আজ ২৫ শে আগস্ট তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন। তাঁর লেখা ও চিন্তাভাবনাকে উপলক্ষ্য করে আমার কিছু ভাবনা জমা হয়ে ছিল। তাই তাঁর জন্মদিনটাকেই বেছে নিলাম ভাবনাগুলো উগড়ে দিতে। এতে “রথ দেখার রথ দেখা আর কলা বেচার কলা বেচা”- দু’টোই হবে ব’লে আমার ধারনা। তো একটা ভূমিকা টেনে তসলিমা সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণটা শুরু করা যাক। তার আগে এই পোস্টটির দীর্ঘসূত্রিতার জন্য অসহিষ্ণু পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
নারীর জীবনপ্রণালী ও জীবনচক্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নানাবিধ সম্পর্কের রূপ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সাহিত্যে নারীকে প্রকাশ করার জন্য বিশেষ ধরনের অলঙ্কার ব্যবহৃত হওয়ার নীতি বেশ সুপ্রাচীন। ক্রমাগতভাবে বর্তমানে নারীর শরীর ও ইচ্ছা তার প্রাকৃতিকতাকে অস্বীকার করছে। বাংলাদেশে নারীবাদী দর্শনের ভাবধারার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। গত একশ’ বছরে এ অঞ্চলের নারীরা নিজেদের মুক্তির লক্ষ্যে দার্শনিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম শুরু করেছে। কিন্তু এ সংগ্রাম তার নাভিমূলকে চিনে উঠতে পারছে না। বাংলাদেশের নারী মুক্তি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বিষয়গুলো এখনও নিরসন হয়নি। সবচে’ যেটা ভাবনার বিষয়, আমাদের দেশের নারীবাদী আন্দোলন এখানকার নারীদের সামাজিক ভেদ, সামাজিক সম্পর্কের বিভিন্ন রূপের সাথে তার সংঘাত- এ সব নিয়ে সাংস্কৃতিক লড়াই বহুকাল আগ থেকেই শুরু হয়েছে, কিন্তু সে সব বিষয়কে নারীবাদী আন্দোলনের বর্তমান পটভূমিতে বিচার করে দেখবার তাগিদ খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
তাছাড়া নারীবাদী আন্দোলন এখনও পর্যন্ত শহরকেন্দ্রিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে নানারকম প্রশ্নের মুখোমুখি। সবচে’ প্রনিধানযোগ্য প্রশ্ন হলো আমাদের সংস্কৃতির নাভিমূলটা আমরা কী ভাবে খুঁজে বের করবো। যেখান থেকে আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবধারার জন্ম এবং যে সব দার্শনিক ও ভাবুকতার বন্ধুর পথ আমরা অতিক্রম করেছি, সে ব্যাপারে স্বচ্ছ অনুধাবন ছাড়া কোনো আন্দোলনই আমাদের চৈতন্যের ও নান্দনিকতার বিকাশে অবদান রাখতে পারে না। নারীবাদী আন্দোলনের প্রধান করনীয় হচ্ছে সেই নাভিটাকে আবিষ্কার করা, যার সাথে আমাদের বন্ধন ছিঁড়ে গেছে, এবং এই চ্যুতির কারণেই নারীবাদী আন্দোলন বিদ্ঘুটে সব সাংস্কৃতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
যে পুনরুৎপাদনমুলক সম্পর্কের কারণে পুরুষের দৃষ্টিতে নারী হচ্ছে এক প্রাকৃতিক সত্ত্বা, সেই পুনরুৎপাদনমুলক সম্পর্কের একটি এদেশীয় বিশ্লষন দরকার। সংস্কৃতির ও ভাবুকতার মূলধারা চ্যুত হলে সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন ঘটাবার জন্য প্রয়োজনীয় লড়াইটাও পথ খুঁজে পায় না। এখানেও তা-ই হয়েছে।
শৈশব থেকে নারীকে সামাজিক সম্পর্কের যে সব রূপের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে হয় তা থেকে উৎসারিত হয় নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ধরন। পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের রূপকে পর্যালোচনা ছাড়া সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে নারীর শরীর ও চিন্তার উপর আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
সারা পৃথিবীতে নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশমান ধারার সাথে বাংলাদেশের নারীরাও সম্পৃক্ত। নারী যে কেবলমাত্র পুরুষের উত্থিত শিশ্নের খোরাক হতে পারে না, নারীর জরায়ু যে কেবল সন্তান উৎপাদনের মেশিন মাত্র নয়- এসব কথা বাংলাদেশের নারীরাও উচ্চারণ করেছে বেশ দৃঢ়তার সাথে। নারীবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন রকম ধারা, প্রবণতা ও দর্শন এ আন্দোলনকে বিচিত্রমুখী করে তুলেছে। বাংলাদেশের নারী লেখকদের মধ্যে নারীর অন্তর্গত বোধের, বোধ সজ্ঞাত প্রতিবাদের ধারা বেশ প্রাচীন হলেও খুব কম সংখ্যক লেখকই এক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছেন। আকিমুন রাহমানের নাম এক্ষেত্রে মনে পড়ে যায়। তবে তসলিমা নাসরিনই সাফল্য অর্জন করেছেন সবচে’ বেশী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নিরিখে তসলিমাও সামাজিক সম্পর্কের এসব রূপ অতিক্রম করেছেন। তসলিমার লেখায় প্রকাশিত ভাবধারা, চিন্তা-পদ্ধতি এসব বলার আগে তাঁর লেখার নন্দনতাত্ত্বিক দিক নিয়ে কিছু বলা দরকার। জনপ্রিয় কলাম লিখিয়ে হয়ে উঠবার জন্যে ভাষার লালিত্য ও বিশ্লেষনের রীতি দরকার। তসলিমা সেইসব গুনাবলী বেশ ভালভাবেই রপ্ত করেছেন। তাঁর লেখার যে নান্দনিকতা- সেটা নারীর মনের কথা আর অভিজ্ঞতার পরিমন্ডল বিশ্লেষনের জন্য কতটা গ্রহনযোগ্য, সেটা আলোচনার দাবী রাখে। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু নতুন কিছু নয়, এসব বিষয়ে এর আগে অনেকেই লেখালেখি করেছেন।
কোন ভাবনাই স্থির নয়। ভারতবর্ষে দর্শনে ও সাহিত্যে নারী নিয়ে যে ভাবুকতা ও চিন্তার ক্রমঃবিকাশ ঘটেছে, তার সাথে বর্তমান নারী আন্দোলনের কোনো প্রাণের সংযোগ নেই। ভারতবর্ষে, বিশেষভাবে বৈদিক যুগে নারী সম্পর্কে যে সব ধারনা প্রচলিত ছিল, সেগুলো তসলিমা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের কারণে যে ভাবুকতা বহুরূপ এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাবুকতার জগতে নারী-চিন্তার যে ক্রমঃবিকাশ, তা থেকে বর্তমান নারী বিষয়ক চিন্তার বিকাশের ধারাকে আলাদা করে দেখা চলবে না। বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে নারীদের নিজস্ব লড়াইয়ের একটা ধারা আছে, সেই ধারা বেশ প্রবল ছিল। সেই ধারা অনুধাবন করতে না পারলে নারী বিষয়ক লেখার নন্দনতাত্ত্বিক রূপ নির্ধারন করা কঠিন হয়ে পড়বে। অভিজ্ঞতার পরিমন্ডল বিশ্লেষন করার জন্য ভাষাশৈলীও নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে, যদি ইতিহাস চেতনা এবং চিন্তার ক্রমঃবিকাশের ধারা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকে। নির্বাচিত কলামে নারীর শরীর, নারীকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে পুরুষদের ব্যবহৃত ভাষা সম্পর্কে যে সব মন্তব্য তিনি করেছেন, সেগুলোতে সত্যতা থাকলেও প্রকাশভঙ্গীর স্থুলতার কারণে ঐসব নিবন্ধগুলোর মর্ম অনুধাবনে কোনো পাঠক যদি অনাগ্রহী হয়, তবে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। ভাষায় কি ভাবে নন্দনতাত্ত্বিকতা চর্চা করতে হবে, সে সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট ছক নেই। তসলিমা যদি বৈদিক যুগের নারীদের অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্মম সময় অতিক্রম করে নারীদের ভাবুকতাকে, সমাজের সাথে লড়াইয়ের বিভিন্ন দিকের ক্রমঃবিকাশের প্রতি ইতিহাসবোধ নিয়ে একটু সচেতন ভাবে তাকাতেন, তাহলে তাঁর বর্ণিত অভিজ্ঞতার পরিমন্ডল নারী আন্দোলনে অনেক বেশী অবদান রাখতে পারতো। শিল্পমান ও নান্দনিকতার বিচারে তাঁর লেখা মূল্যায়ন না করে যদি কেবলমাত্র নারীর বোধ, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজে নারীর অবস্থান- এসবের নিরিখে তাঁর রচনাকে বিশ্লেষন করি, তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় নারীদের নিয়ে লিখিত কলাম হিসেবে সেগুলো চমৎকার। এতো সহজ ভাবে, এতো সাবলীল ভঙ্গিতে নারীর অন্ত:র্গত বোধ ও সমাজের সাথে তার সংঘাত খুব কম লেখিকাই প্রকাশ করতে পেরেছেন।
তসলিমার লেখায় উঠে এসেছে আমাদের অতীত। তিনি বলেছেন, “অনেকে ধারনা করেন বৈদিক যুগে ভারতবর্ষে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা ছিল, ইসলাম আবির্ভাবের পর সেই মর্যাদা আকস্মিক লোপ পায়। আমি তা মনে করি না। প্রত্নতত্ত্ব, শিলালিপি, তাম্রশাসন, প্রথম যুগের পুরান-বৌদ্ধ সাহিত্যের পাশাপাশি বৈদিক সাহিত্যই বহন করে বৈদিক যুগের সকল ইতিহাস। সংহিতা, ব্রাহ্মন, আরন্যক, উপনিষদ ও সূত্র সাহিত্যেই (শ্রৌত, গৃহ্য, ধর্মসূত্র) প্রধানত বৈদিক সাহিত্য। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতকের মধ্যে রচিত এই সাহিত্যে সমাজের যে চিত্র সংগ্রহ করি, তাতে নারী আদৌ মানুষ হিসেবে গন্য হয় না।” (তসলিমা নাসরিন, নির্বাচিত কলাম, পৃষ্ঠা ২৯)
তসলিমা নাসরিন আমাদের ঐতিহ্যের ও ইতিহাসের সারসংকলন করার প্রয়াস পেয়েছেন। আমাদের ইতিহাস এবং যে সব গ্রন্থ আমরা পবিত্র জ্ঞানে স্মরণ করি, যে সব তত্ত্ব-জ্ঞানকে আমরা মাথা নুইয়ে সম্ভাষন জানাই, এ সমস্ত কিছুরই “হিস্ট্রি অফ এক্সপোজার” জোগাড় করেছেন।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলন গড়ে উঠবার জন্য তসলিমার এসব উদ্ঘাটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নারীরা যদি নিজেদের ইতিহাস আত্মস্থ করতে না পারেন, তবে নারী আন্দোলন সজীব ও বেগবান হয়ে উঠতে পারবে না। এখনও নারীকে “বস্ত্র কম্বলের” মতো ব্যবহার্য বস্তু রূপে ভাবা হয়। এখনও নারীর “নিজের শরীরটি নিজের জন্য নয়।”
সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে পুরুষতান্ত্রিকতার সকল প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপের বিরুদ্ধে যে লড়াই বাংলাদেশে চলছে, তাতে তসলিমা নাসরিন প্রাণ সঞ্চার করেছেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। তসলিমাকে কোনো নির্দিষ্ট বর্গে কিংবা ধারার ভেতর ফেলে বিশ্লেষন করলে সেটা সঠিক হবে না।
বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের ধারাসমূহ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক। তসলিমা যে অভিজ্ঞতা তাঁর উপন্যাসে, কলামে, কবিতায় ও প্রবন্ধে ব্যক্ত করেছেন, তা সকল ধারার নারী আন্দোলনের কাছেই অত্যন্ত মুল্যবান উপাত্ত।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের কোনো কোনো অংশ নারীর শরীর ও শরীরের সাথে পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ক তসলিমার চাঁছা-ছোলা বক্তব্য মেনে নিতে পারেননি; যদিও খুব স্পষ্ট করে এসব বিষয়ে তারা কিছু বলছেন না।
তসলিমার বিভিন্ন লেখায় বারবার নারীর শরীর প্রসঙ্গটাই এসেছে। নারী প্রজাতি পুনরুৎপাদনমূলক যে সম্পর্কের নিগড়ে বাঁধা, তা ছিন্ন করতে এবং নারীর নিজের শরীরের উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শরীর সম্পর্কে যে সব বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষন তসলিমা তাঁর বিভিন্ন কলামে সহজ সরল ভাবে বলেছেন, এতে দোষের কী আছে! নারীর প্রজ্ঞা ও মননকে অস্বীকার করে নারীর উপর পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারনা একতরফা ভাবে চাপিয়ে দেবার যে প্রক্রিয়া সমাজে চালু রয়েছে, সেটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তসলিমা তাঁর লেখায় বিশ্লেষন করেছেন। পুরুষ চায় নারী নিজেকে দেখুক পুরুষের চোখ দিয়ে। নারীর শরীর নিয়ে যে কোনো ধরনের আলোচনা, নারীর শরীরের সাথে সমাজের সম্পর্ক, সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে নিজের শরীরের উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা নিশ্চয়ই অশ্লীল নয়। কিন্তু তসলিমার প্রকাশভঙ্গি কখনও কখনও খুবই স্থুল।
একমাত্র নারীর ক্ষেত্রেই দেখা যায় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ন্যায্যতা পুরুষরা মানতে চাইছে না। “নারী শরীরের গঠন, শারীরিক বিকাশের প্রথম পর্যায়, প্রতিটি ধাপ, বয়ঃসন্ধি, ঋতুস্রাব, যৌণ প্রক্রিয়া, গর্ভাধান, বয়ঃবৃদ্ধি, রজঃনিবৃত্তি, রজঃনিবৃত্তির পরের সমস্যা ও চিকিৎসা, বার্ধক্য, বার্ধক্যের বাহ্যিক চিহ্ন, মানসিক চাপ ইত্যাদি” (নির্বাচিত কলাম, পৃষ্ঠা ৩১) আলোচনা নিষিদ্ধ। সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে নারীর উত্থানের প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা হলো নারীর শরীরের উপর পুরুষের একাধিপত্য, নারীর শরীরের উপর রহস্যময়তার বোঝা চাপানো। সে কারণে তসলিমা খুব দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, “যে সমাজে নারীর শারীরিক মুক্তিই নেই, সেই সমাজ কেন দেবে নারীকে মানসিক মুক্তি?”
অনেক মধ্যবিত্ত এই চপেটাঘাত সইতে পারেননি, অনেকের হৃদপিন্ডেই তসলিমা আমূল বিদ্ধ করেছেন শব্দ-বর্শা। অন্যদিকে কূপমন্ডুক ধর্ম ব্যবসায়ীরা রণহুঙ্কার দিয়েছে, দাবী তুলেছে তাঁর বই নিষিদ্ধ করার। কী ঔদ্ধত্য! নারীকে কি শিল্পীর স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে কেবলমাত্র পদ্যে, প্রবন্ধে, উপন্যাসে তার নিজের ভাষাকে সীলমোহর দিয়ে বন্দী করে, পুরুষের মনঃপূত ভাষায় বাক্য নির্মাণ করে?
নারীর ভাষার স্বাধীনতার পরিধি ও মাত্রা যে পুরুষ নির্ধারন করে, সে পুরুষ সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে; প্রগতি ও মানবসমাজের অগ্রগতির পথে অন্তরায়। তসলিমা নাসরিনের নাম উচ্চারণ হওয়া মাত্রই মোল্লারা জেহাদী হয়ে উঠে, কোনো কোনো পুরুষমহল তাঁকে “বিকৃত রুচির মহিলা” হিসাবে প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগে, আর প্রস্তুতি চলতে থাকে তাঁর নাড়ীর স্পন্দন থামিয়ে দিতে। তসলিমা তাঁর অভিজ্ঞতার জগতকে বিশ্লেষন করতে গিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। এই প্রতিপক্ষ আমাদের সবার প্রতিপক্ষ। প্রতিপক্ষ প্রতিটি গণতন্ত্রমনা নারী ও পুরুষের। তসলিমা তাঁর অভিজ্ঞতার পরিমন্ডলকে বিশ্লেষন করেছেন তাঁর সাহিত্যে, কলামে, কবিতায় ও প্রবন্ধে। ইতিমধ্যেই তিনি বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। লেখক হিসেবে এটা তাঁর সাফল্য। নারী যখন তার অভিজ্ঞতার পরিমন্ডলের বর্ণনা করে তখন শব্দচয়ন সম্পর্কে রক্ষনশীল শালীনতাবাদীরা তাকে প্রায়শঃই স্মরন করিয়ে দেয় যে, এসব উচ্চারণ নারীর মুখে মানায় না। তসলিমা এক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের শালীনতার বেড়া ডিঙিয়েছেন এবং সরাসরি কোনো রূপকাশ্রয়ী ভাষার আশ্রয় না নিয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। নারী তার অভিজ্ঞতার কথা বলবে ইনিয়ে-বিনিয়ে, শব্দের উপর রূপকের বোরখা পড়িয়ে এবং পুরুষকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে না ভেবে- এ হচ্ছে সমাজের প্রচলিত রীতি। তসলিমার প্রতিটি উচ্চারণে, কবিতার পংক্তিতে নারীর অভিজ্ঞতার জগত উঠে এসেছে, যে জগতে নারী নানাধরণের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের কারাগারে অন্তরীন হয়ে থাকে।
বেগম রোকেয়া শতবর্ষ আগেই খুব দৃঢ়তার সাথে নারীর দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তির কথা বলে গিয়েছেন। ধর্মের নামে নারীকে নীপিড়নের বিষয়ে বেগম রোকেয়ার চেয়ে জোড়ালো বক্তব্য খুব কম লেখকেরই কলম থেকে বেরিয়েছে। ধর্মগ্রন্থগুলো যে “পুরুষের সৃষ্টি”- এই বক্তব্য দিয়ে নারী হিসেবে ধর্মের প্রতি বেগম রোকেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠে। আজ শতবর্ষ পরে নারীর সংগ্রাম আরও বহুধা-বিস্তৃত হয়েছে। নারী তার অভিজ্ঞতার পরিমন্ডলকে আরো ভালোভাবে চিনে উঠতে পারছে। তসলিমা তাঁর কলামে নারীর প্রতি ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে খুব খোলামেলা বক্তব্য রেখেছেন। যা কিছু নারীকে নীপিড়ন করে, দলিত মথিত করে, নারীকে প্রকৃতির মতো ব্যবহার করতে উদ্যত হয়, এ সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার অধিকার নারীর রয়েছে। নারী তার অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করবে সোজা ভাবে, রূপকের ঘোমটা পরিয়ে নয়। সরাসরি যাদের উদ্দেশ্যে বলা দরকার, তাদেরকেই বলবে।
তসলিমা কবি। কবি তার কবিতায় নৈর্ব্যক্তিক বোধের কথা ব্যক্ত করবেন, যা বাস্তব সত্য তা তুলে ধরবেন, মানুষের সম্পর্কের স্থুলতাকে কটাক্ষ করবেন, এক বিমূর্ত ও বিশুদ্ধ চৈতন্যের দিকে অভিযাত্রায় বার বার স্বরযন্ত্রে ধ্বনিত হবে এমন এক বাস্তবতার কথা, যা আমরা অতিক্রম করে যাচ্ছি এবং যা থেকে পরিত্রানের জন্য আমরা সংগ্রামরত। কবি সময়কে নির্মান করেন। মানুষের অন্তর্গত বোধের, দার্শনিক জিজ্ঞাসার জবাব দেবেন। কবি হিসেবে তসলিমা নারী ও পুরুষের সম্পর্কের, নারীর সংগ্রামের ঐতিহ্যের ও নারীর সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে উন্মেষের গণতন্ত্রায়নের লড়াইকে বেগবান করার জন্য লিখে লড়ছেন। নারীর সংগ্রামের ক্ষেত্র যত ব্যাপক হচ্ছে, ততই পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে। নারীর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পারিবারিক কাঠামোর ভিত্ নড়ে গেলেই সমস্ত পুরুষকূল সমস্বরে চিৎকার করে বলে, ‘হে নারী! সংসারে ফিরে এসো। হে প্রিয়তমা! সংসারই হলো মধুরতম মিলনের পবিত্রতম জায়গা।’
আমি বহু মধ্যবিত্ত নারীর সাথে কথা বলেছি, যারা তসলিমার অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করেন, তসলিমা যে তাদেরই জীবনের চিত্র তুলে ধরছেন- এ কথা বলতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবেই মধ্যবিত্ত নারী চায় না “সংসার” নামক যে প্রত্যয় তার সামনে বিরাজমান, সেটাকে বিধস্ত করে- এমন কোন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে। “মধ্যযুগের ভারতবর্ষে নারী কবিরা ছিলেন তাপসী। তারা সকলেই চেষ্টা করেছেন নারী দেহকে যে কোন উপায়ে উত্তীর্ণ হয়ে একটা লিঙ্গচিহ্নহীন ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে।” (নির্বাচিত কলাম, পৃষ্ঠা ৩১)
তসলিমা তাপসী নন। তিনি লিঙ্গচিহ্নের ভেদ অর্থাৎ নারী ও পুরুষের প্রাকৃতিক বিভিন্নতার মধ্যে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থেকেই কবি। তসলিমার লেখনীর তীক্ষ্ণতা “নারী”কে পুরুষদের একটি ব্যক্তিগত পূর্বসিদ্ধ ধারনায় পর্যবসিত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে ‘ব্যক্তি’ হিসেবে পরস্পরকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমেই। তসলিমা পাঠ করতে যেয়ে সচেতন থাকা দরকার যে, তিনি কোন সুনির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থানকে তাঁর রচনায় ব্যক্ত করছেন না। বরং তিনি নারী হিসাবে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিমন্ডলকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোর ভিতর রেখে বিশ্লেষন করছেন। কিন্তু তাঁর তুখোড় জনপ্রিয়তা অনেককেই সংশয়াচ্ছন্ন করেছে। তাঁর জনপ্রিয়তাকে “নারীবাদী” সাহিত্যের জনপ্রিয়তা রূপে দেখাটা সমীচিন নয়। বরং যে অভিজ্ঞতাকে তিনি প্রকাশ করেন, সেই অভিজ্ঞতা পাঠককে নারীর অনুভূতির সাথে কতটা সম্পৃক্ত করে, সেটা দিয়ে উজ্জিবীত করে- সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়। একজন নারীবাদী দার্শনিক যে চিন্তন-প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে উত্থানের শর্তগুলোকে নিরূপন করেন; সে রকম করে তসলিমা বিশ্লেষন করেননি। তসলিমার অভিজ্ঞতার জগত পাঠ ক’রে বিপুল সংখ্যক তসলিমা অনুরাগী তৈরী হয়েছে। তসলিমার লেখা পাঠককে কতটা নারীর অন্তর্গত বোধকে অনুধাবন করবার, তার সংক্রমনের ব্যাপ্তিকে বুঝবার ক্ষেত্রে সহায়তা করে, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সাথে অনেকেই দার্শনিকভাবে এবং বিভিন্ন সংগঠনে সংগঠক রূপে ভূমিকা রাখছেন। কোনো দেশেই নারী আন্দোলন সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দানা বাঁধতে পারেনি। Mary Wollstonecraft সহ অন্যান্যরা অষ্টাদশ শতকে যখন লড়ছেন তখন পশ্চিমা সমাজে John Stuart Mill , Margaret Fuller , Babel প্রমুখেরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দর্শনের চর্চা করছেন। এবং বলাই বাহুল্য যে সে সময় দর্শন চর্চা ছিল সমাজ ও জীবনের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। একদিকে সমাজে নির্মিত হয়েছে ব্যক্তি-মানুষের মুক্তির দার্শনিক অবস্থান এবং সমস্ত দার্শনিকতার সারাৎসার থেকে উৎসারিত মর্মবস্তু নারী আন্দোলনকে যুগিয়েছিল অসামান্য প্রেরণা। ইতিহাসের এই দিকটি আবারও স্মরন করতে হচ্ছে এই কারণে যে, নারী আন্দোলনকে শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার জগত বিশ্লেষন করেই দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থান। এ লক্ষ্যে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের জন্যে তসলিমার অভিজ্ঞতার জগত নিশ্চয়ই মূল্যবান উপাত্ত রূপে বিবেচিত হতে পারে।
তসলিমা নাসরিন যে কালে জন্ম নিয়েছেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে লড়াই করছেন, সে সময়ে আমাদের দেশে অনেক “চিত্রাঙ্গদা” রয়েছেন, যারা নারীর স্বাধীনতার মর্ম অনুধাবন না করেই “চিত্রাঙ্গদা”। নারীর গতিশীলতা, গৃহ-অন্তরীন দৃশ্য থেকে মুক্তির প্রেক্ষাপটে এটা অবশ্যই এক ধাপ অগ্রগতি।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে বেশ ক’টি ধারা ও প্রবণতা লক্ষ্য করবার মতো। প্রথমতঃ সংস্কারমূলক ধারা। এই ধারা নারীকে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করে, অর্থনৈতিকভাবে ‘স্বাবলম্বী’ করার বিষয়টিকে আন্দোলনের প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। এই ধারা নারীকে উন্নয়নের একটি আলাদা ‘বর্গ’ মনে করে।
দ্বিতীয়তঃ সামাজিকভাবে নারী ও পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন থেকে সৃষ্ট সামাজিক বিভেদকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের যে সব পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান চিন্তা ও দর্শন চর্চা করছে, সে সবের বিরুদ্ধে লড়াই করে সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে নারীর উত্থানের শর্ত নির্মানের ধারা।
নারী আন্দোলনের সকল ধারার নারীদেরই তসলিমা পাঠ করা দরকার। কেননা তসলিমা পাঠের ভেতর দিয়ে নারীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা প্রকাশের একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়।
তসলিমার লেখার বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষন না করে শুধুমাত্র তার প্রকাশভঙ্গি, শব্দ ব্যবহার ও বিষয়বস্তু নির্বাচন নিয়ে কটাক্ষ করা, তাকে স্থুলভাবে আক্রমন করা আমরা সমর্থন করতে পারি না।
সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের উপর তসলিমার আলোকপাত করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যায়। কিংবা নারী আন্দোলনে এসব কলামের কোন তাৎপর্যমূলক ভূমিকা আছে কি না, তা খুঁটিয়ে বের করা যেতে পারে। কিন্তু এসব না করে গতানুগতিক কায়দায় তাঁর অনেক প্রতিপক্ষই তাঁর চরিত্রের উপর ‘দোষ লেপন’ করে তাঁকে কাবু করতে চান, যে চরিত্রের ‘ভাল’ এবং ‘খারাপ’ দিকের সংজ্ঞা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নৈতিক অবস্থান দ্বারা নিরূপিত হয়। নারীর লড়াইয়ের ক্ষেত্রকে পরিব্যপ্ত করার লক্ষ্যে, নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশমান ধারাকে আরো শক্তিশালী ও ব্যাপকতর করার প্রয়োজনে বিরাজিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-কাঠামোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষন করা দরকার। তসলিমা এক্ষেত্রে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তসলিমা সম্পর্কে কোনরূপ সমালোচনা মানেই যে নারী আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান, এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু সমালোচনা কিংবা আলোচনা হওয়া উচিত গঠনমূলক এবং নারী আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে। নারীর চোখ দিয়ে সমাজকে খুঁটিয়ে দেখবার যে চর্চা তসলিমা করেছেন, তাকে সমৃদ্ধ করবার লক্ষ্যে যে কোন সমালোচনাই গ্রহনীয়।
“যারা পান থেকে চুন খসলেই” তসলিমার বিরুদ্ধে হই হই রই রই করে তেড়ে আসে, তারা নারী আন্দোলনের সপক্ষের কেউ নয়। সকল মানুষের কর্তব্য হলো তসলিমার বিরুদ্ধে উঁচিয়ে ধরা শাণিত কৃপাণ ও শরীয়তি পাথর খন্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করা- নারীও মানুষ। এবং সার্বভৌম ব্যক্তি হিসেবে তার উত্থানের স্বপক্ষে আমরা সবাই একসাথে লড়বো। এ জন্যে চিন্তার স্বচ্ছতা ও সঠিক দার্শনিক অবস্থান নির্মাণে আমরা ব্রতী হবো। তসলিমা নাসরিনের এবারের জন্মদিনে এটাই আমার আকাঙ্খা।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


