প্রথম কিস্তি এখানে
৬.
মস্তিষ্কের দহনে পাহাড়ের চূড়ায়, আকাশের উদারতার ভেতর চরম যে মনোধিকার, তা কুসুমের অজানা নয়। এর আগে বহুবার হয়েছে। স্বপ্ন তামসিক। বাস্তব আলোকোজ্জ্বল। রৌদ্র-মেঘে সুফলা। কুসুম যখন ভর দুপুরে শয্যায় গড়াগড়ি দিতো, তখন প্রাণিত হতো অন্য নারী দ্বারা। স্বপ্নের ভেতর, মস্তিষ্কের সাজানো প্রকোষ্ঠে হরদম মৈথুনে সিক্ত করতো সমস্ত আত্বীয়দের। কখনও কখনও কার সাথে কী সম্পর্ক সব ভুলে যেতো। মস্তিষ্কে যারা মৈথুন করে তারা ঘৃনিত। মৈথুন হলো জ্ঞানের ও কায়িক শ্রমের নন্দিত শিল্প। অপ্রকাশ্য গোপন লিপ্সায় মানুষ উজ্জীবনী শক্তি হারায়। কুসুম হারিয়েছে তার প্রজননের শক্তি, উজ্জীবনের সুফলা উপাদান।
মস্তিষ্কে স্বপ্নের ঘর। যেখানে সবচে’ গোপন প্ররোচনায় প্রতি রাতে আড়ষ্ট, বিক্ষিপ্ত ও বিশ্লিষ্ট কুসুম- নিজেকে একশ’ এক টুকরা করে। প্রতিটি টুকরা এ গল্পের এক একটি উপাদান। পাপ স্খলনের এক একটি পর্যায়। এখন আমার নায়ক নিষ্পাপ শিশু। নিষ্পাপ কুসুম বালক। তোমার শিশ্ন, অন্ধকারে শরীরের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অভিঘাতে যে প্রেম, মনের তন্তুবায়ে যে কাপড়ের বুনন তুমি সৃজন করেছো, এ সমস্ত কিছু এ গল্পের উপজীব্য। সম্পর্কের অতীত যে সব সম্পর্ক, সে সব অতিক্রম ক’রে বালক কুসুম পাহাড়ের চূড়ায়। তার মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠের নিরানব্বই কোঠায় সে এখন ভীষণ শূণ্যতা অনুভব করে। শ্বাপদের ভয় তার নেই। কারণ, যে সমস্ত ভয়ের উর্ধ্বে, সে সৈনিক অথবা সন্ত। সন্ত ও সৈনিকের সামনে শ্বাপদ দাঁড়ায় না।
পাহাড়ে কোন কাব্যদ্রুম নেই। বালক কুসুম, কুসুম বালক প্রাচীন ভারতের নায়কের মতো কাব্যদ্রুমে নারীর সাথে নারী হয়ে যেতে চায়। নাবালক শিশুর উপর যে উদগ্র অত্যাচার করেছে সে শৈশবে, সে সব থেকে পরিত্রানের জন্য একটি শুভ্র চাদরে নিজেকে মুরিয়ে কফিন হয়ে দেখেছে- মুনকীর ও নকীর কতোটা আশৈশব তার সাথে ছিল।
ছোটবেলায় মস্তিষ্কে, যৌবনে মস্তিষ্কে এবং আবাল্য মস্তিষ্কে যে সব ধারনা তৈরী হয়েছে, সে সবই পাপের ফসল। আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে। ‘রোদ কি কাল থাকবে? পাহাড় ধ্বসে গেলে মৃত্যু হবে কি?’- এসব ভাবতে ভাবতে গাছের নীচে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে সে ঘুমিয়ে যায়। শীতার্ত সে। মস্তিষ্কে নারীকে বলাৎকার করা ক্ষমাহীন অপরাধ। কুসুম তা-ই করেছে। কিন্তু এখন সে নিষ্পাপ শিশু। স্বীকারোক্তি মানুষকে নিষ্পাপ করে।
৭.
একগুচ্ছ মেঘ উড়ে গেল। ঝরনার পাশে, পাহাড়ের আমলকী বনে হরিন নড়েচড়ে উঠলো।
স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় দোজবরের। দোজবর কুসুম এই জন্য যে, নিয়মিত তার দুই শাদী- মগজে ও বাস্তবে। চোখে এখন তার অঝোর ধারা। পাপে পঙ্কিল কুসুম বালক রূপান্তর চায়। কার মতো? প্রতিটি নক্ষত্র কুসুম বালককে দেখে।
আকাশে পাখি নেই। দু’একটি পাখি সদৃশ্য খেচর উড়ে এসে গাছের ডাল জুড়ে বসছে। প্রভাতের আর বাকী নেই। কুসুম বালক হরিন ও হরিনীর এক গোপন মিলন দেখে ফেলেছে গত রাতে। খাপ খোলা তরবারির মতো বিসদৃশ্য শিশ্ন সে যদিও দেখেনি, হরিনের শিৎকার উপলব্ধি করেছে শুধু।
৮.
এই কুসুম বালক, গোরা সৈন্যদের দেখতে পিতার হাত ধরে যে বালক হেঁটেছিল, তার খানদানের শেষ জীবিত বংশধর। কুসুম ছোটবেলায় শুনেছিল, স্বমহিমায় থাকতে হলে ইন্দ্রিয়কে বিনাশ করে পুনর্বার জাগ্রত করো, দেখবে ইন্দ্রিয়ের সাথে বৃক্ষের সম্মিলন হবে। আকাশের সাথে হবে। প্রাণের ভেতর স্বতঃপ্রবাহ স্রোতস্বিনীর প্রখর গতিময়তা প্রবহমান থাকবে। এ কথাগুলো কুসুমের দাদা পীর হযরত আইয়াল শাহ-এর মুখ নিঃসৃত। আর দাদা বলতেন, “স্মরনে ত্বরণ”। আজ এই পাহাড়ের কোলে কুসুম। সে এখন নর নয়, নারী নয়। সত্ত্বার অভিন্নতায় পাপ নেই। নর ও নারী উৎসাদিত হয়ে কুসুমের সত্ত্বা এখন লিঙ্গহীন শব্দের মতো, যার ভেতর কবিরা অকারণে লিঙ্গ স্থাপন করে।
আজ কুসুমের আনু মিয়ার হাওয়ার গাড়ি চড়তে ইচ্ছা করছে। অতীতে প্রত্যাবর্তন ভবিষ্যতের প্রতি অনীহা থেকে তৈরী হয়, জানে কুসুম। জ্ঞান-বালক সে। নারীর সমভিব্যহারে দুর্গম পথ সে পাড়ি দিয়েছে। যৌনতার স্বেদে ঘেমেছে। কিন্তু জাগ্রত পরহেজগার কুসুমের অন্তর্গত মানস-প্রতীক্ষায় থেকেছে, শান্ত ইন্দ্রিয়ে স্নান সেরে, নয়া থান খোলা কাপড় পড়ে সন্ত কিংবা সৈনিক হতে।
৯.
মনোরোগের ডাক্তার আফজাল খান গভীর মনোযোগ দিয়ে কুসুম বালকের ডায়রীর পাতা উল্টাচ্ছে। ডাক্তার শিহরিত হচ্ছে, প্রতিটি শব্দ ডাক্তারকে আঘাত করছে। কুসুম বালকের চিন্তার গভীরতা ডাক্তারকে আলোড়িত করছে। ক্রমাগত নিজেকে আবিষ্কারের কী এক অনাবিল আনন্দের রোগে বালক কুসুম ভুগছে। ডাক্তার ভেবেছিলেন, তার অসুখের সুরাহা করার জন্য ডায়রীর পাতাগুলো কাজে লাগবে। ডাক্তার পড়ছেন। তাঁর ভ্রু কুঁচকে উঠছে।
ডায়রী-১, ডায়রী-২ নামে ডাক্তার ডায়রীর পাতাগুলোকে ভাগ করেছেন। বালক কুসুমের চিকিৎসার জন্য রীতিমত ডাক্তারকে গবেষনা করতে হচ্ছে। ডাক্তার পড়ে চলেনঃ
“সাম্প্রতিক সময়টা বেশ অবসর। আলগা করে ভাবনা বুনছি। প্রাণবানতা হয়ে উঠেছে ধ্বংসাত্মক। ডানা ও পালকের সম্পর্ক উড়াউড়ির। আমার দৃষ্টিতে পাখির পালক বেশ বিঁধে। পালক দেখলে আমার হাতে জোড়া লাগানোর কথা চিন্তা করি। আমি দ্রুত ভাবছি, বৃক্ষ ও বনের পার্থক্য, যন্ত্র ও লোহার তফাত। দুনিয়াটা আমার ভাবনায় বেশ স্থির- যেন গ্লোব আমার হৃৎপিন্ডকে গোলাকার করে দিয়েছে। আমি টের পাই, শব্দ ও বস্তু আমার মস্তিষ্কে কেউ আঁকছে- কোন এক অজানা শিল্পী। আমি সেই শিল্পীকে খুঁজবো। অনুসন্ধান বড় বেশী মিলিটারী মার্কা। অনুসন্ধানে বড় বেশী মিলিটারী মার্কা শৃঙ্খলা। অনুসন্ধানে কেবল শৃঙ্খলার দাবী। আমি অনুসন্ধানের জন্য গ্যালিলিওকে গতকাল ফোন করেছি। অদ্ভুত স্বরে গ্যালিলিও বললেন, ‘তোমার সেই চোখের ভেতর আমার দূরবীনটা লাগাতে চাও? কিন্তু ওটা কি তোমার চোখে লীন নয়? খুঁজে দেখ বন্ধু...’। অকস্মাৎ লাইনটা কেটে গেল। আমার ভীষন মন খারাপ করেছে। আমি আর দূরবীন খুঁজবো না। আমার ভেতরটাকেই প্রনয়ন করবো দূরবীনে।”
“শীতবস্ত্রের ভেতরের উষ্ণতার মতো সকালের রোদ। এসব রোদেলা মূহুর্তগুলো মগজের ভেতর জমে থাকা ঘুম তাড়ায়। আলো ও অন্ধকার থেকে জেগে উঠে নায়ক। নায়কের চোখে যে সকল লুকোচুরি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, সে রকমের লুকানো-ছাপানো ভাব প্রকট হয়ে উঠে। এ সময়ে ও অনেক কিছুই ভাবছে। সকালের থোকা রোদ যখন দুপুরে বয়সী হবে, তখন থেকে কিংবা তারও আগে থেকে তাকে খুঁজতে হবে নতুন সেন্টার। ফ্রন্ট লাইনে সব ব্যাঙ্কার থেকে সৈন্যরা লক্ষ্যবস্তু তাক করে। যুদ্ধের ভেতর বেঁচে থাকা এবং হত্যা করা- দুটোই দরকার। আর যুদ্ধের কলাকৌশলের তত্ত্ব সে রকম ভাবেই লেখা। আজ বড়ই খুশীর দিন। খুশী এখন ত্বকের মতো পায়ে লেগে রয়েছে। খুশী এখন যুদ্ধের মতো অবিচ্ছেদ্য। চিন্তা তো দেখা যায় না, অথচ অন্যদের কাছে এবং নিজের কাছে চিন্তা ধরা পড়ে যায়।
নিজের সঙ্গে আরো সঘন হওয়া দরকার। নিজের সাথে লিপ্ত হওয়া দরকার কথোপকথনে। একটি সংবাদ তার দৃষ্টিকে কেড়ে নেয়। সংবাদের উপর তার ফ্রি-ল্যান্স খানখান হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে। মানুষ এমন পণ্য বানাবে, যাতে খুঁত থাকবে না। যত খুঁত, তত মজুরী কম। সংবাদটা যেন সে মেশিনের কাছ থেকে সংগ্রহ করছে, মানুষের কাছ থেকে নয়। মানুষ ও মেশিনে কি কোন তফাত নেই?”
“পর্দানশীন শরীর ও খোলা দিলের সংঘাত চলছে। আমার অনেক কথা আছে। নিজের ভেতরটা দেখতে হলে নিজের মনে কথা কইতে হয়। কিন্তু কথা ক’ব কী করে! নিজের কাছে নত না হলে নিজের সাথে কথা কওয়া যায় না। নিজের প্রতি নত হয়ে ওঠার পয়লা নম্বর কথা হলো, নিজের প্রকৃতি আর নিজের বাইরের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা। নিজের প্রকৃতির সাথে বাইরের প্রকৃতি মিলে মিশে গেলে তাকে কেউ কেউ, কোন কোন দর্শন বলে- মানুষ হয়ে ওঠা। আর নিজের প্রকৃতি ও বাইরের প্রকৃতির সাথে এক অচীন সম্পর্কে বাঁধা পড়ি আমরা, তখন এক চমৎকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। আমাদের ভিতরের প্রকৃতি সবসময় বাইরের প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচে। ভিতরের প্রকৃতি ক্ষুধার্ত হয়। বাইরের প্রকৃতির দিকে ক্ষুধা ধাবমান। বাইরের প্রকৃতি যখন ক্ষুধা মেটাতে অক্ষম হয়? তখন কি হয়? তখন দিলে জ্বালা হয়, ক্ষোভ ঠিকরে পড়ে।”
“আমি সেদিন কিছু লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম। আর জানেন তো, জিজ্ঞাসাবাদ মানেই বেশরম ও বেতমিজ হয়ে যাওয়া। আমি বললাম, ‘আচ্ছা আপনাদের মধ্যে সবাই তিনবেলা খেতে পান?’
প্রথমে সবাই কাঁচুমাচু, লাজে কাবু। আমি যখন বললাম, ‘দেখুন খানিকক্ষণের জন্য হলেও লাজ-লজ্জার পর্দাটা ছিঁড়ুন।’
পর্দার কথা বললাম। কারণ, প্রতিটি মেয়েই আঁচলে মুখ ঢাকছিল। একদম প্রকাশ্য হতে তাদের মন নিশ্চয়ই সায় দিচ্ছিল না। আমার আবেদন ছিল, যদি আপনারা প্রকাশ্য না হন তাহলে আমাকে বেইজ্জত করা হবে। কারণ ইজ্জত বলতে আমি বুঝি, পরস্পরের প্রতি মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি। আর আমি আপনাদের উপকার করতে চাই। আমার উপকারের ধরনের মধ্যে কোন ত্রানকেন্দ্রিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটবে না। কেননা, ত্রানকেন্দ্রিক ভাব-সাব নিয়ে যারা আপনাদের সামনে এসে খাদ্যের প্রতি আপনাদের আকুতি বাড়ায়, জেনে রাখুন তারা আপনাদের ক্ষুধাকে কটাক্ষ করে। আমি আরও বলে রাখতে চাই, পশ্চিমা- নীতিনির্ধারকরা ক্ষুধা ও পুষ্টির ধারনাকে এমন ভাবে গুলিয়ে ফেলেছে যে তাদের সাথে আলাপ করলে মনে হয়, ল্যাবরেটরী আর পেটের মধ্যে একটা সম্পর্ক দাঁড় করাতে পারলেই বুঝিবা গরীবেরা চাঁদোয়া রাতে গল্প বলার আমেজ ও মেজাজ ফিরে পাবে।
আমার কথাগুলো তাদের বেশ মনে ধরেছে। কিন্তু যা তাদের মনে তোলপাড় করে উঠেছে তা হলো, ভাত না খেয়ে থাকার কথা কি বলা যায়? এতে নিজের প্রতি নিজের শ্রদ্ধার ভাবটা কমে যায়। প্রতিবাদের আগের পর্যায়গুলো রচিত হয়ে চলে ধারাবাহিকভাবে। না খেয়ে থাকা ক্ষুধায় কাতর শিশু, যে শিশু এখনও শেখেনি কি করে ঝাঁঝালো প্রতিবাদ করা যায়, তাকে অভুক্ত অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে রাখার পরও আমরা চিৎকার করে উঠতে পারছি না কেন? তবে কি তা লজ্জা?
আমরা প্রতিবাদী হবো। কিন্তু প্রতিবাদের আকাঙ্খার উপর যদি লাজ ও সংকীর্ণতার বোরখা পরানো হয়, তবে আমরা প্রতিবাদী হবো কেমন করে? আমাদের ক্ষুধার সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। তারা আমাদের ক্ষুধাকে জমি থেকে বিচ্ছিন্ন, প্রকৃতি থেকে আলাদা করতে চায়। তারপর আমাদের উপর চড়াও হয় ত্রান নিয়ে। আর তারা আমাদের বলে বেড়ায় যে, আমাদের যদি আয় বাড়ে তাহলে ক্ষুধা আর থাকবে না। মজার ব্যাপার হলো, আয় বাড়লে হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষুধা নিবৃত্তির উপাদান বাড়বে। কিন্তু যে জমি ক্রমাগত বুড়ো ও অপুষ্টির কারণে হাহাকার করছে, আয় বাড়লে সে জমির উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাবে? আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলছে, না। কৃষিজীবি জনগনের আয় বাড়ানোর জন্য তো কৃষির উন্নতি দরকার। আমাদের পেটের অন্নের নীতিবাগিশরা হরদম যে ভুল করেন, সেটা হলো কৃষি থেকে অন্যত্র কৃষিজীবিদের দৃষ্টি আটকে রাখা আর জমিগুলোকে নিজেদের নিছক ব্যবসা কেন্দ্রিক মানসিকতা দিয়ে আক্রমন করা।
আমি সেদিন একজন কৃষি ব্লক সুপারভাইজারের সাথে কথা বলছিলাম। চমৎকার ভদ্রলোক। বেশ প্রাণখোলা। সরকারী নির্দেশ আর দর্শন দ্বারা এখনও অতোটা নষ্ট হয়ে যাননি বলেই মনে হলো। তিনি বললেন, ‘ভাই, জমিতে ছানি পড়েছে। আর তাই জমি চোখে দেখে না। সে জন্য দেখুন না, গাছগুলির কী ভয়াবহ অপুষ্টি দশা!’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এমন হলো ভাই?’
তিনি বললেন, ‘ওদের লাল রোগ হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘সে আবার কেমন?’
তিনি বেশ বেদনার স্বরে বললেন, ‘দীর্ঘদিন শুধু সার কীটনাশক নির্ভরতার ফলাফল হচ্ছে এই!’
আমি বললাম, ‘আপনারা এটার উপর গবেষনা করুন, ফাঁস করে দিন কৃষি ধ্বংসের এসব পাঁয়তারা।’
তিনি হেসে বললেন, ‘গবেষনার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য লিটমাস পেপার আর আয়োডিনই ছোটখাটো গবেষনার জন্য পাচ্ছি না।’
তারপর অনেকক্ষন আলাপ হলো। তিনি একমত হলেন যে, হ্যাঁ, বাইরের প্রকৃতির উপর জঘন্য ব্যবসার যে প্রকট ছাপ পড়েছে, তার বিরুদ্ধে লড়াই না করলে ক্ষুধার কোন সমাধান হবে না।
আমি যখন মেয়েগুলোকে লজ্জা-তাড়ানো বক্তৃতা দিচ্ছিলাম, তখন ভাবছিলাম আমি কী তাদের ক্ষুধার সমাধান দিতে পারবো! তখন আমার বারবার কৃষি নিয়ে জঘন্য ব্যবসার ফাঁদে কি করে আমরা আটকে যাচ্ছি, তাই ভাবছিলাম।
এ মেয়েগুলো যেমন লজ্জায় অনেক কথাই হয়তো বলতে পারেনি, তেমনি আমিও মাঝে মাঝে লজ্জায় আঁকুপাঁকু হয়ে যাই। গ্রামে পুষ্টির ধারনা চালুর মধ্যে যে একটা কটু ও বিরক্তিকর খামখেয়ালিপনা আছে, সেটা আমি টের পেয়ে যাই। কতগুলো ক্ষুধাতুর মানুষকে পুষ্টির ধারনা দেয়াটা আমার কাছে বেশ হাস্যকর ও রসিক পশ্চিমাদের আমাদের পেট নিয়ে কারবার করার সরস বুদ্ধি মনে হয়।”
তার পূর্নাঙ্গ ডায়রীর কিছু অংশ পাঠ করে ডাক্তার আফজাল খান এক দৃষ্টে কুসুম বালকের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রতিদিন। ডাক্তার আবিষ্কার করতে চায় কুসুম বালকের অন্তর্গত বোধের ব্যাপ্তি।
-“কুসুম”!
কুসুম পলকহীন তাকিয়ে থাকে ডাক্তারের দিকে। ডাক্তার বলে চলে, “আমি গ্রামে যাবো। আমি কিছুদিন তোমার সংগে থাকতে চাই।”
ডাক্তারের মনে হয়, তার ক্লিনিকের সমস্ত ঔষধপত্র এখনই ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ১২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


