somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মাসঙ্গী

০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাস থেকে নেমে কয়েক কদম হাটতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা ধরে এলো। ভাগ্যিস!! ছাতাটায় একটা ফুটো আছে; বেছে বেছে একেবারে মাথার ওপরে। বেশীক্ষণ বৃষ্টিতে থাকলে ঠিক ঠিক মাথা ভিজে যেতো। মন্দের ভালো যে এই ছাতাটার রং বৃষ্টিতে গলে গলে পড়ে না; একবারতো সস্তায় ছাতা কিনে কালো রঙ্গে পুরোই ভূতুড়ে অবস্থা।

তৌফিক ছাতাটা বন্ধ করলো না; রাস্তায় বৃষ্টির জল জমেছে। এখন জ্যাম; কিন্তু একটু জোরে গাড়ি চললেই কাদাজল জামা রাঙ্গিয়ে দেবে। বহুদিন পথচারীর অভিজ্ঞতায় এখন সে পাকা খেলোয়াড়; কাদাজল ছুটে আসার আগেই বর্মের মতো ছাতাকে রক্ষাকবচ করে ফেলতে পারে। ওর বামদিকে গাড়িরা; ফুটপাতের ডানপাশে সুন্দর সাজানো সব ঝকঝকে দোকান। এলিফ্যান্ট রোডে সবসময়ই বড্ড যানজট থাকে। তৌফিক হাঁটছে এই ব্যস্ত রাস্তার যানবাহনের স্রোতের উল্টোদিকে।

রায়হান কে অফিসে পাওয়া গেলেই হয়; আজ না জানিয়েই ওর অফিসে যাচ্ছে। আগে কয়েকবার বলে যাওয়াতে রায়হানকে পাওয়া যায়নি। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা!!! রায়হানের জন্য কিছুই না; আর সেই কবে ধার নিয়েছিলো। ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ না হলে তৌফিক এই সামান্য টাকার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতো না কখনো। টাকা ধার চাইতে লজ্জা লাগে জানতো এতোদিন...এখন তৌফিক জানে পাওনা টাকা ফেরত চাইতেও বড় ছোট লাগে নিজেকে। কিন্তু তৌফিক নিরুপায়...প্রায় দিন আনি দিন খাই অবস্থা ওর।

জট খুলেছে একটু; গাড়িরা চলা শুরু করেছে। আপাতত চিন্তা বাদ; সারি সারি চাকার দিকে চোখ রাখলো তৌফিক। একটা শাদা গাড়ী ফুটপাতের পাশ ঘেঁষে জমে থাকা জলে আলোড়ন তুলতেই ও ছাতা বাগিয়ে ফেলল। জলের পিচকারী ঠিক সিনেমার মতো স্লো মোশনে ছাতায় ধাক্কা খেয়ে ওর পায়ের কাছে পড়লো। গাড়িগুলো আবার থমকে গেছে; তৌফিক বিজয়ীর ভঙ্গীতে ছাতা সরালো।

দুটো গাড়ির পরেই একজোড়া চোখ; ভুরুর মাঝে একটু বিরক্তির ভাঁজ তুলেই আয়ত নয়ন। চোখজোড়া খুব চেনা; ওই চোখ এখনও ওর সাথে থাকে ঘুম ভাঙ্গলে, ঘুমাতে যাবার সময়ে। ঘন কালো ধনুক ভুরু; রেগে গেলেই ভুরুজোড়া বেঁকে টঙ্কার তোলে। তৌফিক ছাতা নামিয়ে মুখ ঢাকলো। ভাগ্যিস ফুটোটা আছে!! দেখলো চোখ নামানো; সোনালী রিমের রিডিং গ্লাস। এখনও মানুষটার যানজটে বসে বই পড়ার অভ্যাস আছে। খোলা চুল; একটা সবজে শাদা শাড়ি জড়ানো। আগে এমন হালকা সবুজ পরতো না তো? কিন্তু মানিয়েছে বেশ। ঠিক যেন বর্ষাদিনের সদ্যস্নাত রজনীগন্ধা; বড় স্নিগ্ধ, বড় পবিত্র।

তৌফিক রজনীগন্ধার সুগন্ধ পাচ্ছে। ঠিক এই কথাটাইতো বলেছিলো সেদিন ওকে।
- আপনার কি ভয় লাগছে?
- একটু একটু…
- আগে কখনও রক্ত দেননি বুঝি?
- দিয়েছি বেশ কয়েকবার…কিন্তু আমার সূচবেঁধা দেখতে খুব ভয় করে…সুচ দেখলেই চীৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে!!!
- ওহ…আপনার fear of needles আছে…আপনি সূচ ফোটানোর সময়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন…তাহলে আর ভয় করবে না।

মেয়েটা টকটকে লাল জামা পড়েছিলো; ঠিক রক্তের রং। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচীতে গিয়ে অরনীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো তৌফিক। খুব সুন্দর নয় অরনী; কিন্তু চেহারাতে বেশ ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে। গলায় ঝোলানো চশমা যখন মাঝে মাঝে চোখে উঠছে আরো সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিলো অনেকটা সুচিত্রা সেনের মতো; খরস্রোতা নদী কিন্তু কোথাও বাধ দেয়া আছে…জল ছলকে পড়বে না।

- আপনার রক্তের গ্রুপ কি?
- AB+…কেন বলুনতো?
- আমারও একই গ্রুপ। আপনি কি জানেন যে একই ব্লাড গ্রুপ হলে সোলমেট হয়? আত্মাসঙ্গী!!

অরনী হেসে ফেলেছিলো “তাই বুঝি? আপনার এই থিওরীতো চিকিৎসা শাস্ত্রে কখনো পড়িনি? কোথায় পেলেন?”
- এইমাত্র এই “আত্মাসঙ্গী” তত্বের উৎপত্তি হলো। আপনাকে দেখার পরে।
“তাই বুঝি!!!” অরনীর ঠোঁটে চাপা হাসি “আপনার এই তত্ব যে প্রমাণ ছাড়া মানতে পারছি না…”

- আপনাকে যদিও আজ রঙ্গন ফুলের মতো দেখাচ্ছে আমি কিন্তু রজনীগন্ধার সৌরভ পাচ্ছি!!
অরনী অবাক “বুঝিনি ঠিক...কি বলছেন?”
- আমার না রজনীগন্ধা খুব পছন্দের ফুল…
- ওমা তাই…আমারো…
- আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ…তবে সবার ‘বনলতা সেন’কে ভালো লাগলেও আমার কিন্তু ‘সুরঞ্জনা’ই প্রিয়…
- হুউউউ…’আকাশলীনা’ আমার খুব প্রিয় কবিতা। ভাবতেই অস্থির লাগে যে কোন এক যুবক ব্যাকুল হয়ে বলছে ‘ফিরে এসো…নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে…কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!”

- আচ্ছা আপনি গ্রিক মাইথোলজি পড়েছেন?
- হ্যা…কি অদ্ভূত সুন্দর সব দেব দেবীরা!!! হেলেন অব ট্রয়…মর্ত্যলোকের সব কিছুতেই অলিম্পাসের দেব দেবীদের হস্তক্ষেপ…হোমার…ইলিয়াড…
- আপনি নিশ্চয়ই একিলিসের চাইতে হেক্টরকেই বেশী ভালোবেসেছেন…
- একিলিস বড্ড নিখুঁত…নিখুঁত কোন মানুষই আমার ভালো লাগে না যে। খুব নিষ্ঠু্র…মৃত হেক্টরকে সে যখন রথের পেছনে দড়ি বেঁধে টেনেছে তখন কিন্তু আমি হেক্টরকেই ভালোবেসেছি।
- শুধু একিলিসের গোড়ালিতে যখন তীর বিঁধেছিলো তখন মায়া হয়েছিলো আপনার...তাই না?
- আশ্চর্য!!! কি ভাবে জানেন?
- ওই যে বলেছিলাম না আমি আপনার সোলমেট…প্রমাণ দিলাম…হা হা হা!!

অরনীর মুখে একটু লাল আভা “এটা মোটেও ঠিক করেননি। না জানিয়ে আমাকে টেস্ট সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করেছেন।“
- বাহ…সে তো আমি নিজেকেও টেস্ট সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করেছি…কাটাকুটি!!
রক্ত দিতে দিতেই কথা অনেকদূর এগিয়ে গেলো “শুনুন আপনার নম্বরটা দেয়া যাবে? সোলমেট না হলেও একিলিস হিল হতেই পারি…” এখনও অবাক লাগে স্বভাবে মুখচোরা তৌফিক সেদিন কি ভাবে এমন সব কথা বলেছিলো। নাকি প্রেমে পড়লে এমনটাই হবার কথা?

সম্পর্ক এগিয়েছিলো বর্ষাকালের হঠাত নামা ঝুম বৃষ্টির মতো; বোঝার আগেই ভিজে সারা। কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ভিজে কারো কারো নেশা হয়; কেউ কেউ জ্বর তপ্ত কপাল, বুকে বাঁধা অসুখের তোয়াক্কা না করে সে বৃষ্টিতে ভালোবাসার হাত ধরে ভেজে। অরনীর বাসার লোকেরা রাজী ছিলো না; চালচুলোহীন ইতিহাসে পড়া একজন ছেলের সাথে তাদের মেধাবী সুন্দরী ডাক্তার মেয়ের বিয়ে!! সারা পৃথিবীর রৌদ্রচক্ষু উপেক্ষা করে ওরা দু’জন বৃষ্টিমানুষ পরষ্পরের হাত ধরেছিলো।

বৃষ্টি কেটে একসময় রোদ ওঠে। সেই যাচ্ছেতাই বিকেলবেলা; অরনীর সুটকেস আর ব্যাগ গোছানো। “খবরদার!!!হাত ধরবে না...থাকব না আর তোমার সঙ্গে, তোমার সঙ্গে থাকা যায় না...” হলুদ কালো মৌমাছি ট্যাক্সি; “আর কক্ষনো খুজবে না আমাকে....একসাথে এক পা চলারও লোক না তুমি...” দড়াম করে দরজা টানা। পেছন পেছন দৌড়ে এসে কালো ধোঁয়ায় মুখ ঢাকা তৌফিক।

“আত্মাসঙ্গী চাইলে তুমি কি ভীষণ কঠিন!! কয়েকশো ফোন কলের জবাব দাওনি, তেত্রিশটা ই-মেল...বাসায় গেলে দেখা করনি...” ডাকে হলুদ বড় খামে ডিভোর্স লেটারে জবাব এলো শেষে; বাসায় গেছে, দরজায় মস্ত তালা ‘আর এখানে কেউ থাকে না।‘ মেঘ সরে ঝলমলে রোদ; অরনী দেখেনি ওকে। গাড়ি চলে গেছে; তৌফিক ছাতা বন্ধ করলো। “এখন কেউ থাকে না...এক পা চলারও লোক না আমি...কেউ থাকে না আমার মতো লোকের সঙ্গে...”

বাসায় ফিরেই অরনী পুতুলের খবর নিলো; আজ মাহীনের হাসপাতালে রাতের ডিউটি। গিজার অন করে তাড়াহুড়ো করে গোসলে ঢুকলো; ফুলঝুরি স্নান; তপ্ত জলের স্ফুলিঙ্গ সব ছড়িয়ে পড়ছে এদিক ওদিক। “আমাদের মেয়েটার নাম দেবো পুতুল...ঠিক তোমার মতো একটা পুতুল!!” ওই লোমশ বুকে মাথা রেখে কত রাতের গভীরে কথার জাল বুনেছে ওরা দুজন। কতোদিন পরে ওকে দেখলো...পাঁচ বছর!!! ঝরনার জলে মিশে যাচ্ছে চোখের নোনাজল; তৌফিক ওকে দেখেনি।

আশ্চর্য!!! দুজন মানুষ শহরের দু’প্রান্তে দাঁড়িয়ে ঠিক একই মুহূর্তে একই কথা ভাবছে। আত্মার সঙ্গীরা কি এমনটাই হয়?

© শিখা রহমান (০৪/০৬/২০১৬) (ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৪৭
১০টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনার নতুন ব্যর্থ প্রজেক্ট, তারেক জিয়াকে দেশে ফেরত আনা

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৫৪


News on Tareq Zia

তারেক জিয়াকে কি দেশে আনা সম্ভব? না, পুরোপুরিই অসম্ভব: বেগম জিয়া জেলে আছেন, লন্ডনে তারেকের পরিবার আছে, অপরিণত বয়স্ক মেয়ে আছে, জামাতের বিশাল শিকড় আছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগাররা ফিরে আসুন

লিখেছেন সম্রাট ইজ বেস্ট, ২২ শে এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:০৮



খুব দুঃখ নিয়ে লিখছি। ব্লগে যোগ দেয়ার পর থেকে জানামতে কারো সাথে মনোমালিন্য হয়নি। একআধটু ঠোকাঠুকি হয়ত হয়ে থাকতে পারে তবে সেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই হলো অবস্থা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ৮:৫৮



১। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মার সাথে কিছুক্ষন গল্পগুজব করি। একদিন মার সাথে গল্পগুজব না করলে মা গাল ফুলিয়ে থাকে।
সেদিন মাকে বললাম, সুরভি খুব বিপদে পড়েছে। বুয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

হতে চাই তোরই সঙ্গিনী

লিখেছেন নীলপরি, ২২ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ৯:১৪





ছবির শিল্পী - Eszra Tanner



মেঘ, একটু ধীরে চল
পিপাসার্ত চাতকের মতো প্রতীক্ষমণা
তোর ছায়া ধরবো হাতে
তুই একটুখানি গল্প শোনা
ঘুম ভাঙা এই প্রভাতে!


টলটলে দীঘি-জলে কেনো ফেললি
তোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেমিক হতে হলে

লিখেছেন শিখা রহমান, ২৩ শে এপ্রিল, ২০১৮ দুপুর ১:৪৭



জানি প্রেমিক হতে হলে দামাল হতে হয়,
ঝড়োয়া হাওয়ার মতো দমকা, বৃষ্টির মতো তুমুল।
মনের বাঁ দিকে থাকতে হয় আরেকটা কল্পতরু মন;
ঝাকড়া চুলে স্বর্ণ চাপার গন্ধ,
বুকে নীল আকাশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×