বন্ধু বিপুল রায়হানের (জহির রায়হানের ছেলে) সাথে তখন খেয়ে না খেয়ে লিট্ল ম্যাগ প্রকাশ করতাম। নব্য মৃদুগম্ফু আঁতেল হয়ে উঠবার আপ্রাণ অপচেষ্টা আর কী! সেই সূত্রে ৫২'র ভাষা আন্দোলন নিয়েও বেশ দু'একটা কিশোরোচিত সংখ্যা প্রকাশ করে ফেলেছি। এমনি এক দিনসন্ধিক্ষণে যখন রাজশাহী সেন্ট্রাল জেল থেকে ৫২'র খোদ ভাষা আন্দোলনের মাসটিতে কোন এক ছাত্রের তার বাবাকে লিখা চিঠিখানি কোন এক অলীক ঘটনাচক্রে আমাদের স্টোর রুমে খুঁজে পেলাম, আমার সেই কৈশোরোত্তীর্ণ মনটা ঠিক যেন অযাচিত ভাবে কোন এক গুপ্তধন কুড়িয়ে পাওয়ার রোমাঞ্চে শিহরিত হলো।
এর মাঝে ২১/২২ টি বছর কেটে গেছে। গভীর মমতায় এখনো আগলে রেখেছি দীর্ঘ ৫৬ বছর আগের উত্তাল ভাষা আন্দোলনের মাসে জেলে বসে তার বাবাকে লিখা মোঃ রাসিদউদ্দিন নামের সেই ছাত্রের জরাজীর্ণ চিঠিটি। চিঠির বক্তব্যে তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক অস্থিরতার আভাস আছে, আরো আছে তাঁর পরিবারের প্রতি উদ্বেগের কথা। জানিনা চিঠিটি ১৯৫২র ভাষা আন্দোলনের কোন এক দলিল হিসেবে তার ঐতিহাসিকতাকে কতটা ধারণ করেছে। জেলের চার দেয়ালে আবদ্ধ রাসিদউদ্দিন নামক সেই ছাত্রের সাথে কোন এক অজানা হৃদয়ের টান এখনো আমি অনুভব করে চলি। সেই টান থেকেই প্রায়োস্পষ্ট জরাজীর্ণ সেই চিঠিটির পাঠোদ্ধার করে এখানে তুলে ধরলাম আপনাদের জন্যঃ
Dear father, আমার সালাম গ্রহণ করিবেন। আপনার ১১.১.৫২ তাং চিঠি কয়েকদিন হলো পেয়েছি। সমস্ত সংবাদ জানিতে পারিলাম। তাজের বিবাহের কথা অনেক পূর্ব্বে জানিতে পেরেছি।
আমরা আমাদের মতামত সরকারের কাছে জানাইয়াছি- এখন পর্যন্ত কোন উত্তর পাই নাই। পূর্ব্বেকার জের এখনও চলছে। পড়াশুনা করবার ইচ্ছা আমার খুবই আছে। করতেও আমি চেষ্টা করছি- যত পড়াশুনা করা যায়। কিন্তু বলতে পারেন পরীক্ষা আমি কেন দিচ্ছি না? পরীক্ষা দেবার ইচ্ছা আমার আছে। একমাত্র অসুবিধা পরীক্ষা দেবার অধিকার নিয়ে। আমি ও আমার অনেক বন্ধু পরীক্ষা দেবার অধিকার চেয়েছিলুম। কিন্তু অধিকার পাওয়া গেল না। আপনার কথা মত আবার পরীক্ষা দেবার অধিকারের জন্য দুই একদিনের মধ্যেই petition করছি। বই পড়ছি অনেকই কিন্তু হজম করা যাচ্ছে না। অনেকদিন বন্দী অবস্থায় থাকলে এরূপ হয় নাকি।
বড় দুঃখের বিষয় আপনার চিঠির মধ্যে ছোট বোনদের কথা, বাড়ির ও আপনার শরীরের কথা কিছুই নাই। আমি জানতে পারলাম আপনার শরীর নাকি খুবই খারাপ। চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিয়ে জানাইবেন। দাদীর শরীরও নাকি খুবই খারাপ। তার কথাও তো কিছুই লিখলেন না। ছোট ভাই বোনদের কথা সবসময় জানতে ইচ্ছা করে। বিশেষ করে এখন যারা 'মা' হারা। এ সমস্যা একমাত্র আমার সমস্যা নয়। আমার বিভিন্ন বন্ধুদেরও এই সমস্যা।
High-Court আমার Habeas-Corpus গ্রহণ করেছে। ২৪.১.৫২ তাং আমাদের Habeas-Corpus হওয়ার কথা ছিল। আমরা সময় চাওয়ায় High-Court আমাদের সময় দিয়েছে। ১৩.৩.৫২ টাং আবার হওয়ার কথা আছে। বন্ধুদের কাছে লেখা হয়েছে। পরিচিত কয়েকজন advocate এর কাছেও লেখা হয়েছে। উত্তর এখনও পাইনি। বোধহয় অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পাব। আমাদের পক্ষ হয়ে হয়তো কেউ দাড়াবে।
টাকা পেয়েছি। একটা কলমের বিশেষ দরকার। দাদীকে আমার সালাম দিবেন। বড়দের প্রতি আমার সালাম ও ছোটদের প্রতি আমার ভালবাসা দিবেন। আপনার শরীরের প্রতি বিশেষ নজর দিবেন। দেশের অবস্থা কি রূপ? দেশের সকলকে আমার সালাম ও ভালবাসা দিবেন। পন্ডিত ও সোনাগাজি কি চিঠি লিখতে পারে না? ফুফাতো ভাই ও বোনেরা কি লিখতে পারে না? আমি অনেক চিন্তা করেছি। কিন্তু উত্তর পেয়েছি একটা। তা হল- লিখতে পারে। ভালবাসা কৃত্রিম। আদর্শগত পার্থক্য। অনেকই চিনেছি- অনেকের কথাই জানতে পারলুম। এ ছাড়া অন্য কোন উত্তর খুজে আমি পাচ্ছি না।
ইতি
রসিদ
N.B. .... (অস্পষ্ট)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


