আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দিন বদলের সনদে যে পাঁটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে সুশাসন অধ্যায়ে বলা হয়েছে- “বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে। মানবাধিকার লংঘন কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে। জনজীবনের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তেলা হবে।” তবে আইন শৃংখলা রক্ষায় এ সনদের তেমন কোন প্রতিফলন ঘটেনি। ব্যর্থতার পাল্লাই বড় করে দেখা দেয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসেবে এ সরকারের এক বছরে খুন আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। এবছর ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় পাচঁটি থানা বাড়িয়ে ৪০টি করা হয়। সারাদেশের মোট ৫৯৩টি থানা এলাকায়ই অপরাধ বেড়েছে। গত বছর মোট খুন হয়েছিল ৪০৯৯টি। প্রতি মাসে গড়ে খুন হয়েছিল ৩৪১টি। এবছর প্রতি মাসে গড় খুন ৩৫৫টি। এ বছরের জানুয়ারী থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৯১৪ জন খুন হয়েছে। এবছর প্রতি মাসে গড় ডাকাতি ৬৫টি ও গড় দস্যুতা হয়েছে ১১০টি। গত ১১ মাস ১১৯৭৫টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ মাসে ২৭৭৫ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। প্রতি মাসে গড়ে ২৫২ জন নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছেন। সরকারের ১১ মাসে ৭৫৭ টি অপহরণের ঘটনা হয়েছে। এ বছরে ৮৪৭৭টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
রাজধানীতে এ বছরে জানুয়ারী থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৪৩৬ জন খুন হয়েছে। অথচ গত বছর একই সময় খুন হয়েছিল ৩০৭ জন। এবছর ডাকাতি হয়েছে ৮৪টি। দস্যুতা হয়েছে ২৯৮টি। টেলিফোনে চাঁদাদাবীর কারণে লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠলেও তারা থানায় অভিযোগ করতে সাহস পায়নি। পুরাণ ঢাকার ডাকাত শহিদ ও মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের নামে এ চাদাঁবাজি চলেছে। ২৮ জুন রাজধানী কাওরান বাজারে চাদাঁবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দিবালকেই তিনজন খুন হন। এ সরকার মতা নেয়ার কিছুদিন পরই চাঁদার দাবিতে রাজধানীর পুরাণ ঢাকায় এক নিরীহ যুবককে হত্যা করে লাশ টুকরা টুকরা করার মত নির্মম ঘটনা ঘটেছে। মানুষ আইনের ওপর ভরসা রাখতে পারেনি বলে পিটিয়ে খুন করেছে প্রায় অর্ধশত। বিয়ানী বাজারে থানার ওসি নিহত হয়েছেন সন্ত্রাসীদের গুলীতে।
বেআইনী গ্রেফতার:
গত এক বছরেই বিনা পরোয়ানায় আটক হয়েছেন এক লাখ ৮৩ হাজার ৬৩০ জন ব্যক্তি। বছর জুড়ে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির জের টেনেছে নিরীহ নিরাপরাধ মানুষ। বিনা পরোয়ানায় ধরপাকড়ের শিকার হয়েছেন তারা। ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারার সঙ্গে এ জাতীয় বিভিন্ন ধারায় তারা গ্রেফতার হয়েছেন। কোন অপরাধ না করেও শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার হয়েছেন লোকজন। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত জানুয়ারী থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরোয়ানা বলে চার লাখ ৬১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় সংসদ সদস্য ফজলে নুর তাপসের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলার পরই সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার বেড়ে যায়। গত ২১ অক্টোবর এ বোমা হামলা হয়। এরপরই ব্যাপক ধরপাকড় চলে। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আত্মীয় স্বজনদেরও এ ঘটনায় সংশ্লিস্টতা দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয়। তাদের প্রত্যেককে কয়েক দফা রিমান্ডে নিলেও বোমা হামলার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে পারেনি সরকার। তাপসকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা, ভারতীয় হাইকমিশনার ও এটর্নী জেনারেলকে জীবননাশের হুমকী, রাজস্ব বোর্ডে হামলার হুমকীসহ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বড় উদাহরণ ছিল।
টেন্ডারবাজি:
বর্তমান মহাজোট সরকার মতা নেয়ার পরপরই সারাদেশে টেন্ডারবাজি শুরু করে সরকার দলীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কোন কিছুই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের একতরফা টেন্ডারবাজির কারণে সাধারণ অভিজ্ঞ ঠিকাদারেরা কাজ পায়নি। এদের কাছে প্রশাসনও এখন জিম্মি। একই টেন্ডার তিনবার আহবান করার পরও আসল ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দিতে পারেননি। জেলায় জেলায় তৈরী হয়েছে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন গ্র“প। জোট সরকারের জায়গায় মহাজোট, যুবদলের জায়গায় যুবলীগ আর ছাত্রদলের স্থান দখল করে ছাত্রলীগ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন অফিসে ঠিকাদারি নিয়ে আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও ছাত্র লীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ছিল বছর জুড়েই। টেন্ডারবাজির ঘটনায় শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র লীগের দুই গ্রুপের ১৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে।
এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য ছাত্র লীগ ক্যাডারদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতা:
চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত ১১ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০৪ জন ব্যক্তি নিহত এবং ১৩২১৮ জন আহত হন। নিহতদের বেশিরভাগই আওয়ামীলীগ-বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কিংবা অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে উপজেলা নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা বিশেষভাবে উলে−খযোগ্য। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শিা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আওয়ামীলীগ সমর্থক ও কর্মীরাই এসব সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের হিসেবে এ বছরের প্রথম ১১ মাসে নয়টি রাজনৈতিক দাঙ্গার রেকর্ড করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড:
পুরো বছর জুড়েই ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চালিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্র“তি ভংগ করে। শেষ পর্যন্ত 'ক্রসফায়ার' বন্ধে উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসে ক্রসফায়ারকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। মাদারীপুরে র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে দুই সহোদরের মৃত্যুর পর উচ্চ আদালত এগিয়ে এসে ক্রস ফায়ার নিষিদ্ধ করে। এরপরই ক্রসফায়ারের গতি থমকে গেছে।
আওয়ামী লীগ ঘোষিত নির্বাচনের আগে দিন বদলের সনদ ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ ৫টির মধ্যে একটি শ্রতিশ্র“তি ছিল বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে। এর ৫(২) এ বলা হয়েছে, বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা হবে। মতায় এসেও তারা এটি বন্ধ করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার নিজেই তা ভংগ করে। এর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর আইনের শাসনের পরিপন্থী বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সরকারী স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। অধিকার-এর মতে, ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ১১ মাসে ১১৮ জন ‘ক্রসফায়ার,এনকাউন্টার বা শুটআউট’-এ নিহত হয়েছেন।
গত ৩ ফেব্র“য়ারি ২০০৯ জেনেভার হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ (ইউপিআর) এ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা হয়। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মণি জানান, আওয়ামীলীগ সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ রয়েছে। গত ১১ ফেব্র“য়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যারা ঘটাবে, তাদেরও বিচারের সম্মুখীন করা হবে।’ গত ৫ মে ক্রসফায়ারকে আর আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া হবেনা বলে আশ্বস্ত করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তবে পরদিনই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সঙ্গে সরকার জড়িত নয়। তবে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ র্যাব আত্মরক্ষার্থে যা যা করা দরকার তা করবে। পরে ১৬ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, আত্মরার্থে এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটতেই পারে। সন্ত্রাসীদের ধরতে গিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আঘাতপ্রাপ্ত হলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন ‘আমরা কখনোই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী একতরফাভাবে গুলি খাবে, প্রাণ হারাবে তা তো হতে পারে না।’ গত ১২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শামসুল হক টুকু বলেন, ‘ক্রসফায়ার বলতে কিছু নেই। ক্রসফায়ার নিয়ে যে সব কথা বলা হয় তা আদৌ ক্রসফায়ার নয়। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর আত্মরক্ষার সময় এসব মৃত্যু ঘটে।’ নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান গত ৩ অক্টোবর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনোভাবে দমন করা যাচ্ছে না বলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটছে। সন্ত্রাস বন্ধের বিকল্প পন্থা হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এক সময় এমনিই সন্ত্রাস বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন হবে না’। এর ৫ দিন পর গত ৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের ফতুল−ায় গিয়ে বলেন, ‘দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এনকাউন্টারে কোন সন্ত্রাসী নিহত হলে তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না। বর্তমানে এনকাউন্টারের কারণেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ রয়েছে।’ এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন মানবাধিকার দুতও সরকার প্রধানের সঙ্গে দেখা করে ক্রসফায়ার বন্ধের প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়।
লাগামহীন ছাত্রলীগ:
পুরো বছর জুড়েই ছাত্রলীগ লাগামহীন তান্ডব চালিয়েছে। সংঘর্ষ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অবনতি করার মতো সবগুলো বিষয়েই ছিল ছাত্র লীগের সরব উপস্থিতি। ৬ জানুয়ারী আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নেয়ার দিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল খুলনা বিএল কলেজে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ। তারা মতা নেয়ার আগের দিনই কলেজের জোহা হলটি দখল করতে গেলে এ সংঘর্ষ বাধে। এতে বন্ধ করে দিতে হয় প্রতিষ্ঠানটি। ৯ জানুয়ারী রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দুগ্র“পের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কমপে ১০ জন আহত হন। একই সময় খুলনা মেডিকেল কলেজেও ছাত্র লীগের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের সংঘর্ষ হয়। এতে মেডিকেল কলেজটি বন্ধ করে দিতে হয়। এতেও আহত হয় ১০জন। কমপক্ষে ১৩টি কও ভাংচুর করা হয়। ১৬ জানুয়ারী জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখল নিয়ে ছাত্রলীগের দুটি গ্র“পের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হয়। ১৭ জানুয়ারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পরে মধ্যে সংঘর্ষে ২৫ জন আহত হয়। কয়েক দফা সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ২৫ জন আহত হয়। ১৭ জানুয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তাঁর বাসভবন কয়েক ঘন্টার জন্য অবরোধ করে। আগের রাতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফটক ও ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর রেশ দেশের প্রতিটি শিাঙ্গনে গিয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের সহিংসতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, খুলনা সরকারী বিএল কলেজ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় বন্ধ করে দিতে হয়। এসময় ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা ব্যাপক টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হলদখল, আধিপত্য বিস্তারে জড়িয়ে পড়ে।
অবশষে ৩ এপ্রিল জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের ছাত্রলীগের দুটি গ্র“পের রক্তায়ী সংঘর্ষ বাধে। পরদিন প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পরদিনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু-গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেন, আমার কষ্ট হয়, যখন পত্রিকার পাতা খুলে দেখি ছাত্রলীগের কর্মীরা টেন্ডার-চাঁদাবাজের সাথে জড়িত। প্রধানমন্ত্রীর এসব হুশিয়ারী ছাত্রলীগের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির বিঘœ করার কাজে বাধা হতে পারেনি। দেশের ৬৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতন:
১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ২০০৯ পর্যন্ত ১১ মাসে সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে হয়রানি হামলা এবং মামলার শিকার হয়েছেন। এসময়কালে ৩ জন সাংবাদিক নিহত, ৭০ জন সাংবাদিক আহত, ৬৮ জন হুমকি এবং ৩৬ জন লাঞ্ছনার সম্মুখিন হয়েছেন। এসময় ১৫ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে । তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে র্যাব-১০-এর কর্মকর্তারা নির্যাতন চালিয়ে নিউ এজ পত্রিকার সাংবাদিক এফ এম মাসুমকে পিটিয়ে জখম করে। গত ২১ আগস্ট গলাচিপায় নদী দখল করে মার্কেট করা সংক্রান্ত প্রতিবেদন দুটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়। এতে স্থানীয় সাংসদের অনুসারীরা ওই প্রতিবেদককে নানাভাবে হয়রানি করে। প্রতিবেদকের নামে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, প্রতারণার তিনটি মামলা দেয়া হয়। পরে পুলিশও তার বাড়িতে হানা দিয়ে পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। ওই প্রতিবেদক সপরিবারে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। সেখানে আরও কয়েকজন সাংবাদিককে এমপির অনুসারীরা লাঞ্ছিত করে। পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিতে অপারগতা জানায়। এ ঘটনার আগে চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও রাজশাহীতে কয়েকজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। সাংসদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করায় চুয়াডাঙ্গায় তার অনুসারীরা এক সাংবাদিকের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। ওই সাংবাদিকও পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। যশোরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা সমাবেশ করে সাংবাদিক পেটানোর ঘোষণাও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সর্বশেষ আমার দেশ পত্রিকার সিনিয়র একজন প্রতিবেদকও সরকারী দলের সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন।
পোষাকশিল্পে অস্থিরতা:
পুরো বছর জুড়েই পোশাক শিল্পের নৈরাজ্যকর পরিস্খিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। বেতন বৃদ্ধি নয় বকেয়া বেতন ভাতার দাবীতেই শ্রমিকদের প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ কোরবানীকে সামনে রেখে অনেক মালিক পাওনা না দিয়ে গার্মেন্টস বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় মুন্নু ফেব্রিকস নামের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাঁধে। শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের জন্যই রাস্তায় নেমেছিলেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে গত ৩১ অক্টোবর টঙ্গীতে তৈরি পোষাক শিল্প প্রতিষ্ঠান ’নিপ্পন গার্মেন্টস’ ফ্যাক্টরি হঠাৎ করে বন্ধ ঘোষণা করায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। শ্রমিকদের দাবী তাদের তিন মাসের বকেয়া বেতন এবং ওভারটাইম ভাতার দাবিতে তাঁরা প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। যদিও মালিক পরে দাবী এক মাসের বকেয়া ছিল। পুলিশ প্রথমে আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের বাধা দেয়। পরে সংঘর্ষ বাধলে শ্রমিকদের ওপর গুলি ছুড়ে। পুলিশের গুলিতে চার জন শ্রমিক নিহত হয়। এছাড়াও শ্রমিক অসন্তোষের নামে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে শ’ শ’ কোটি টাকার পোশাক শিল্প কারখানা।
বিডিআর হত্যাকান্ডের অভিযোগপত্র দেয়া যায়নি:
সরকার মতা নেয়ার ১৯ দিনের মাথায় ২৫ ফেব্র“য়ারী পিলখানায় বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ করে। তারা পিলখানার ভেতরে দেশের ইতিহাসের স্মরণকালের হত্যাযজ্ঞ চালায়। ওই দিন সকাল ১০টায় বিদ্রোহ ও গোলাগুলি শুরু হয়। পিলখানা রাজধানী থেকেই বিচ্ছিন্ন একটি যুদ্ধেেত্র পরিণত হয়। এরপর প্রতিটি মূহুর্তেই দেশবাসীর উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে কাটে। পরদিনও পিলখানার ভেতরে চলে বিডিআর সদস্যদের তান্ডব। তারা হত্যা, লুটপাট, নারী নির্যাতনসহ হেন কাজ নেই যে করেনি। সেনাবাহিনী পুরো পিলখানাকেই ট্যাংক, সাজোয়া গাড়ি গিয়ে ঘিরে রাখে। এসময় সরকারের সঙ্গে বিডিআর সদস্যদের দফায় দফায় আপসরক্ষার চেষ্টা চলে। এসময় প্রধানমন্ত্রী বিডিআর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে আত্মসমর্পন করতে বলেন। ৩৩ ঘন্টার রুদ্ধশাস অপেক্ষার পর বিডিআর সদস্যরা পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণ করে। দুই দিনের এ বিদ্রোহের সময়কালে এক ভয়াবহ সময় অতিক্রান্ত করে দেশবাসী। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী বিডিআরের অন্য ক্যাম্পগুলোতেও। শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর আশংকাই সত্যি হয়। বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ ৬৭টি লাশ উদ্ধার করা হয় পিলখানার মৃত্যুপুরী থেকে। এঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এত সেনা কর্মকর্তা নিহত হননি। বিডিআর সদস্যদের এ ঘৃণ্য কর্মকান্ডে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীও সাধারণ ক্ষমা প্রত্যাহার করেন।
এরপর দেশব্যাপী বিডিআর সদস্যদের ধড়পাকড় শুরু হয়। শুরু হয় তদন্ত। কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকেও গ্রেফতার করা হয়। তাদের ওপর চলে মধ্যযুগীয় নির্যাতন। অনেকেই আত্মহত্যা করেন। এদের বেআইনী টিএফআই সেলে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হচ্ছে। বিচারের আগেই বিদ্রোহের সময়কালের মৃত্যুর সঙ্গে পরের মৃত্যু প্রায় সমান হয়ে গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশী বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিডিআর সদস্যদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আহবানও জানায়। তারা দায়ীদের স্বচ্ছ বিচারের আহবান জানায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসেবে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ৪৮ জনবিডিআর সদস্য মারা গেছেন। তাদের আত্মীয় স্বজনরা মৃত্যূর জন্য নির্যাতনকে দায়ী করে। এখন পর্যন্ত দুটি মৃত্যূকে হত্যা মামলায় রুপান্তর করে তদন্ত করা হয়েছে। তবে কোন তদন্তেই অগ্রগতি নেই। ওদিকে বিডিআর সদস্যদের বারবার রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আইন কানুনেরও তোয়াক্কা করা হচ্ছেনা। বিচারের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। বিডিআর ঘটনার পর ১০ মাস অতিক্রম হলেও সরকার এ হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দিতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অভিযোগপত্র দেয়া হবে বলে ঘোষণা দিলেও পরে তা পিছিয়ে ২৭ জানুয়ারী নির্ধারন করা হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

