চাণক্য' প্রাচীন ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম। এই বিজ্ঞ ও প্রতিভাধর ব্রাহ্মণের জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়, বর্তমান ইসলামাবাদের ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ও রাওয়ালপিন্ডির কিছু উত্তরপশ্চিমে। তক্ষশিলার কাছেই ছিল গান্ধার নগর ও পুস্কলাবতী, মানে বর্তমান পেশওয়ার। চণক-ঋষির ঔরসে মহামতি চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০- খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩ ) খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। চণক-ঋষির পুত্র বলেই তাঁর নাম হয় 'চাণক্য'। তাঁর জন্মগ্রাম 'চানকা' থেকে 'চাণক্য' নাম হয়েছে বলেও অনুমান করা হয়। বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। কারণ এ নামটিই দিয়েছিলেন তার বাবা মা। চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য'। কর্তব্যনিষ্ঠা ও কুটিলবুদ্ধি পরায়ণ বলে তিনি এ নামে অভিহিত। 'কুটিলা' গোত্রভুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর 'কৌটিল্য' নাম হয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা হিসেবে তিনি তাঁর কালজয়ী সংস্কৃত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রে’ কিভাবে একজন শাসককে আরো ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে তাঁর প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নত করার জন্য কাজ করতে হবে তা লিপিবদ্ধ করেন। নামে অর্থশাস্ত্র হলেও গ্রন্থটি মূলত শাসকের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতি বিষয়ক কৌশলের পরামর্শ। চাণক্য লিখেছিলেন ১৫ পর্বের রাষ্ট্রনীতি নিয়ে গ্রন্থ: অর্থশাস্ত্র। অনেকেই মনে করেন চাণক্যই অর্থনীতির জনক। তাকে ভারতীয় ম্যাকিয়াভিলিও বলা হয়।
সে সময়ে মগধে 'নন্দবংশ' নামে এক রাজবংশ ছিল। ঐ রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন ধনানন্দ। ধনানন্দের সৎভাই ছিলেন (পিতা মহাপদ্মের ঔরসে দাসী 'মুরা'র গর্ভজাত) চন্দ্রগুপ্ত। চন্দ্রগুপ্তর পুরো নাম চন্দ্রগুপ্ত মোরা। মোরা মানে ময়ূর। তা থেকে মৌর্য। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর পূর্বপুরুষেরা ছিল বিন্ধ্যপর্বতে। ময়ূর পালন করত। রাজা ধনানন্দ প্রজাদের কাছে প্রিয় ছিলেন না। পিতা মহাপদ্মের মৃত্যুর পর তিনি দাসীমাতা মুরা ও সৎভাই চন্দ্রগুপ্তকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেন। অপমানিত চন্দ্রগুপ্ত তার ভাই ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হন এবং জীবন বাঁচাতে জঙ্গলে গিয়ে নির্বাসিত জীবন-যাপন করতে থাকেন।
মহারাজ ধনানন্দের পিতৃশ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার জন্য একজন ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয়। ব্রাহ্মণ সংগ্রহের দায়িত্ব পড়ে মন্ত্রী শকটার উপর। তিনি চাণক্যকে মহারাজ ধনানন্দের পিতৃশ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার অনুরোধ জানান। সে অনুরোধ অনুযায়ী চাণক্য যথাসময়ে রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়ে পুরোহিতের আসন গ্রহণ করেন। চাণক্যের চেহারা খুব ভাল ছিল না। পুরোহিতের আসনে কদাকার ব্রাহ্মণ চাণক্যকে দেখে মহারাজ ধনানন্দ ভীষণ ক্রুদ্ধ হন এবং তাকে তিরস্কার করে সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। পণ্ডিত চাণক্য প্রথমে রুষ্ট না হয়ে মহারাজাকে হিতবাক্যে বুঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজা ধনানন্দ কোন প্রবোধ না মেনে অপর লোক দ্বারা চাণক্যকে যথেষ্ট অপমান করেন। চাণক্য ক্রুদ্ধ হয়ে সেখান থেকে চলে আসেন এবং এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করেন।
এদিকে তরুণ ও উচ্চাভিলাষী চন্দ্র গুপ্ত, যিনি নন্দ রাজার পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, তিনিও ষড়যন্ত্র করছিলেন সিংহাসন দখলের। কিন্তু তার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং জীবন বাঁচাতে তাকে পালাতে হয়। চন্দ্র গুপ্ত যখন বিন্ধানের জঙ্গলে পলাতক ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন তখন ঘটনাচক্রে চানক্যের সাথে তার সাক্ষাত্ হয়। চন্দ্রগুপ্ত তার সমস্ত কথা চাণক্যের কাছে খুলে বলেন এবং ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখলে চাণক্যের পরামর্শ ও সাহায্য কামনা করেন। চাণক্য ছিলেন প্রখর প্রতিভাধর কুটিলবুদ্ধি-সম্পন্ন পণ্ডিত। চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যকে তার গুরু, উপদেষ্টা ও মন্ত্রণাদাতা হিসেবে মেনে নেন। চাণক্যের সক্রিয় সহযোগিতায় চন্দ্রগুপ্ত ক্রমে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং গুরু চাণক্যের সুনিপুণ পরিকল্পনা অনুসারে ধনানন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন দখল করেন। যে পরিস্থিতিতে চন্দ্র গুপ্ত নন্দ বংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তা অত্যন্ত চমত্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে পঞ্চম শতাব্দীতে লিখিত একটি রাজনৈতিক নাটক 'মুদ্রা রাক্ষস'এ। এ নাটকের রচয়িতা বিশাখাদত্ত নামে এক প্রাচীন নাট্যকার। চন্দ্র গুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটলিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পারিণত করেন। পাটলিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। সিংহাসনে আরোহন করার পর মাতা 'মুরা'র নামানুসারে (নন্দবংশের পরিবর্তে) রাজবংশের নামকরণ করেন 'মৌর্যবংশ' এবং পণ্ডিত চাণক্যকে করেন তার রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্র গুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে সমগ্র রাজ্য জুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্র গুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে। আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুতে গ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে বিদ্রোহের সূচনা হয় এবং এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চন্দ্র গুপ্ত গ্রিক বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত করেন ও পাঞ্জাবকে নিজ শাসনাধীনে আনেন। পরে চন্দ্র গুপ্ত একে একে পশ্চিম ভারতের সকল রাজ্য বিজয় করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্রাজ্য দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্যে তিনি একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন চানক্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করে।
চন্দ্রগুপ্তের গুরু ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাণক্য বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। কিন্তু তিনি তা না করে একটি শ্মশানে কুড়েঘরে সন্ন্যাসীর মত জীবন-যাপন করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন 'দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।'
চাণক্যের অর্থবিষয়ক জ্ঞানের সংকলন হচ্ছে অর্থশাস্ত্র। এ শাস্ত্রে আছে শাসকের উদ্দেশ্যে পরামর্শ, প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবনমান উন্নতকরার কৌশল। চাণক্য তার অর্থশাস্ত্রে রাজাকে এভাবে পরামর্শ দিয়েছেন- 'যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।' 'সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের উপর। সে জন্য সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বার ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজকর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না-খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। পানির নিচের মাছের গতিবিধি বোঝা যেমন অসম্ভব, রাজকর্মচারীর তহবিল তসরুপ বোঝাও তেমনি অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজকর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।'
এই বিজ্ঞ ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। এ ধরণের একটি সংকলনের নাম 'চানক্য নীতি দর্পণ'। চানক্য তার নীতিকথায় বলেছেন,
"বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী - এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।"
"মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।"
"বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।"
"মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



