হুমকিদাতা নূরুল কবীরকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলা ও লেখালেখি বন্ধ করতে বলেছে। অন্যথায় তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়রি (নম্বর ১১৭৮/১০) করা হলেও পুলিশ কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
সরকারের এ নীরবতার অর্থ কি আমরা জানি। নূরুল কবির অন্যায় অসত্য আর অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি সোচ্চার কন্ঠ। এ কণ্ঠকে আগেও স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই সময় দেশে কোন গণতান্ত্রিক সরকার ছিলনা। এবার দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। একথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একমাত্র নূরুল কবিরই গণতন্ত্রের পক্ষে তার ধারালো যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। এজন্য তাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে অপমানিতও হতে হয়েছিল।
নূরুল কবির আমাকে জানিয়েছিলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে একবার গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ডেকে নিয়ে যায়। এই অধমকেও সাভারে নবম পদাতিক ডিভিশনে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কবীর ভাইর সামনে একজন কর্ণেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা আঙ্গুল তুলে কথা বলতে শুরু করে। নূরুল কবির তখন বলেছিলেন, আঙ্গুল নামিয়ে কথা বলুন। আপানদের আঙ্গুল তোলার অধিকার কে দিয়েছে? কেউ দেয়নি। এদেশের মানুষ একজনকেই আঙ্গুল তুলে কথা বলার অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু তিনি ওই আঙ্গুলের অপব্যবহার করেছিলেন। আর পরিণতিও আপনি আমি সবাই জানি। তার এহেন বক্তব্যে ওই কর্মকর্তা থ মেরে যান। আঙ্গুল নামিয়ে ফেলেন। এভাবেই চাপ, ঞুমমি, ধমক আর কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশের একজনই কঠিন কথা বলতে পারেন। তিনি নূরুল কবির।
এর পরে ঘটনা আমরা জানি। তার গাড়ির উপর হামলা চলানো হয়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আমাদের প্রিয় নূরুল কবির। তিনি আলো হাতে নিয়ে অন্য সম্পাদকদের মতো সেনাসদরে গিয়ে জেনারেলদের সঙ্গে নাশতা করেননি। তাদের দেয়া ব্রিফকেস হাতে নেননি। তাদের দেয়া একগাদা কাগজও পত্রিকায় ছাপাননি। তবে দূর্ভাগ্যে বিষয় যে গণতন্ত্রের জন্য তিনি অনেকের অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছিলেন, নিজের জীবন বিপন্ন হয়েছিল, গত নির্বাচন অনুষ্ঠানে যার সামান্য হলেও ভূমিকার কথা সবাই স্বীকার করেন, আজ তাকেই প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আর নির্বাচিত সরকার নির্বিকার।
নূরুল কবিরের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ‘উই হেট নূরুল কবির’ গ্র“প খোলা হয়েছে। দণি এশিয়ার একজন স্বনামধন্য সম্পাদকের নামে এ ধরনের গ্র“প খুলে তাতে বিশেষ পোশাক পরিহিত লোকজন সদস্য হয়ে রয়েছেন। এটা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। বলা হয়, গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ কতটুকু অধিকার বা স্বাধীনতা ভোগ করে তা প্রকাশ পায় সাংবাদিকরা কতটুকু মতপ্রকাশের অধিকার ভোগ করেন তার ওপর। আমরা কি বর্বর সমাজে বাস করছি যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবেনা??
প্রতিবাদ, ক্ষোভ, নিন্দা ও উদ্বেগ:
দৈনিক নিউ এজ ও সাপ্তাহিক বুধবারের সম্পাদক নূরুল কবীরকে প্রাণনাশের হুমকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১৫টি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদক। আজ মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী প্রেরিত বিবৃতিতে সই করেন দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সম্পাদক মাহবুবুল আলম, ইত্তেফাক সম্পাদক রাহাত খান, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ার, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, জনকন্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, কালের কন্ঠ সম্পাদক আবেদ খান, যুগান্তর সম্পাদক সালমা ইসলাম, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, সংবাদ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মনিরুজ্জামান, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, আমাদের সময় সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান, যায়যায়দিন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী রোকনউদ্দিন আহমেদ ও মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
বিবৃতিতে তারা বলেছেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ল্য করছি, নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবিরকে দফায় দফায় প্রাণনাশের হুমকী দেয়া হচ্ছে। একই মোবাইল থেকে বারবার প্রাণনাশের হুমকি দেয়ায় নূরুল কবীর ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়রি করেছেন। বর্তমান যুগে মোবাইল ট্র্যাকিং করে অপরাধীদের অবস্থান সনাক্ত ও পাকড়াও করা দুরুহ নয়। কিন্তু পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর কোন পদপে না নেয়ায় সকল মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। একজন সম্পাদককে হত্যার হুমকি নাগরিকের বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের প্রতি হুমকী ছাড়া কিছুই নয়। এটা দেশে গণতন্ত্র বিকাশেরও অন্তরায়। সরকার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত কার্যকর পদপে নেবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নূরুল কবীরকে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মাসুম পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি মুঠোফোনে (০১৮১৬৯০৪৩৫৯) নূরুল কবীরকে হত্যার হুমকি দেয়। এ ব্যাপারে নূরুল কবীর তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (নম্বর ১১৭৮/১০) করেছেন। কিন্তু পুলিশ এখন পর্যন্ত হুমকিদাতাকে গ্রেপ্তার বা শনাক্ত করতে পারেনি।
এ ঘটনায় ১ মার্চ এশিয়া মিডিয়া ফোরাম নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতি দিয়েছে। ফেরাামের কোর গ্র“পের সাধারণ সম্পাদক সাফকাত মুনীর সারিত এ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রমনা সাংবাদিক দণি এশিয়ার অন্যতম গণতন্ত্রবাহী পত্রিকা ঢাকা ভিত্তিক নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির সন্ত্রাস ও নাশকতার বিরুদ্ধে সাহসী সাংবাদিকতাসূলভ বক্তব্যের কারণে চারদিনের মধ্যেই দুইবার প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। এতে এশিয়া মিডিয়া ফোরাম গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বিবৃতিতে বলা হয়, নূরুল কবির অত্র অঞ্চলে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স উভয় মাধ্যমে তার সাংবাদিকতাসূলভ কর্মকান্ডের জন্য পরিচিত। তিনি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সরকারী বেসরকারী বিষয় যা গণতন্ত্র ঘাটতির জন্য দায়ী, অনুন্নয়ন এবং দেশে বিদেশে লাখো মানুষের ওপর আরোপিত অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নূরুল কবিরকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া মানে সাংবাদিকতার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর হুমকির শামিল। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
ফোরাম অবিলম্বে প্রাণনাশের হুমকিদাতাকে বের করে বিচারের আওতায় আনার জন্য বাংলাদেশের সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে। তারা বলেছে, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ল্য করছি, বাংলাদেশের সরকার গত বছরের মার্চ মাসে নূরুল কবীরের গাড়ির ওপর হামলাকারী দুস্কৃতকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে পারেনি।
এছাড়াও দেশের ২০ জন বিশিষ্ট নাগরিক আরেকটি বিবৃতিতে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, নূরুল কবিরের জীবনের উপর হুমকি এটা প্রথম নয়। গত বছরও একদল দুস্কৃতিকারী তার গাড়ি ধাওয়া করে তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। ধারাবাহিকভাবে একজন সৎ ও প্রতিবাদী সাংবাদিকের কন্ঠ রুদ্ধ করার এ ষড়যন্ত্রে আমরা তীব্রভাবে ুব্ধ ও আশংকিত বোধ করছি। আমরা মনে করি এ ঘটনার পেছনে কোন মহলের পরিকল্পনা রয়েছে যা উদঘাটন করা জরুরী। নূরুল কবিরের উপর হুমকি পুরো সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা তথা দেশের গণতন্ত্রের উপর হুমকি। বিবৃতিদাতারা হলেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. নাসমীন আক্তার, বদরুদ্দীন উমর, হাসান আজিজুল হক, নাসরীন আক্তার, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আহমেদ কামাল, আকমল হোসেন, আনু মুহাম্মদ, ফাহামিদুল হক, পিয়াস করিম, রেহনুমা আহমেদ, জোনায়েদ সাকী, রায়হান রাইন, জাহিদ আকতার, হাসান আল যা‘য়েদ ও আহমেদ জাবেদ রনি।
এছাড়াও জাতীয় প্রেসকাব এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতীয় প্রেসকাব সভাপতি শওকত মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ বিবৃতিতে বলেন, সম্প্রতি সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নিউএজ সম্পাদককে একাধিকবার হুমকি দেয়া হয়েছে। কে বা কারা এই হুমকি দিচ্ছে পুলিশ তা উদঘাটন করতে সম হয়নি কিংবা এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছে। সরকারের ভূমিকা নিয়েও আমাদের সংশয় রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সংবাদপত্র ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ।
এছাড়াও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজে সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, মহাসচিব এম এ আজিজ এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ডিইউজে সভাপতি আবদুস শহিদ সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ বাকের হোসাইন এ বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও এেকইভাবে তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। এ ধরনের অপতৎপরতাকে তারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে অন্তরায় অভিহিত করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
বাংলদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেন, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের আমলেও সাংবাদিকতা ও সম্পাদকেরাও সন্ত্রাসী মাফিয়াদের আক্রমনের ল্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার নূরুল কবীরকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছিল। সেনা মদদে পরিচালিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও নিউ এজ সম্পাদককে নানাভাবে হয়রানী করা হয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত এসবের বিরুদ্ধে সরকার থেকে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় স্পষ্টবাদীতা ও সত্যভাষনের জন্য এখন নূরুল কবীরের জীবনের উপর হুমকি দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১০ দুপুর ১:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



