somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বালক কুসুমের ডায়রী বা একটি পুণ্যাত্মার চরিতনামা (শেষ কিস্তি)

২৬ শে জুলাই, ২০১১ রাত ৯:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দ্বিতীয় কিস্তি এখানে

১০.
এখন সন্ধ্যা। বিষন্ন হয়ে বসে আছে সে মুখ গুঁজে। নিজের ভাবনায় এতোটা নুয়ে থাকে হতাশাবাদীরা। কিন্তু সে বেঢপ হতাশাবাদী নয়। সে পর্যদুস্ত হয়ে আছে অন্যের ভাবনায়। দুপুরের খর রোদে হন্‌হন করে হেঁটেছে সে। এখন রাস্তার পাশে সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে গাছের নীচে বসে আছে। মাঝে মাঝে ইতিউঁতি চোখ গাছের পাতার ঘন বিস্তার উপেক্ষা করে চিলতে আকাশ দেখছে। আকাশের বিস্তারের চেয়ে ভগ্নাংশ দেখা অনেক বেশী রোমাঞ্চকর, গবেষনার সান্নিধ্যময় একধরনের বিস্ময়বোধক তৃপ্তি পাওয়া যায়। ইতিউঁতি চোখ চারপাশের গাছ গাছালির উপর গিয়ে পড়ে।

সারাদিন খুঁজেছে। সে ভাবে, তার খোঁজা নিরন্তর চলতেই থাকবে। হঠাৎ একটা পাখির ডানা ঝাপটানির শব্দ সে শুনতে পায়। পাখিদের প্রতি একধরনের দরদ তার আছে। কিন্তু কিঁচির-মিচির সে পছন্দ করে না। আর এক মূহুর্তকার ডানা ঝাপটানি তাকে বেশ বিরক্ত করে- যেন বা তার ধ্যান ভাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। আসলে সে ধ্যানী নয়। মাঝে মাঝে তার শরীর এবং মগজ ধ্যানের ভান করে। এবং এ ভান তার পছন্দ নয়।

কবিরাজ হরিলাল। বয়সে তরুণ। কবিরাজ হতে হলে বয়স বাড়তে হয়, মানুষের শরীর আর গাছেদের সম্পর্ক বুঝতে হয়। কবিরাজ হরিলালের কারবার গাছপালা নিয়ে। কোন গাছ না পেলে তার মনে হয় যে, সে তার বড় ছেলেটাকে হারিয়ে ফেলেছে। কবিরাজের খেয়াল নেই- সন্ধ্যা নিভুনিভু, এখনই রাত শুরু হবে। আজ রাতে গাছ খোঁজা বেশ মুশকিলের কাজ। সাপ-খোপের ভয় আছে। যদিও কবিরাজ মানুষ ছাড়া আর কাউকে কিছুকে ভয় পায় না। কবিরাজ মানুষকে ভয় পায় কেন, তা সে জানে না। গাছটাকে গত কয়েকদিন ধরে খুঁজছে। সেটা পাওয়া যাবে কি না সে ব্যাপারে কবিরাজ হরিলাল তেমন নিশ্চিত হতে পারছে না। নিশ্চিত হতে পারলে আরও বেশী শ্রম ব্যয় করতে পারতো সে।

কবিরাজের তন্ময় অবস্থা দেখে পাশের বাড়ির আবনের বাপ ভাবছে, ছেলেটা এতো অল্প বয়সেই ভাবুক হয়ে উঠেছে! বেশী বয়স হলে করবে কি? তখন তো বোধ হয় শরীরের কাপড় খুলে সাধনার শেষ সীমায় পৌঁছাবে।

অবনের বাপ হাট থেকে ফিরছিল। তার আগে আগে হারিকেন হাতে তার ছোট ছেলে আসাদ। আসাদ বাপের চোখে রাস্তাকে দৃশ্যমান করে তোলার জন্য হারিকেনটা যাতে নড়াচড়া না করে- সেদিকেই মনোযোগী। বাপের কথায় সে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, কার কথা বলতেছো?”
-“হরিলালের কথা।”
- “হরিলাল মোশায় আমাদের ইস্কুলে একদিন লতা-পাতার গুন নিয়া বেশ বক্তৃতা দিছিলেন।”
- “হরিলাল আজকাল বক্তিমাও দেয় নাকি?”
- “তাকে আমাদের হেড স্যার কি বলছে, জানো? বলছে, বাবা যতো বেশী পারো গাছের খবর ছেলেদের কাছে পৌঁছে দাও, ছেলেরা মানুষ হয়ে উঠবে।”
- “ধুৎ তোর মানুষ! ঐ দেখ কবিরাজ হরিলাল মাঠের মাঝখানে বসে আছে।”

বালক কুসুমকে অন্য সবার মতো হরিলালও অসুস্থ ঠাউরেছিল। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর অসুখের চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন সে তার আকাঙ্খিত বৃক্ষের অনুসন্ধানে বের হয়।
সবাই তাকেও পাগল ভাবছে।

১১.
বালক কুসুম ও ডাক্তার আফজাল খান গ্রামে আসার সাতদিন পর নিশুতি রাতে দু’জন গ্রামের মূল রাস্তা ধরে হাঁটছে। ছোট্ট কুড়েঘর। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতর মৃদু আলো জ্বলছে বোঝা যায়। এ বাড়ি আলেয়ার। কুসুম আলেয়ার ঘরের পাশে এসে থমকে দাঁড়ায়। এ ক’দিন ডাক্তারের সাথে কুসুমের কথা হয়েছে খুব কম। প্রায় প্রতি রাতেই কুসুম কবিরাজ হরিলালের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে।

ডাক্তারের অনুরোধে আজ কুসুম গ্রাম বেড়াতে বেরিয়েছে। দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না, তারপরও দাঁড়ালো। সন্দিগ্ধ সে। কুসুমের মনে পড়ে যায়, সে “ছোটলোকের” মেয়েদের ভালোবাসতো। মহাশূণ্যে যে সব নক্ষত্রকে জোনাক পোকার মতো মনে হয়, সেগুলোকে এই আলেয়ার কানের দুলের দুলের মতো মনে হতো কুসুমের। আলেয়ার কানের দুল আর জোনাক পোকা প্রায়ই যত কাছাকাছি মনে হতো, নক্ষত্র ততটা নয়। ঘরের ভেতর থেকে বেড়ালের গোঙানির মতো বেসুরো কান্না শুনা যাচ্ছে।
একটা সোনার দুলের জন্য আলেয়া আর কখনও কাঁদেনি, বায়না ধরেনি কারও কাছে। কুসুমের মনে হয় কান্নাটা এখনও সে শুনতে পাচ্ছে। আলেয়াকে নিয়ে ভীষণ সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছিল গ্রামের মানুষ।

সেই রাতেও আলেয়া কেঁদেছিল ভীষণ। কুসুম বুঝে উঠতে পারেনি কেন এই কান্না। কামকলায় অভিজ্ঞ কুসুম। সেদিন রাতে আলেয়ার বাবা গিয়েছিল মাল খালাস করতে। মাল খালাস আর বাচ্চা খালাস একই কাজ। আলেয়ার বাবা মাঝে মাঝে মাল খালাস করতো। কুসুম একবার সাত দিন আলেয়ার কাছে থাকতে চেয়েছিল। তার বাবা গিয়েছিল দূর সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে, তারপর সে আর ফিরে আসেনি। আলেয়ার বাবা ছিল পাগলাটে ধরনের। ওর বাবার নাম ছিল আদম আলী। প্রায়শঃই বলতো, “তাজ্জব! গড়গড় করে মাল নামছে, আর সেটা টাকা ব’নে যাচ্ছে। মাল-সামান হাতে থাকা আর টাকা থাকা কি একই কথা? মনের ভেতর শুশুক। শুশুকের লাহান অন্তর আর কারও নাই। শুশুকের দিলের ভেতর নাকি স্বাভাবিক রহম আছে।” আর এসব কথা কুসুমকে বলে আলেয়া খিলখিল করে হেসে উঠতো।

আলেয়াকে অনেকে বেশরম বলে। কারণ সে খোদ মানুষের মতো কথা কইতো। কাটা কাটা কথা।
আলেয়া পালিয়ে গিয়ে তিন মাস গ্রামের বাইরে ছিল, এতে সবাই চমকে উঠেছিল। এ কী কথা! কিন্তু তার চরম শাস্তি হয়নি। কুসুমকে আলেয়া বলেছিল কেন সে পালালো। তার স্বামী তাকে জাপটে ধরেছিল। বলেছিল, “শরমের কি আছে, বউ? তোরে বিয়া করছি যা করনের জন্য, সেইটা করতে এতো লাজ কোথায়?”
আলেয়া বলেছিল, “শুধু শরীলের জন্য বিয়ার দরকার নাই।” তারপর পলায়ন।
কিন্তু আজ আলেয়া কাঁদছে কেন? ঘরের ভেতর ফিস্‌ফিসানি শুনা যায়। চাপা উত্তেজনা কুসুমকে পেয়ে বসে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখে, কবিরাজ আলেয়াকে জাপটে ধরে আছে।
-“এতো আদর জীবনে পাই নাই... ওহ্‌ কুসুম!
-“কুসুমের বন্ধু আমি... তার রোগের চিকিৎসার জন্য গাছ খুঁজি”, কবিরাজের ফিস্‌ফিসানি।
-“আমি তো সেই গাছ, কবিরাজ!”
কুসুম আঁতকে উঠে। বাক্যালাপ তার কাছে কঠোর নির্দেশের মতো ঠেকে। ডাক্তারকে জাপটে ধরে।

এ ঘটনার কিছুদিন পর কবিরাজ, ডাক্তার, কুসুম ও আলেয়াকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কবি ষড়জ পালাকার এই গ্রামেরই সন্তান। শহর থেকে বাড়ি ফিরে এসে কুসুমের বাড়িতে কৌতুহলবশতঃ প্রবেশ করে, তারপর বাড়িটার প্রাচীন গন্ধের টানে এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। পরিত্যক্ত ঐ বাড়িতেই কুসুমের ডায়রীটা খুঁজে পায় সে।
ডায়রীর শেষ পৃষ্ঠায় লেখাঃ “পাখি হতে চললাম।”

কবি কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে মরা লাশের গন্ধ পায়।

পবিত্র বোধে অঙ্কুরিত প্রখর সূর্যালোকের
বৃক্ষ, অভিবাদন জানাই,
সূর্যালোকের বৃক্ষ, প্রখর সূর্যালোকের
প্রস্বেদনে আমার ওষ্ঠ ভিজে উঠেছে
সৃষ্টিশীল পাখির মতো
তোমার ছায়ায়, আমাকে
অবলীলায় গ্রহণ করো।


সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১১ রাত ৯:০৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×