বারে রিং করেছি সেটা বাসায় রাখা। ফোন রিসিভ করলেন আপা।
সম্ভবত আমার নাম সেভ করা। বললেন, আপনি কখন এসে নামলেন।
আমি বললাম, এই তো, একটু আগে।
বললেন, আপনার ভাইকে পেয়েছেন?
বললাম, না।
বললেন, অনেক আগেই তো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। সাথে ইউসুফও আছে। অন্য নাম্বারটি সাথে আছে। দাঁড়ান, আমি আপনার নাম্বার তাকে দিয়ে দিচ্ছি।
বললাম, নাম্বার দিয়ে লাভ হবে না আপা। আমি হাওলাত করা মোবাইলে কথা বলছি। তারচে’ এক কাজ করলে কেমন হয়। আমি না হয় ট্যাক্সি করেই চলে আসি?
আপা বললেন, কী বলছেন! ট্যাক্সিতে আসবেন কেন? দু’ এক মিনিটের মধ্যে ইউসুফরা পৌঁছে যাবে। আপনি জাস্ট একটু অপেক্ষা করুন।

ফোন ফিরিয়ে দিলাম ট্যাক্সিওয়ালাকে। লোকটি নাইজেরিয়ান। নাম জিজ্ঞেস করলাম। বললো মোহাম্মেদ। বললাম, মোহাম্মেদ তোমাকে ধন্যবাদ।

আবার ফিরে গিয়ে ঢুকলাম এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপে। প্রথমেই একটা সিম কেনা দরকার। প্রতিটি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টেই একটা করে ডিউটি ফ্রি দোকান থাকে। তবে সেগুলোর জিনিষপত্রের যা দাম, তাতে ডিউটি ট্যাক্স ভ্যাট ছাড়া আরো দু এক প্রকার র্ক থাকলেও দাম এত হবার কথা না।

দোকানে লম্বা পাঞ্জাবী দাড়িওয়ালা এক মুসলমান দাঁড়িয়ে আছেন। সুন্দর করে একটি সালাম দিলাম। বললাম, আমি একটি সিম কিনতে চাচ্ছি। কোন্ সিম কিনলে ভাল হবে বলেন তো?

তিনি বললেন, এখান থেকে কিনলে তো অনেক দাম পড়ে যাবে। দশ পাউন্ড নেবে। বাইরে অনেক সস্তায় পেয়ে যাবেন।
আমি বললাম, কিন্তু আংকেল, আমার তো এখনই দরকার। আমার রিলেটিভ আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে এসেছেন বা আসছেন। তার সাথে তো যোগাযোগ করা দরকার।
তিনি ম্যানিব্যাগ বের করে খোঁজাখুজি করে একটি সিম বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। বললেন, এটা নিয়ে যান। কাজ চালান।

আমি বললাম, না, না। আপনার সিম নিতে হবে কেন? আপনার তো সমস্যা হবে।
তিনি বললেন, আমার কাছে বাড়তি আছে। এটি এক্সটা নাম্বার। আমার কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া আল-মুসলিমু আখুল মুসলিম। ভাই হয়ে ভাইকে সাহায্য করবো না?
ভাই আমাকে সাহায্য করলেন। আমি ‘থ্যাংক য়্যূ আংকেল’ বলে সিমটি নিলাম। বললাম, আংকেল আপনার নাম কিন্তু এখনো জানা হয়নি?
তিনি বললেন, আমি রিজকী সাঈদ।
নিশ্চয়ই আরবী?
আমার দেশ মরক্কো।

রিজকী সাঈদ আংকেলের কাছ থেকে দো’আ নিয়ে বিদায় নিলাম। তিনি বললেন, ভাল থাকবেন, আবার দেখা হবে, বলেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে গেলেন। আবার কোথায় দেখা হবে, কীভাবে হবে, ভেবে পেলাম না আমি।
ভদ্রলোক চলে যাবার পর খেয়াল হলো বড় একটা বোকামী হয়ে গেছে। মানুষটির কন্ট্রাক্ট নাম্বার জেনে রাখা উচিৎ ছিলো। অন্তত একটি ধন্যবাদ দেবার জন্য।

বেরিয়ে এলাম আবার। এয়ারপোর্টের বাইরে। প্রচন্ড ঠান্ডা এসে ঝেঁকে ধরলো। তাজুল ভাই ও ইউসুফ গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হলেন। তাজুল ভাই বললেন, আমার যুক্তরাজ্য জীবনে এই প্রথম ৩০ মিনিট জ্যামে আটকা থাকলাম। সম্ভবত এক্সিডেন্ট-টেক্সিডেন্ট হয়েছে। কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গেল। গাড়িতে উঠলাম। ইউসুফ আপেল, জুস ইত্যাদি বের করে দিলো। ৩০ মিনিটে গিয়ে পৌছলাম সাউথ ইষ্ট লন্ডনস্থ তাজুল ভাই’র বাসায়।

বাসায় ঢুকেই মনটা ভরে গেল টি-টেবিলের দিকে তাকিয়ে। অত্যন্ত যত্নকরে পানদান সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কাজটি আপা করেছেন। আপা মানে ফরিদা আপা। তিনি হলেন মুসার আপন বোন। আমি যাবার আগেই তিনি মুসাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হ্যা-রে মুসা, রশীদ ভাই কী খেতে পছন্দ করেন রে?
মুসা পানের কথাই বলেছে।

পাঠক সম্ভবত কিছুটা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এক দিকে আমি আপা বলছি অন্যদিকে আমাকে উদ্দেশ্য করে আপার সম্বোধনটা ‘আপনি’ হিসেবে প্রকাশ করছি। ঘটনা কী?

ঘটনা হচ্ছে, আপা হলেন মুসার আপা। সঙ্গত কারণে আমারও আপা। সেই সুবাধে তিনি আমাকে তুই করে সম্বোধন করবেন, খুব বেশি হলে তুমি, এটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি আপনিতেই চালিয়ে যেতে লাগলেন। সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা ঘটতে লাগলো। স্নেহ করছেন ছোটভাই মতো অথচ সম্বোধন আপনি! এ নিয়ে একদিন প্রশ্নও করলাম তাকে। বললাম, আচ্ছা আপা, আপনি আমাকে আপনি আপনি করে বলছেন কেন?
তিনি বললেন, বয়সে আপনি আমার বড়ই তো হবেন।
বয়স নিয়ে ঘাটাঘাটি না করেই বললাম, বয়স কার বেশি কার কম, সেটা বিবেচ্য নয়। আপা তো আপাই।
তিনি বললেন, তবুও।

আমি আর কিছু বললাম না। মনে মনে ভাবলাম, বড়ভাই হয়ে যেতে পারলেও মন্দ হবে না। তাজুল ভাই আর ধমকা-ধমকি করার সুযোগ পাবেন না। আমি আপার বড় ভাই হওয়া মানে তো তারও বড় ভাই বনে যাওয়া। আর বড় ভাই’র সাথে কেউ উঁচি আওয়াজ মে বাত বি নেহি করতা। ভাবতে লাগলাম ব্যাপারটি তাজুল ভাই’র নলেজে কিভাবে দেয়া যায়।
--------------
আলিশান পানদান। দু’তলা ফাউন্ডেশন। নিচতলায় সুপারী পান ও চুন, উপর তলায় বিশালাকায় হাকিমপুরীর কৌটা। আয়েশ করে একটি পান মুখে দিলাম।

মিনিট দশেক রেষ্ট করে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। লক্ষ্য করলাম প্রচন্ড মাথা ধরেছে। ধরারই কথা। দু’রাত হয়ে গেছে ঘুমানো হয়নি। তার উপরে লম্বা জার্নি। বিশাল খানাপিনার আয়োজন দেখে ভড়কে গেলাম। মাথায় এতবেশি যন্ত্রণা করছে যে, একটি ভাতে কামড় দিতেও ইচ্ছে করছে না। তবুও খেতে হবে। আমার পেটের জন্য না হলেও কষ্ট করে রান্না করার জন্য।

প্রথমেই বড় ট্রেতে চেপে সামনে এসে হাজির হলেন বিশাল এক মাছ। সামুদ্রিক মাছ হবেন। মাছের সাইজ এত বড় যে, আপনি করেই বলতে হচ্ছে। মাছের সাইজ দেখে আমার যন্ত্রণাকাতর ভোতা মাথায় প্রথমেই যে প্রশ্নটি উদয় হলো, তা হচ্ছে, এত বড় মাছ আস্তো ভাজি করবার জন্য এত বড় কড়াই পেলেন কোথায়?

কোনো রকমে মাছ বাবাজির এক পাশে চিমটি দিয়ে একটু নিলাম। অন্যান্য মাছ মাংশ মাইন্ড করলেও কিছু করার নেই। গুনে গুনে ৩/৪ লোকমা মুখে দিয়ে না চিবিয়েই গিলে ফেললাম। কোনো রকমে এশার নামাজ আদায় করলাম। পুরোটাই পড়তে হলো। শয়তান কানের কাছে এসে ফিস্ ফিস্ করে বললো, ব্যাটা বেকুব! ১৫ দিন থেকে কম সময় থাকার নিয়ত করে এলিনা কেন? মুসাফিরের ক্যাটাগরিতে পড়তে পারতি। তাহলে তো ফরজ নামাজের ফিফটি পার্সেন্ট ও সুন্নতের হান্ড্রেড পার্সেন্ট মাফ পেয়ে যেতি। ১০/১২ দিন পর নতুন নিয়তে সময় বাড়িয়ে নিতে পারতি!

সোজা চলে গেলাম বেডে। আবিস্কার করলাম পানদানের মতো খাটও দু’তলা। আমার থাকার ব্যবস্থা করবার জন্য খাটটি আজই কেনা হয়েছে। ইউসুফ বললো, রশীদ ভাই, আপনি উপরে ঘুমাবেন না নিচে ঘুমাবেন?

আমি বললাম, অবশ্যই নিচে। কারণ একটি ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, ঘুমের মধ্যে আমার একটু নড়াচড়া করার অভ্যেস আছে। ৫ ফিট উপরে থেকে পড়ে যাওয়া তো কোনো কাজের কথা না।

বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে উঠে হিসাব করে দেখলাম টানা ১০ ঘন্টা ঘুমিয়েছি।


...চলবে

৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×