এক
সময় কাটেনা এই ঢুলুঢুলু দুপুরটাতে। অফিসের ডাইনিং এ যাওয়া মানেই বেশি খেয়ে ফেলা, আর ডেস্কে এসে ঘুমের সাথে যুদ্ধ করা। পাশের রুমে বসে টিনা, প্রতিদিন সালাড খায়। মেয়েরা পারেও এমন ঘাসপাতা খেয়ে বেঁচে থাকতে। ফিগার ঠিক রাখার জন্যে তারা নিজেদের নানাবিধ টর্চারের ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়, যেটা কোনও ছেলের পক্ষে সম্ভব কি না তার জানা নেই। তবে লিমা ব্যতিক্রম। টুকুর মতই সে ভাতের পাগল। পারলে সকালের নাস্তায়ও খাবে গরম গরম ভাত। লিমার কথা মনে পড়তেই বিষণ্ণ হয়ে পড়লো টুকু। আগে মনিটরের দিকে তাকালেই দুইবেণী করা দাঁত দেখানো হাসিমুখটা চোখে পড়তো। একদিন কথায় কথায় লিমাকে সেকথা বলার পর সে দেখতে চাইলো ছবিটা।
“কখনকার এই ছবিটা?”
-তুমি তখন মাত্র স্কুল শেষ করলে, সেবার আমরা চড়ুইভাতি করেছিলাম শীতের সময়, মনে আছে?
“হুম, বাসার ছাদে, তাই না? এহ্হে, আমাকে বিচ্ছিরি লাগছে। বদলে ফেলো না ছবিটা!!”
-মাথা খারাপ? আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর ছবি এটা। তাছাড়া অফিসের বোরিং কাজের মাঝখানে এই দস্যি মেয়েটার সাথে আমি কতো কথা বলি জানো?
“তবুও। আমার ভালো লাগছেনা। এই ছবি তো আর আমি নই। আমি এখন অনেক অন্যরকম। বাই দ্য ওয়ে তোমার ওয়ালপেপারে আমার ছবিই বা কেন রাখবে?”
-তোমার ছবি রাখবো না-ইই বা কেন?
“এজন্যই রাখবা না, কারণ আমি তোমার মনের ওয়ালপেপারে থাকতে চাই। যেটা মুডের সাথে সাথে চেঞ্জ হবে, মাঝে মাঝে ঝাপসা হবে, কখনও আবার উজ্জ্বল হবে। ভুলতে চাইলে ভুলে যাবে। স্টিল ফটোগ্রাফ হচ্ছে চেহারার একটা রিমাইন্ডার। যেন নিজেকে তুমি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছ আমার কথা।”
-সাধে কি তোমাকে পাগল বলি? তোমাকে সারাটাক্ষণ দেখতে ইচ্ছে করে, এইজন্যেই তো ওয়ালপেপারে রাখা। আর সেসময়ের তুমি তো আমার জন্যে সবসময় স্পেশ্যাল।
“এখন স্পেশ্যাল নই?”
-তুমি আমার কাছে তো বরাবরই স্পেশ্যাল। কিন্তু সেইসময়কার তোমার কাছে আমি অনেক বেশি স্পেশ্যাল ছিলাম। তোমার ঐ ছবির দিকে তাকালেই মনে হয়; এই মেয়েটার চিন্তাভাবনায় এক আমাকে নিয়ে স্বপ্ন-দেখা ছাড়া আর কিছুই নেই। ভাবতে বড় ভালো লাগে আমাকে কেউ এত ভালোবাসে।
“ওম্মা, তবে তো ওটা সরিয়ে ফেলতেই হবে। জলদি সরিয়ে ফেল, জলদি!! ইন ফ্যাক্ট তুমি আমার সমস্ত ছবি মুছে ফেল। আজ থেকে আমার কোনও ছবি তুমি দেখতে পারবেনা।”
-বললেই হলো? আমি শুনছিনা।
“তবে আমাকে তুমি ভুলে যাচ্ছ ধীরে ধীরে, তাই না?”
-এর মানে কী?
“এর মানে হচ্ছে, তুমি ভয় পাচ্ছ আমার ছবি সামনে না থাকলে তুমি আমার চেহারা ভুলে যাবে। চোখ বন্ধ করলে আমাকে তোমার মনে নাও পড়তে পারে, এই তো?”
বহু তর্কবিতর্কের পর টুকু সেদিন সত্যিই মনিটরের ভেতর থেকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটাকে সরিয়ে দিল। আসলেই তো, কী আসে যায় এক ছবিতে? মানুষটাকে তো আর মুছে দেওয়া সম্ভব নয়।
ইদানিং এই কাজটা আর ভাল্লাগছেনা টুকুর। একজায়গায় অনেকদিন কাজ করলে এমনই হয়। কম্পানি টুক হিম ফর গ্রান্টেড, এটা পরিষ্কার বোঝা যায়। কাজের পরিধি বাড়ছে, ঘরে ফিরতে দেরী হচ্ছে, কিন্তু সেই হিসেবে পয়সা বাড়ছেনা তেমন। অনেক লম্বা রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঘরে যেতে হয় কাজ শেষে। মাঝে মাঝে এতই টায়ার্ড লাগে, যে না-খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। উইকেন্ডে লিমা ফোন করলে কথা বলে বলে খুব শান্তির একটা ঘুম হয়। ওর চাপে পড়ে দেখা যায় খাওয়াটাও বেশ ভালোই হয়। দূর থেকে লিমা এমনভাবে শাসন করতে থাকে, মনে হয় যেন সে আশেপাশেই আছে।
তখন ভীষণ দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে, দেশের কোনও একটা গ্রামে গিয়ে চাষবাস করতে পারলে মন্দ হয়না। লিমা কি রাজি হবে?
দুই
ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্টটা বহুক্ষণ ধরে নাড়াচাড়া করছে লিমা। আজাইরা বকর বকর করতে ইচ্ছে করছে খুব। রিক্সায় ঘুরতে গেলে এই এক সমস্যা। দশমিনিট হলো বেরিয়েছে সে, পাশে কেউ বসে নেই যার সাথে অনর্গল বকবক করা যায়। এমন সুন্দর জায়গাটা, যদি গলা ছেড়ে গানই না-গাওয়া গেল, কোনও মুগ্ধশ্রোতার স্তুতিই যদি না শোনা গেল পাশ থেকে; তবে তো আনন্দটা সম্পূর্ণই হলোনা!
মাঝে মাঝে নিজেকে বাহবা দেয় লিমা। ভাগ্যিস শেষ মুহূর্তে এই চাকরিটা নিয়েছিল! এভাবে একা একা শহর ছেড়ে দূরে কাজ করতে যাওয়া ঠিক হবে কী না ভেবে অনেক দ্বিধান্বিত ছিল সে। বাসায় সবাই নিষেধ করেছিল। কিন্তু ইন্টার্ভিউ দিতে এসে সে জায়গাটার প্রেমে পড়ে গেল। জাপানী মালিকানার এই ছোট্ট কারখানায় তার থাকার জন্যে কোয়ার্টার, সার্বক্ষণিক সিকিউরিটির ব্যবস্থা এবং সহযোগিতার জন্যে লোক আছে। কাজের পরিবেশও খুব ভালো। নতুন প্রতিষ্ঠান, বলতে গেলে লিমার হাতেই সবকিছু। সবচেয়ে ভালো হচ্ছে বেতনটা। প্রত্যাশার বাইরে। টাকা জমিয়ে ছুটিছাটায় দেশভ্রমণের ইচ্ছেটাও ভালমতই পূরণ হবে।
টুকুকে বলার পর সে ভড়কে গিয়েছিল।
-এখনও কি নিজেকে তুমি ছোটবাচ্চা ভাবো নাকি? চেনা নেই জানা নেই এমন একটা জায়গায় গিয়ে থাকবে আপনজন ছাড়া…পাগল হয়েছ?
হাসলো লিমা। “তুমি কি ভাবছো আমি এখন খুব চেনা জায়গায় থাকি? এই ঢাকা শহর আমার একেবারেই অচেনা। আমাদের সেই ছেলেবেলার ঢাকা এখন কেবল তোমার আমার কথোপকথনেই বেঁচে আছে। অনেক তো হলো ব্যস্ত দমবন্ধ করা ধোঁয়াঢাকা শহরে থাকা। তাছাড়া যাদের তুমি আপনজন বলছো তারা এখন নিজেদের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত। আমি তাদের জন্যে বিব্রতকর একজন। না ঘার-কা না ঘাট-কা। আপনজন বলতে, এখন আছ কেবল তুমিই। সেই তুমি তো এখন যেমন আছ, ঢাকা ছেড়ে গেলেও তেমনই থাকবে। চিন্তা কী?”
-তবে আমার কাছে চলে এসো।
“কেন? যা আছে দুজনের মাঝে, সেটাও ভেঙ্গে দিতে চাও নাকি?”
রিক্সায় ঘুরতে ঘুরতে টুকুকে ভীষণ মিস্ করতে শুরু করলো লিমা। টুকু সাথে থাকলে এই ফ্রেমে সারাটাজীবন আটকে থাকতে তার কোনও আপত্তি নেই।
কিন্তু সমস্যাটা তো সেখানেই। জীবনের ফ্রেম তো কেবল বদলাতেই থাকে। ক্ষণিকের শূণ্যতা ভরবার জন্যে স্থায়ী কোনও দায়বদ্ধতায় পড়াটা ঠিক হবেনা।
কানে হেডফোন লাগিয়ে লিমা শুনতে লাগলো তার পছন্দের গান “জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায়না, হায় ভীরু প্রেম হায় রে”।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ৯:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


