রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষনা করা উচিত যাতে কোন ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে কেউ তাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পারে-মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
কাজী সায়েমুজ্জামান: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক ডাকসুর সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষনা করা উচিত যাতে কোন ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে কেউ তাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পারে। তাহলে সাধারণ ছাত্ররাই রাজনীতি ঠিক করে দেবে। ছাত্রদের রাজনীতি করতে দেয়া উচিত, দলবাজি নয়। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির নামে যা চলছে তার সঙ্গে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই। রাজনীতি না থাকার ফলে শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অপকর্ম গ্রাস করে ফেলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের হাতে ছাত্র খুন হওয়ার পর নেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি একথা বলেন। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক সময়ের তুখোড় এক ছাত্রনেতা এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। তিনি বর্তমান অধ:পতিত ছাত্ররাজনীতির কারণ ও ছাত্রনেতা নামধারীদের অপকর্ম, দ্বন্দ্ব এবং তার জের ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সৃষ্ট নৈরাজ্য ও তার সমাধানের উপায় নিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। নিচে তার পুরো সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হলো---
কাজী সায়েমুজ্জামান: সমকালীন ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
মুজাহিদুল ইসলাম: বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির নামে যা হচ্ছে তার সঙ্গে রাজনীতির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। এটা প্রধানত দলবাজী। রাজনীতির একটা মৌলিক কথা হলো- আদর্শ, নীতি, দেশপ্রেম এবং দেশ ও জনগনের প্রতি ভালোবাসা। এ কাজগুলো এখন ছাত্র সমাজের মধ্যে সামন্যই পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতি কমে যাওয়ার ফলেই শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, চাাঁদাবাজি ইত্যাদি অপকর্ম গ্রাস করে ফেলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে হাতেগোনা অল্প কিছু ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী মাস্তানদের হাতে। সাধারন ছাত্ররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বা শিক্ষা বহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেনা। বহু বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রসংগঠনগুলো নির্বাচন হয়না। আর নির্বাচন না হওয়ার ফলে সাধারণ ছাত্ররা কোন ধরনের নেতৃত্ব পছন্দ করেন তা প্রকাশ করারও সুযোগ পাচ্ছেননা। যার ফলে পেশী শক্তি ও অস্ত্র শক্তির দাপট দেখিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু দুস্কৃতিকারী ছাত্রদের নেতৃত্বের দাবী করে পরিস্থিতি ক্রমাগত ভয়াবহ করে তুলছে।
সায়েম: কেন এমন পরিস্থিতি তৈরী হলো? বর্তমানে কি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাবোধের শুন্যতা তৈরী হয়েছে?
মুজাহিদুল ইসলাম: সাধারণ ছাত্ররা ব্যপক সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে সৎ দেশপ্রেমিক বিদ্যুৎসাহী দেশ দুনিয়া সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করেন। তাদের রাজনৈতিক চেতনাও রয়েছে। সাধারণ ছাত্রদের এ প্রতিভা প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি রাজনীতির রুগ্ন অবস্থারই প্রতিফলন । বামপন্থী দলগুলো বাদ দিলে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা তাদের দলীয় কর্মকান্ড থেকে রাজনীতিকে প্রায় বাদ দিয়ে ফেলেছে বলা যায়। সেসব দলেও প্রধান কাজ হচ্ছে নেতা নেত্রীর ভজন ও বন্দনা। কিম্বা দলের মধ্যেও উপদলীয় বিভিন্ন গ্র“পের পক্ষে ক্যাডার বহিনী সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করা। বিভিন্ন ভাইয়ের নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় রাখার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ছাত্রদের মধ্যে নিজস্ব বাহিনী তৈরী করা হয়েছে। অন্যদিকে কেবল রাজনৈতিক দলের অশুভ তৎপরতার অস্ত্র হিসেবেই তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সে কারনেই সকল পরিস্থিতি রুগ্ন হয়ে পড়ছে। এটুকুই শুধু নয়, এসব ক্যাডাররা দেখতে পাচ্ছে তাদের বড় ভাইরা লাখপতি থেকে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন। একটি বাড়ির মালিক থেকে রাতারাতি দশ বিশটি বাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাকে ওপরে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছি কিন্তু আমাদের ভাগ কোথায়? এভাবে তারাও লুটপাটের ভাগবাটোয়ারার অংশীদার হওয়ার সংস্কৃতিতে পড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত এটা কেবল বড় ভাইদের কাছ থেকে উচ্ছিষ্ঠ খাওয়ার ব্যাপার নয়, বড়বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ উপার্জনের স্থান হিসেবে তৈরী করে নিয়েছে। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ভর্তি বাণিজ্য, আসন বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, রাস্তা থেকে মানুষ তুলে এনে জিম্মী করে মুক্তিপন আদায়ের মতো অপরাধ পরিচালনা করছে। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কেবল বড়ভাইদের মধ্যকার দ্বন্দ্বই প্রবেশ পেয়েছে তাই নয়, সেখানেও একটি অর্থনৈতিক লুটপাটের একটি ব্যবস্থার কারণে লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়েও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরী হচ্ছে। আমরা দেখতে পাই এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায় প্রধানত দুটি ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগ ও ছাত্রদলের ভেতর। আমার কথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো- এটা শুধু দুটি দলের কোন্দল হিসেবেই প্রকাশিত হয়না একটি দলের ভেতরেও দ্বন্দ্ব হয়। দলের মধ্যে কোন রাজনীতি বা আদর্শ থাকলে এটা সম্ভব হতোনা। স্বার্থ আর লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে পারস্পরিক মতবিরোধ থেকেই এটা হয়।
সায়েম: ছাত্ররাজনীতির বর্তমান চালচিত্রের ঐতিহাসিক পটভূমি কি?
মুজাহিদুল ইসলাম: দুটো পটভূমি বলা উচিত। প্রথমত বড় অপরাধ করা হয়েছিল যখন জেনারেল জিয়া রাজনৈতিক দলবিধি পিপিআর প্রচলন করলেন। এতে সকল ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলোকে কোন এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার নিয়ম চালু করা হয়। তার যুক্তি ছিল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে তাদের কাজ কর্মের দায় কেউ নেবেনা। ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজকর্মকে দায়বদ্ধ করার জন্য কোন রাজনৈতিকদলের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই যখন অধপতিত হয়ে গেলো তখন সেই অধপতনের প্রভাবটা গিয়ে বড় করে ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর পড়লো। রাজনীতি থেকেই রুগ্নতা ছাত্রসংগঠনের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো বাংলাদেশ যৌথ স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্র“তি নিয়ে সমাজতন্ত্রের অঙ্গিকার ধারন করে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিলো। সেখান থেকে দেশকে উল্টো পথে নিয়ে আসা হয়। আর সমাজতন্ত্রের বদলে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি চালু করা হয়। এ নীতিটা এমনই যেখানে ব্যক্তি স্বার্থটাই প্রাধান্য পায়। যৌথ স্বার্থ রা করা হয়না। অর্থনীতিতে এ মতবাদ নিয়ে আসা হয় যেখানে চিন্তা করা হয় যদি কিছু লোকের হাতে অর্থ কেন্দ্রীভূত করতে পারি, সেই অর্থ চুইয়ে পড়তে পড়তে একদিন না একদিন গরীবের কাছে যাবে। সুতরাং রাতারাতি কোটিপতি হওয়াটাকেই একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়। আর তার সুযোগ নিয়েই দেশে শুরু হয়ে যায় ব্যাপক লুটপাটের অর্থনীতির প্রচলন। এ লুটপাটের অর্থনীতির ধারার প্রতিফলন রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দেখতে পাই। কেননা রাজনীতি হলো অর্থনীতিরই ঘনীভূত প্রকাশ। এজন্য অর্থনীতি যদি লুটটপাটের ধারায় গড়ে ওঠে তবে রাজনীতিও লুটপাটের ধারায় গড়ে ওঠবে। এটাই জাতীয় রাজনীতি ছাপিয়ে ছাত্র সমাজে বিশেষ করে মাস্তান বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
সায়েম: জিয়াউর রহমানের শাসনের আগেই তো ছাত্রদের মধ্যে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছিল।
মুজাহিদুল ইসলাম: আমি নিজেই এর প্রথম দিকের কয়েকটি হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী । এর মধ্যে অন্যতম ছিল সেভেন মার্ডার। মহসিন হলে তখন সেটা সংঘটিত হয়েছিল। আমি তখন ডাকসুর ভিপি ছিলাম। ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে ব্রাশফায়ার করে ওই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। এটা ঠিক সেভেন মার্ডারের ভেতর দিয়ে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা ছিল ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ দলাদলির পরিণতি। কিন্তু এবারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আভ্যন্তরীণ দলাদলী বা রাজনৈতিক আদর্শ জড়িত নয়। এগুলো সম্পূর্ণভাবে ভর্তি বাণিজ্য, আসন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের কারণে ঘটছে। সম্প্রতি এফ রহমান হলের হত্যাকান্ডটিও সিট দখল ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। সচিবালয়ের সামনে টেন্ডারবাজি নিয়ে ছাত্রনেতাদের দুই গ্র“পের ফাইং কিকের ছবিও আমরা দেখতে পেয়েছি। এসব এখনো অব্যাহত রয়েছে। অথচ একবছরেও এটা সরকার বন্ধ করতে পারেনি। এটা সরকারের বড় রকমের দূর্বলতা।
সায়েম: কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এটি স্বাধীনতার পর ওই ক্যাম্পাসেই ৭৩তম হত্যা। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
মুজাহিদুল ইসলাম: এটা খুবই দুখ:জনক ও মর্মান্তিক। শুধু তা নয় এটা বিপজ্জনক ও বটে। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রগতিশীল আন্দোলনে একটি অবদান রয়েছে। তাকে আমি জানি। কিন্তু সর্বশেষ হত্যাকান্ডটি নিয়ে তিনি মন্তব্য করলেন- এটা কোন ব্যাপার নয়। এ ধরনের মন্তব্য দু:খজনক। তার নিজের সন্তান হলে তার সন্তানের ব্যাপারে এ ধরনের মন্তব্য মায়ের কি অনুভূতি হতে পারে তা বুঝতে পারতেন। এটা আমাকে এর আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’ মনে করিয়ে দিয়েছে। এধরনের কথাবার্তা স্বজনদের অধিকতর দু:খ দেয়। এ ঘটনার পরপরই সরকারকে দৃঢ়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে কারা কারা জড়িত তা বের করা উচিত ছিল। কারা অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে তা সবাই জানে। ছাত্রনামধারী যে সন্ত্রাসীই এজন্য দোষী সাব্যস্থ হবে সে যে পর্যায়েরই হোকনা কেন তার বিচার করতে হবে। তবে তা সরকার করেনি। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে বিএনপি জামায়াতের লোকজন দলে ঢুকে দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এসব কাজ করছে। এটা সত্য ধরে নিলে বলবো যারা এদের আটকাতে পারেনা তাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়া উচিত নয়।
সায়েম: একটি নির্বাচিত সরকারের সময়ে এ ধরনের হওয়ারতো কথা ছিলনা। কেন ঘটছে?
মুজাহিদুল ইসলাম: এটাতো হবেই। এটাইতো স্বাভাবিক। তেতুল গাছে আম কোনদিন ফলবেনা। বর্তমান রাজনীতির যে ধারা চলছে তাতে কেউ চাইলেও এসব বন্ধ করতে পারবেনা। বিকল্প পথ আমি প্রধানমন্ত্রীকেও বলেছি। আমি যখন ডাকসুর ভিপি ছিলমা আপনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। আমরা তখন ছাত্রদের দল করে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম সেখানে গিয়ে নিররতা দূর করো। এখন আপনারা আপনাদের ক্যাডারদেরকে নিররতা দূর করার জন্য পাঠাচ্ছেননা কেন? ছাত্রলীগ যদি প্রতিযোগীতামুলকভাবে সারা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রদের নিররতার বিরুদ্ধে নামিয়ে দেয় তাহলে দুই বছরেই নিররতা দূর করতে পারবো। এধরনের দশটি কাজ তারা করতে পারে। আমার সময়ে ছাত্ররা মাথায় করে ইট নিয়ে এই এফ রহমান হলও তৈরী করেছিল। সেই হলটি আজ এরকম ট্রাজেডির শিকার হলো।
সায়েম: এ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির শিকার হত্যাগুলোর বিচার হয়নি বা হলেও পরবর্তীতে অপরাধিরা ছাড়া পেয়ে গেছে বলেই কি হত্যার মিছিলে নাম বেড়ে যাচ্ছে?
মুজাহিদুল ইসলাম: প্রধান কারণ হলো সমাজ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পচে গেছে। বিচার হওয়া উচিত ছিল। বিচার হলেও এটা ঘটতো। কারণ যে সিস্টেম রোগের জন্ম দেয় তা বহাল থাকলে কোন ওষুধে কাজ হবেনা। সমাজ বিপ্লব সংঘটিত না করতে পারলে হবেনা।
সায়েম: শিক্ষার্থী অনুপাতে আসন কম থাকার কারণেই এ ধরনের ঘটনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরী হয়েছে কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম: হা এটাও একটা কারণ। তবে আসন বেশি থাকলেও ওরা আধিপত্য বিস্তারের ভিন্ন পথ খুঁজে নেবে।
সায়েম: আপনাদের সময়কালের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে বর্তমানের ছাত্র রাজনীতির কি ধরনের পার্থক্য তৈরী হয়েছে?
মুজাহিদুল ইসলাম: পার্থক্যটা হলো-তখন রাজনীতি ছিল এখন রাজনীতি নেই। এখন যা আছে তা হলো দলবাজি আর চাঁদাবাজি। ছাত্র রাজনীতির জন্য নয়, ছাত্ররাজনীতি না থাকার কারণেই বর্তমানে এ অবস্থা তৈরী হয়েছে। আমার শক্ত কথা হলো এখন যা চলছে এর নাম রাজনীতি নয়। সঠিক রাজনীতি নিয়ে আসা হলে এসব সমস্যা থাকবেনা। আর ছাত্রসংসদগুলোর নির্বাচন যথা সময়ে করতে হবে। এটা কাস পরীক্ষার মতোই কোন অজুহাতে বন্ধ করা যাবেনা। এর মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা হবে। ম্যাগাজিন বের হবে। নির্বাচন দিতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পদত্যাগ করতে হবে।
মানুষকে বুঝাতে হবে আমাদের সময় ছাত্র রাজনীতি ছিল। আমরা লেখা পড়া করতাম। আমরা কাস করতাম ফাকে আইয়ুবের বিরুদ্ধে মিছিলও করতাম। আমাদের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দুটি ধারা ছিলো। বর্তমানে জাতীয়তাবাদী ধারার বিপরীতে দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক ছাত্রসংগঠন রয়েছে। বামপন্থীরা দূর্বল হয়ে গেছে। এ ধারা জোরদার থাকলে ছাত্রলীগকে ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামানো সম্ভব। আর ছাত্রদলের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা হলে মাস্তানি ও খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতায় দুপক্ষই লিপ্ত হবে। এটাই হচ্ছে এখন।
সায়েম: ষাটের দশকের রাজনীতি কেমন ছিল? তখন কি সরকারী পেটোয়া বাহিনী ছিলনা?
মুজাহিদুল ইসলাম: আমার ছাত্ররাজনীতিও ষাটের দশকের মাঝামাঝি শুরু হয়েছিল। আমরা শিক্ষার অবস্থান থেকে শুরু করে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গেছি। ওই সময় এনএসএফ ও পাচপাত্তু নামে সরকারের পেটোয়া বাহিনী তৈরী করা হয়েছিল। তবে তারাও বর্তমান ছাত্রনেতাদের সামনে লিলিপুট। এখনকার ছাত্রনেতাদের নামের বাহারের সামনেইতো তারা টিকবেনা। বর্তমানে ছাত্রনেতাদের নামের আগে ধর্ষনের সেঞ্চুরী, গালকাটা, মুরগী চোর বিভিন্ন বিশেষন যুক্ত হয়েছে। এখনকার পরিস্থিতিতো খুবই ভয়াবহ। তখন তারা হকস্টিক ব্যবহার করতো। এখন আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
সায়েম: বর্তমান গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ আরপিও অনুসারে ছাত্র সংগঠনগুলো আর মুল দলের অংগ সংগঠন নয়। তারা এখন সহযোগী সংগঠন। মনে করা হয়েছিল এর মাধ্যমে ছাত্র সংগঠন অনেকাংশে দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারবে। এরপরেও এধরনের ঘটনা নিবৃত্ত করা যাচ্ছেনা কেন?
মুজাহিদুল ইসলাম: দুটোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য সামান্য। কসমেটিক পার্থক্য রয়েছে। একটা হলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। আর একটি হলো- একটু অপ্রত্যভাবে নিয়ন্ত্রণ। এতে বিপদ আরেকটু বাড়তে পারে। সহযোগী সংগঠনওতো কোন না কোন ভাবে মুল সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকে। আইনের মুল স্পিরিট রা করতে হলে আওয়ামী লীগকে ঘোষণা করতে হবে- আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের ব্যানার নিয়ে কেউ আসতে পারবেনা। বা কোন গেট তৈরী করতে পারবেনা। শুধু আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নয়, সব দলের েেত্রই এটা করা উচিত। ছাত্রদেরকে তাদের মতো রাজনীতি করতে দেয়া উচিত। দলবাজি করতে দেয়া উচিত নয়। এখন সহযোগী স্টাটস দেখিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো অপকর্ম ঠিকই করতে পারছে। সরকারের বড় কাজ হবে হাত গুটিয়ে নেয়া। সাধারণ ছাত্ররাই এ রাজনীতি ঠিক করে দেবে। রাজনীতির জোয়ারে টেন্ডারবাজিসহ সব কিছু ভেসে যাবে।
সায়েম: ছাত্র রাজনীতির এ অধ:পতন থেকে বের হওয়ার উপায় কি?
মুজাহিদুল ইসলাম: এজন্য আশু কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। চূড়ান্তভাবে এখান থেকে বের হতে হলে রাজনীতিকেই সুস্থধারায় আনতে হবে। আর রাজনীতিকে সুস্থধারায় তখনই আনা সম্ভব হবে যখন অর্থনীতিকে লুটপাটের ধারা থেকে বন্ধ করা যায়। প্রধান এজেন্ডা হলো একটা সমাজ বিপ্লব সংঘটিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও জাতীয়তাবাদের ধারায় দেশকে পরিচালনা করতে পারলেই এটা সম্ভব হবে।
সায়েম: ছাত্র রাজনীতির এ অধ:পতনের সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতির কোন সম্পর্ক রয়েছে কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম: প্রত্যেকটাই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। উৎকট ও কুৎসিৎ দলবাজি তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সায়েম: আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে অন্যান্য দেশের ছাত্র রাজনীতির কোন পার্থক্য রয়েছে কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম: অন্যান্য দেশে ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়মিত হচ্ছে। প্রতিনিধির মাধ্যমে ছাত্ররা তাদের মনের আকাংখাগুলো প্রকাশ করতে পারছে। তাদের কর্মকান্ড শুধু শিক্ষা কেন্দ্রীক নয়। তারা জাতীয় রাজনীতি নিয়েও কথা বলছে।
সায়েম: বর্তমানে ছাত্ররাজনীতিতে বয়স্করা নেতৃত্ব পাচ্ছেন। এ প্রবণতাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মুজাহিদুল ইসলাম: এটা কিছু দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ছাত্র ইউনিয়নের কথা বলতে পারি এ দলে সবাই নিয়মিত ছাত্র। এখানে আদু ভাই নেই। অন্য দলে বিয়ে করে বাড়ি তৈরী করার পরও নেতারা ভাবে এখন ছাত্র সংগঠনে পদ ধরে না রাখতে পারলে তো এসব রক্ষা করা যাবেনা। বয়স্ক ছাত্র নেতারা দলে পেশী শক্তি সরবরাহ করতে পারে। এজন্যই দল ছাত্রদের পেশীশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতেই বয়স্কদের নেতৃত্বে বসায়। আর পদ না দিলেওতো তারা ফোর ক্রস করতে পারে। অন্য দলে যাতে যেতে না পারে এ কারণেও বয়স্করা পদ পাচ্ছেন।
সায়েম: আপনাকে ধন্যবাদ।
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।