আমার বড়মেয়ের বড় হওয়াটা আমি নিজে দেখিনি। কারণ ওর জন্মের দু'মাস পরে থেকেই ওকে রেখে আমাকে ছুটতে হয়েছে জীবিকার কাজে। ভাবতে গেলে এখনও অবাক লাগে, কিভাবে পার করেছিলাম সময়টা? বাসায় স্থায়ী কোনও বন্দোবস্ত ছিলনা বাচ্চা রাখার; আজকে প্রতিবেশী, কাল আত্মীয়, পরশু বন্ধুর বাসা, শেষে টানা ৬ মাস আমার বোনের বাসা, অতঃপর অফিসে (অনেকটা আমার-ই লাফালাফিতে) ডে-কেয়ার খোলার পরে সেখানে রেখে স্বস্তি পেলাম।
কিন্তু এই দুঃখটা রয়েই গেল, ওর "বড়-হওয়া"টা আমি দেখিনি, যেভাবে এখন দেখছি আমার ছোটমেয়েরটা। অফিস থেকে ফোনে শুনতাম "আজ জাইনা নিজে নিজে ঊল্টে গিয়েছে!!" অথবা "শোনো তোমার মেয়ে আজকে আমাকে মা ডেকেছে! মিস্ করলা!!" সত্যি মিস্ করেছি অনেক কিছু। কখন সে দাঁড়াতে শিখলো, প্রথম হাঁটলো, প্রথম দাঁত উঠলো কখন---সব শুনেছি ফোনে। রাতে বাড়ি ফেরার পথে আমরা দু'জন ওকে নিয়ে পড়তাম, সারাদিনের শোনা কথাগুলোর একটা প্রতিফলন খুঁজতাম। আমার মাতৃসম এক আত্মীয়া একবার বলেছিলেন "তোমরা তো শুধু ওর রাতের বাবা-মা।" কথাটা শুনে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম, যদিও উনি ঠাট্টা করে বলেছিলেন কিন্তু এতবড় সত্যি কথা আমি নিতে পারিনি।
কিন্তু মাশাল্লাহ্ যেখানেই আমার মেয়েকে রেখেছি, প্রত্যেকেই খুব আনন্দের সাথেই দায়িত্বটা নিয়েছেন। বরং যদি তাদের বাসায় না-রাখতাম তারা মন খারাপ করতেন। আমার মেয়েটা খুবই হাসিখুশী এবং শিষ্ট ছিল, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি নিয়ে কোনও ধরণের সমস্যা সে করেনি আজ পর্যন্ত। এমনকি কথা বলতে পারার সাথে সাথে সে টয়লেট-ট্রেইন্ড হয়ে গিয়েছিল অনেকটা নিজের উদ্যোগেই। ৯ মাসে কথা বলা শুরু করেছিল সে-মেয়ে; একবছরের জন্মদিনে সে পুরোপুরি সাবলীল!
এখন আমার ছোট মেয়ের সাথে তুলনা করলে বুঝি আমার বড় মেয়ে আসলে বয়সের তুলনায় একটু বেশি বিজ্ঞই ছিল বুঝি। ওর কথা বলার ধরণে কখনও আমি কোনও বাচ্চামি খেয়াল করিনি, উচ্চারণও ছিল শুরু থেকেই স্পষ্ট। ও আসলে বড়দের মাঝে থাকতে থাকতে বাচ্চাসুলভ কোনও আচরণই শেখেনি।
চাকরি ছেড়ে দুইকন্যা নিয়ে ঘরে থিতু হওয়ার পরই আমি জাইনাকে লক্ষ্য করা শুরু করলাম। দেখলাম সে তখন ৪ বছরের বাচ্চা হওয়া সত্ত্বেও খেলাধুলার চাইতে আমাকে সহযোগিতা করতেই বেশি মনযোগী। তাকে যদি আমি ঘরের কাজে সঙ্গী না-করতাম তবে সে সাংঘাতিক মন খারাপ করতো। শেষে তার বাবা তাকে লিভিং রুমের দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। মেয়ের আগ্রহ দেখে আমিও চামে তাকে দিয়ে টুকটাক করানো শুরু করলাম। বিশেষ করে ছোটবোনের ঊপর নজর রাখা, নিজের খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখা, সপ্তাহের ছুটির দিনে ঘরের আসবাব মুছে রাখা... ইত্যাদি।
মেয়ের স্কুল এর কাছে বাসা খুঁজছিলাম, যেটা পেলাম সেটা একটু বড়ই; ঘরে সাহায্য করার কেউ না-থাকায় এত বড় বাসা পরিষ্কার করা নিয়ে আমার বেশ মাথাব্যাথা শুরু হলো। আমার ছোটমেয়ের কল্যাণে পরিষ্কার বাসা ময়লা হতে বেশীক্ষণ লাগেনা; তাই আমার যন্ত্রণা বেড়ে গেল কয়েকগুণ। এইবার জাইনাকে বাস্তবিক কাজে লাগালাম। একটা মাটির ব্যাংক কিনে দিলাম।নিজে নিজে পড়াশুনা করা, খেলার রুম পরিষ্কার রাখা, ঘর গুছিয়ে রাখা এবং ছোটবোনকে নজরে রাখা সব মিলিয়ে ওকে "কাজের বিনিময়ে কয়েন" ভিত্তিতে নিয়োগ দিলাম। কয়েন জমানোর উৎসাহে জাইনার কাজ এবং পড়াশুনা আপন গতিতে চলতে লাগলো।
ইদানিং তার কয়েনের আরেকটা উপায় হয়েছে; তিনি হলেন Tooth Fairy নামক একজন কাল্পনিক মহিলা। আমাদের বাসায় ওনার যাতায়াত শুরু হয়েছে জাইনার দাঁত পড়তে শুরু করার পর থেকেই। পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো রাতে বালিশের তলায় রেখে ঘুমালে সকালে জাইনা দেখে তার দাঁত উধাও হয়ে সেখানে জ্বলজ্বল করছে নতুন একখানা কয়েন!! আমাদের সকালে খুব আগ্রহ নিয়ে সেই কয়েন দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে হয়, বলতে হয় 'ঈস্ আমার ছোটবেলায় যদি জানতাম টুথ ফেইরীর কথা তাহলে কতই না কয়েন জমাতে পারতাম!!"
এইখানে বলে রাখি, আমার সেলফোন জাইনার খুব প্রিয় খেলনা ছিল ছোটবেলা থেকেই। কখনো বারান্দা দিয়ে সেটা পড়ে গাড়ীর চাকার নিচে চ্যাপ্টা হয়েছে, কখনও সারা ঘরে ফোন খুঁজে না-পেয়ে জাইনার চোর-চোর চাহনি অনুসরণ করে সেটা খুঁজে পেয়েছি পানিভর্তি জগের ভেতরে। নিজে নিজে গেইম খেলা এবং কল করতে শেখার পর তো ফোনের দফারফা হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এরসাথে জাইবা (আমার ছোটমেয়ে) যোগ দেওয়ার পর আমি দামী হ্যান্ডসেট কেনাই বন্ধ করে দিলাম। কারণ যে-বাজেটে মানুষ দুবছরে একটা ফোন কেনে সেই বাজেটে আমাকে বছরে কিনতে হচ্ছে গড়ে চারটা! নষ্ট সেটগুলো যোগ দিচ্ছে মেয়েদের খেলনার সাথে, ওরাও খুশী! আমার ল্যাপ্টপেরও একই দশা। কীবোর্ড থেকে "কমা" বাটন হাওয়া হয়ে গেছে কিভাবে কখন আমি জানিনা।
যাই হোক, জাইনার সেই মাটির ব্যাংক এখন মনে হয় ভাঙ্গার সময় হয়েছে। আমার বুড়িমেয়ে বহুদিন থেকে জল্পনা-কল্পনা শুরু করেছে ব্যাংকের কয়েন-গুলো একসাথে পেলে সে কিভাবে খরচ করবে। আজকে সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে সে আমাকে বলল "আম্মু আমি ঠিক করে ফেলেছি আমি কী করবো আমার কয়েনগুলো দিয়ে"।
"কী করবে মা? খেলনা কিনবে?"
"ঊঁহু।"
"তবে কি স্টোরীবুক?"
"সেসব তো আব্বুই কিনে দেয়। আমি অন্যকিছু কিনবো।"
"কী কিনবে তবে? আমি তো বুঝতেই পারছিনা!"
"আমি তোমার জন্য একটা জিনিস কিনবো। তোমার তো এখন চাকরি নেই, আমরা বারবার তোমার মোবাইল ফোন নষ্ট করি, তোমার আবার কিনতে খরচ হয়না? তাই আমি তোমাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দেব।" জাইনার চোখে মুখে খুশী, যেন সে বিশাল জরুরী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
আর আমি অবাক!! আমার মেয়েটা তো দেখি সত্যি সত্যিই বড় হয়ে যাচ্ছে! এরপর যদি আমার চোখে পানি আসে আমি কী করে আটকাবো? আমার চোখে পানি দেখে জাইনা আমাকে খুশী করার জন্য তাড়াতাড়ি বলে উঠলো-
"আম্মু প্লীজ কেঁদোনা। আমি বড় হয়ে যখন চাকরি করবো তখন তোমাকে একটা ল্যাপ্টপও কিনে দেব।"
মেয়ে আমার, তুই কবে আমার মা হয়ে গেলি রে??

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


