somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বালক কুসুমের ডায়রী বা একটি পুণ্যাত্মার চরিতনামা (১ম কিস্তি)

২৪ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ৭:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
শৈশবে একগুচ্ছ কবিতা লেখার বাতিকে পেয়ে বসেছিল। ইউনিসেফের খাতায়, মায়ের বকুনি উপেক্ষা করে শীত কাতুরে সন্ধ্যায় কিংবা গভীর রাতের নৈঃশব্দের পটভূমিকায় কবিতার খাতা খুলতাম- পরম শ্রদ্ধায়, গভীর বিস্ময়ে। শৈশব নিয়ে এ গাঁথা নয়। এটা একটা বৃহত্তর বাড়ির বর্ণনা দেবার আগে বাড়ির সামনে এসে কিছুক্ষণ ধাতস্থ হবার পাঁয়তারা। দেহের খেলায় যখন মেতেছি, তখন বারে বারে মনে হতো বেগানা এই পুরুষ আমি এতো এতো কিলোমিটার অতিক্রম করে, শেষে কি না বোরখা পরিবৃতা নারীর শরীর দেখতে পেলাম না, যে নারীর শরীর আবার ভেজা জ্যোৎস্নার মতো মোহনীয় ব’লে শুনেছি!

বাংলা ভাষার ছন্দ আমার কাছে সেই ছোটবেলায় মনে হতো প্রকৃতির মতো। কৈশরের সাঁকো যখন নড়বড়ে এবং যৌবনগন্ধী লক্ষন যখন শরীরে পরিস্ফুট, তখন সাবালক এই আমি দেহের ভেতর অন্য এক দেহকে, প্রাণের ভেতর অন্য এক প্রাণকে আবিষ্কারের কসরৎ করেছি। গভীর রাতের জ্যোৎস্নায় আয়াতুল কুরসি পড়ে পড়ে শিরা-উপশিরায় স্থানুভাব আনার চেষ্টা করেছি। ভোরের পাখিদের কলরব মুখরিত হবার অনেক আগেই অজিফা পড়া ছিল দাদার অভ্যেস। ফারসি ভাষায়। যদিও কালবেলা পড়ে এসেছে তাঁর, তবুও রাগ মিশ্রিত এ সুর বহুদূর থেকে শুনা যেত। কোনো কোনো শীতের সন্ধ্যায় আমাদের পরিবারের সবাই খোশমেজাজে বহ্নি উৎসবে যোগ দিত। দাদা ঘরের মাঝখানে বড় কাঠের গুঁড়ি বসাতেন। লাকড়ি দিয়ে আগুন ধরাতেন, তুষ ঢালতেন। তুষ দিয়ে মাঝে মাঝে আগুন উস্‌কে দিতেন। মনোহর-সন্ধ্যা-উত্তীর্ণ- সময়। শিকারের গল্প শুনাতেন তিনি।

এটা ত্রিপুরা সংলগ্ন বাংলাদেশ। তিন জাতের মানুষের এখানে বাস। চাঁটগাইয়া, সন্দীপি ও দেশী। দাদার পূর্বপুরুষরা দীর্ঘকাল আগে এখানে বসবাস শুরু করেছে ব’লে কথিত আছে। ত্রিপুরা রাজ্যের বগাশাইর পরগনায় দাদার পূর্বপুরুষরা খুবইখানদানী ছিলেন।

২.
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ সময়। রাতের বুনন ঘন হয়। আলো যত অপসৃয়মান, রাতের জমিন তত মজবুত। ‘কালিঞ্জা’ মানে ভোর। ‘কালিঞ্জা’ শব্দটি ভোরের স্থানিয় নাম। কালিঞ্জা সময়ে ঘর ছেড়ে এই এলাকার এক ‘দেওয়ানা’ বেড়িয়ে পড়ে। পরিভ্রমনে তার রতি শান্ত। যৌণতার প্রতি তার অমোঘ আকর্ষন। সময়টা ১৯৮৩।

আনু মিয়ার হাওয়ার গাড়ি যেবার চালু হলো, গোরা সৈন্যরা সেবার গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে মার্চ পাস্ট করে চলেছে। আবুল হাসান তার বাবার কড়ে আঙুল ধরে আছে। বিস্ময়াভিভূত সৈন্যদের অগ্রাভিযানে তার কোন ভুমিকা নেই। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে তার পিতা। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ। টিকালো নাক। ঘন দুধের চায়ের মতো তার গায়ের রং। সেদিন বাজারে আনু মিয়ার হাওয়ার গাড়ি নিথর, নিস্তব্ধ। ইঞ্জিনের স্নায়ুতন্ত্রও সৈন্যদের এতো দাপট সইবার ক্ষমতা রাখে না বোধ করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচে এ এলাকা পোড়েনি। কিন্তু ‘নিলয় ঘাটি’ তে বিমানের উঠানামার দৃশ্যে এ এলাকার মানুষ হতবাক, কিছুটা হতবিহ্বলও। সৈন্যদের পদভারে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কিছুটা কি কঁকিয়ে উঠছে না? ‘একটি রাস্তার আত্মকাহিনী’ রচনা করতে গেলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের আত্মকাহিনী যে কোন মহামহিম সম্রাটের জীবনের ব্যাপ্তিকেও ছাড়িয়ে যাবে। প্রকৃতির ইতিহাস মানেই ব্যাপ্তির ইতিহাস। এ ব্যাপ্তি কালের নয়, কালের বিন্যাস-প্রক্রিয়ার। মানুষের ইতিহাস প্রকৃতির ইতিহাসের কাছে কণিকা মাত্র। এই ট্রাঙ্ক রোড ধরে সোজা আরাকানের দিকে সুজা বাদশাহ পালিয়েছিল। যাবার সময় খনন করে গেছে দীঘি, তৈরী করেছে মসজিদ।

দীঘির নাম "রাজার মা’র দীঘি"। মসজিদের নাম সুজা মসজিদ। এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে বালক আবুল হাসান পিতার করকমলে সমস্ত দায়িত্ব সমর্পন করে দিয়ে হাঁটছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করছে শিশুতোষ প্রশ্ন, “বাবা, গোরা সৈন্যরা কি সুজা বাদশাহের মত পালাচ্ছে?”
বাবা সৈন্যদের গন্তব্য ও ক্ষমতা নিয়ে গল্প ফেঁদে বসলেন। আবুল হাসানের পিতা খোদা বক্সের এটা অভ্যাস। পল্লবগ্রহীতা নয়, বিষয়ের গভীরে পৌঁছা তার রীতিমত এক বাতিক।

৩.
কাকড়ী নদীর পাড় ধরে সোজা রঘুনন্দন পাহাড়ের দিকে হেঁটে যান, পাবেন অনেক গ্রাম। সন্দীপি আছে, চাঁটগাইয়া আছে, দেশী আছে। রঘুনন্দন পাহাড়ে যাওয়ার জন্য অনুমুতি লাগবে। কারণ ওটা ভারতে।
বাংলাদেশের কাঁঠালিয়া পর্যন্ত চলে যান। পাবেন অনেক গ্রাম। বাংলাদেশের চিরায়ত সবুজ আর আঞ্চলিকতার ভেদাভেদ পাবেন। আজ আমি এমন এক গল্প বুনতে যাচ্ছি, যার ভূমিকা নেই, শেষ নেই, শুধু অবতারনা আছে।

৪.
বালক কুসুম এ গল্পের নায়ক। তার বিরুদ্ধে শালিস বসেছে। বিচারের বিষয়বস্তু হলো, বালক কুসুম ‘পশুদের সাথে’ সহবাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সহবাস পৃথিবীর আদিমতম সামাজিক সম্পর্ক। তাই বলে জ্ঞানী বালক কুসুম পশুদের সাথে সহবাস করবে! বালক কুসুম যখন পালিয়েছে, আকাশে তখন কালো মেঘ আর শুভ্র জ্যোৎস্নার লুকোচুরি চলছিল। বালক কুসুম তিন পাহাড়ের চূড়ায়। খরবেগে বরষা ঝরছে। বালক কুসুম চুপ। নিঃস্তব্ধ পাহাড়ে পোকামাকড়ের শব্দ। নৈঃশব্দের শব্দময় গাম্ভীর্যও এ নিশ্চুপতার চেয়ে সরব। তার মনে পরে যায় স্বপ্নের কথা। যদিও স্মৃতির বাহুল্যে খুব কমই ভোগে সে। অন্ধকারে বাতি নেভালে স্বপ্নের নারী হাতছানি দিয়ে ডাকেঃ বালক কু...সু...ম! এমনি এক রাতে বালক কুসুম একা বিছানায়। মিষ্টিগন্ধী প্রসূন-বায়ু। বালক কুসুম কি জানে, সব সমাজেই ইনকুইজিশান ও হেরেডিক থাকে? না বোধ হয়। রাতের তমশার ভেতর সভ্যতা লুকানোর জন্য যারা যৌনক্রিয়া বেছে নেয়, তেমনি একজনের দ্বারা আক্রান্ত হয় বালক কুসুম।

৫.
কুসুম বালক। কুসুম, কিন্তু বালক। এখন থেকে গল্পের শেষ পর্যন্ত কুসুম বলেই তাকে ডাকা হবে। কারণ, কুসুমের মতো তার শরীর। কুসুম পড়ে আছে অচৈতন্য নিদ্রায়। তার উপর সওয়ার হয়েছে এক পুরুষ। তার নাম কুটি দা। সবাই ‘কুটি দা’ বলেই চেনে তাকে। মৈথুন করছে কুটি দা। কুসুমের শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কুসুম জানে, এ তার গর্হিত অপরাধ। কুসুম জেগে যায়, চোখ বুঁজে পড়ে থাকে। কুটি দা তাকে বলাৎকার করে, পিষ্ট করে। কুটি দা’র দৃঢ় শিশ্ন দন্ডমূল আমূল বিদ্ধ করে কুসুমের শরীরে। প্রজননের স্পৃহা লুপ্ত হলে মানুষ পাশবিক হয়। কুসুমের মনে হয় যেন বা প্রাচীণ গ্রীসের মৈথুন বালক সে।

তারপর তিনবার কুসুম দেহ দান করেছে অন্যের আনন্দে। কিন্তু কুসুম? কুসুম তৃপ্তির প্রান্তরেখা বরাবর অভিযান চালিয়েছে তাদের উপরও। পরস্পরের উপর সমপরিমাণ অধিকার এক্ষেত্রে জাগ্রত হয়, যখন বিনা প্ররোচনায় শরীরের পুরুষকে অন্য পুরুষ দোমড়ায়, মোচড়ায়, পিষে ও ভোগ করে। কুসুম “হোমো” শব্দটি অনেক বড় হয়ে জেনেছে। ব্যক্তি যখন কোন পাপ করে, সেই পাপ ব্যক্তির নয়; সমাজের। দেহ মিলনে জ্ঞান চক্ষু উন্মীলিত হয়েছে খুব কম যুবকের। তার মধ্যে কুসুম একজন। জ্ঞান ও চক্ষুর যোগে আরও একবার যৌবনে কুসুমকে আত্মসমর্পন করতে হয়েছিল বেশ্যাবাড়ির খুপড়িতে।
- এতো কুৎসিত জননেন্দ্রিয় জীবনে দেখিনি!
- এতো বিভৎস মৈথুন জীবনে স্বপ্নেও ভাবিনি!
কুসুমের অনুচ্চারিত শব্দ কয়খানা। এসব শব্দের কোন মানে নেই। দিনে এবং রাতে হাজার বার নারীকে মৈথুন করেছে। গোপনে। সমাজ-সংসারের মুখোমুখি দর্শন নিয়ে দাঁড়াতে যে জানে, সে পূণ্যবান। গোপন যা কিছু, অপ্রকাশ্য যত কিছু, সবই পাপ। একনিষ্ঠ ধ্যানে মগ্ন কুসুম বিড়বিড় করে আউড়াচ্ছে, ‘এসব পাপ মুছে ফেলো। ভোর বেলায় রগ্‌রগে তোয়ালে দিয়ে ধুয়ে মুছে সাফ সাফ প্রেমিকার কাছে গিয়ে বলো, রূপান্তরের আগে তোমার পাপ দরকার। পাপ না করা মানে পূণ্যের পথে এক তিলও অগ্রসর না হওয়া।'
(চলবে)
২য় কিস্তি এখানে
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ১২:১২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×