দুই যুগের বেশি সময়েও সরকার জানতে পারেনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ব্লকে গ্যাসের মজুদের পরিমাণ। এ দীর্ঘ সময়ে সাতটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ব্লকগুলো শুধু হাত বদলই করেছে। তবে তেমন কোনো কাজ করেনি, শুধু সময় নষ্ট করেছে। বর্তমানে গ্যাস সংকটের এটিও একটি কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অতীতের সরকারগুলো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারেনি।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২২, ২৩, ১৭, ১৮, ১০, ৭ ও ৫ নম্বর গ্যাস ব্লকগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে শুধু হাতবদল হয়েছে। কেয়ার্ন, ইউনিকল, ইউনাইটেড মেরিডিয়ান, ওমান এনার্জি, শেলওয়েল, ওকল্যান্ড, রেক্সউডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্লকগুলো হাতবদল হয়েছে। এর মধ্যে ২২ নম্বর ব্লক চার দফা হাতবদল হয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে। কিন্তু কেউ অনুসন্ধান পর্যন্ত করেনি। অন্য ব্লকগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে গ্যাসের বাজার তৈরি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ব্লক সম্পর্কে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান না চালিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। একপর্যায়ে ব্লকগুলোয় গ্যাস নেই বলে ঘোষণা দিয়ে তারা চলে গেছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ না পাওয়ায় দেশে গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কাজ করেছে বলে জানা গেছে। ফলে বর্তমানে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক ও শিল্প-বাণিজ্য খাতের ওপর। কাজ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অতীতের সরকারগুলো শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে, কিছুই করতে পারেনি।
সূত্র জানায়, ১৯৮৬ সালের পর থেকে গ্যাস ব্লক ইজারা নিয়ে ফেলে রাখার প্রবণতা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৮৬ সালে শেলওয়েল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২২ ও ২৩ নম্বর ব্লকের ইজারা দেওয়া হয়। কোনো কাজ না করে তারা ১৯৯১ সালে চলে যাওয়ার পর ১৯৯৫ সালে এখান থেকে একটি অর্থাৎ ২২ নম্বর ব্লক ইজারা দেওয়া হয় ইউনাইটেড মেরিডিয়ান নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। পাঁচ বছর পর ২০০০ সালে ব্লকটি তারা ওমান এনার্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে চলে যায়। ২০০৪ সালে ওমান এনার্জিও গ্যাস ব্লকটিতে কোনো কাজ না করে চলে যায়। ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে যথাক্রমে ১৭ ও ১৮ নম্বর ব্লক ইজারা দেওয়া হয় ওকল্যান্ড এবং রেক্সউড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে। তারা কাজ না করেই চলে যায়। বর্তমানে টোটাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্লক দুটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এদিকে ২০০১ সালে সাত নম্বর ইজারা দেওয়া হয় ইউনিকলকে। ইউনিকল কোনো কাজ না করে শেভরনের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেয়। ফলে দীর্ঘদিন পর শেভরন বাপেক্সকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় দফা কাজ শুরু করেছে। এদিকে শেলওয়েল ১৯৯১ সালে ২২ ও ২৩ নম্বর ব্লক ছেড়ে যাওয়ার পর ইউএমসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি আইনশৃঙ্খলাসহ নানা ধরনের কারণ দেখিয়ে কাজ শুরু করেনি। কেয়ার্ন পাঁচ নম্বর ব্লকের কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। ১০ নম্বর ব্লক দেওয়া হয়েছিল। তাদের সময়ও শেষ হয়ে গেছে। সূত্রটি জানায়, গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির সময় কিছু শর্ত উল্লেখ করা থাকে। শর্ত অনুযায়ী ব্লক বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের শিডিউল জমা দেয়। প্রথম দফায় কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের সময় দেওয়া থাকে। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে তাদের সময় বাড়িয়ে দেওয়ার বিধানও শর্তে উল্লেখ করা থাকে। বাড়িয়ে দেওয়া সময়ের মধ্যেও তারা কাজ করতে না পারলে তাদের চলে যেতে হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কিছু করার থাকে না। ২০০১ সালে কেয়ার্নকে ১০ নম্বর ব্লক ইজারা দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ২০০৫ সালে। এরপর তাদের ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সরকার এ ব্লকটি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ফিরিয়ে নেবে। ব্লকগুলো এভাবে ফেলে রাখায় শুধু সময় নষ্ট হয়েছে। আর সময় নষ্ট হওয়ার মূল্য দিতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে।
সূত্র জানায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রপ্তানি করার বিষয়টি জোরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ওই সময় বলা হয়, গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ শুধু রান্নার কাজে ব্যবহার না করে বিদেশে রপ্তানিসহ দেশে গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। এ ধরনের আলোচনার কারণে গ্যাস ব্লক ইজারা নেওয়ার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বাংলাদেশমুখী হয়ে ওঠে। একের পর এক তারা ইজারাসংক্রান্ত দরপত্রে অংশ নেয়। কিন্তু ১৯৯০-এর পর থেকেই গ্যাস রপ্তানি না করে দেশেই গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের বিষয়ে সরকারগুলো তৎপর হয়ে উঠলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক নড়ে। তারা বুঝতে পারে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ওই সময় ত্রিদেশীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ইজারা নেওয়া ব্লকগুলোয় অনুসন্ধান না করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য কোম্পানির কাছে ব্লক বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে। সরকারও এতে বাধা না দেওয়ায় গত ২৪ বছর ধরে শুধু হাতবদল হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ব্লকগুলো।
বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লক শেভরন এবং ১৭, ১৮ নম্বর টোটাল ও ৯ নম্বর ব্লক তাল্লোর কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ১৭ ও ১৮ নম্বর ব্লকে জরিপ কাজ শুরু হয়েছে। ৯ নম্বর ব্লক ইজারা দেওয়া আছে তাল্লোর কাছে। তাল্লো ১০টি কূপের মধ্যে একটিতে অনুসন্ধান চালিয়েছে। ৯ নম্বর ব্লকে কাজের বিলম্বের জন্য শেভরনকে আর্থিক দণ্ডও দিতে হয়েছে।
দীর্ঘদিন গ্যাসের নতুন উৎপাদন না হওয়ায় সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের ঘাটতি হচ্ছে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। চাহিদা হচ্ছে দৈনিক ২২০০ এমএমসিএফ। কিন্তু উৎপাদন বা সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র এক হাজার ৯৮০ এমএমসিএফ। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে এ হিসাবের কোনো মিল নেই। প্রকৃতপক্ষে দেশে গ্যাসের চাহিদা আরো অনেক বেশি। সে হিসাবে প্রতিদিন ঘাটতি ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী বছর এ চাহিদা দৈনিক ২৫০০ থেকে ২৭০০ এমএমসিএফে গিয়ে দাঁড়াবে। তখন সংকট হবে আরো ভয়াবহ। কারণ পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর সরকারের পক্ষে দুই হাজার ৪৭ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। এভাবে ক্রমে চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব না হওয়ায় ঘাটতি বাড়তে থাকবে। ঘাটতির ভোগান্তি পোহাতে হবে দেশের জনগণকে।
ইজারা নেওয়ার পর কাজ না করে ফেলে রাখা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁরা ব্লকগুলোর দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের মনিটর করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, একই সঙ্গে কয়েকটি কোম্পানিকে কাজ দিলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতো। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা আরোপ করার সুযোগ নেই। বড় বড় এলাকা নিয়ে তৈরি একেকটি ব্লকের কিছু অংশে কাজ করেই বলে দিয়েছে গ্যাস নেই। ফলে সরকারগুলোর কিছু করার ছিল না।
জোট সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, হাতবদল হওয়ায় সময় নষ্ট হয়েছে, কিন্তু আর্থিক লোকসান হয়নি। ওই সময় গ্যাসের বাজার ছিল না, এমনকি বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও ছিল না। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সামান্য জায়গা ড্রিলিং করেই বলে দিয়েছে গ্যাস নেই। পরে অবশ্য কৈলাসটিলা, ভাংগুরা, ফেনী গ্যাসক্ষেত্র নতুন করে ইজারা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গ্যাস পাওয়াও গেছে। তিনি বলেন, যারা কাজ করেনি তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কিছু নেই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিবিয়ানায় জমি নিয়ে সমস্যা ছিল। স্থানীয় লোকজন জমি দিচ্ছিল না। যারা জমি দিতে আগ্রহী ছিল তারা দাম চাইছিল কাঠাপ্রতি ৯ হাজার টাকা। অথচ ওই সময় সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণ করা ছিল তিন হাজার টাকা। পরে অবশ্য বেশি দামেই জমি নিয়ে দেওয়ার পর বিবিয়ানা কাজ শুরু করেছে।
জোট সরকারের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ইজারা নেওয়ার পর তারা কেন কাজ করছে না এ জন্য আইওসিকে চাপ দেওয়া উচিত ছিল। আমার সময় চাপ দেওয়া হয়েছে। সব চেয়ে বেশি চাপ দেওয়া হয়েছে কেয়ার্নকে। বিবিয়ানাকে চাপ দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে। আমার ১৬ মাসের মেয়াদে কোনো হাতবদল হয়নি।' তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে মূলত সংকট শুরু হয়। জোট সরকারের সময় অনুসন্ধানে ঢিলেমি ছিল। ওই সময় গ্যাস অনুসন্ধানে নজর দেওয়া উচিত ছিল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. ম তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে ওই সময় গ্যাসের বাজার ছিল না বলে তারা কাজ করেনি। বাজার না থাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ পায়নি কোম্পানিগুলো। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩০০ এমএমসিএফ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে বাজার তৈরি হয়েছে, এখন কাজ করবে। তিনি বলেন, ব্লকগুলো হাতবদলের পর একপর্যায়ে অধিকাংশ এলাকা সরকারের হাতে চলে এসেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কয়েক মাস হলো আমি এখানে এসেছি। আগে কী হয়েছে বলতে পারব না। তবে এখন আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইজারা চুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের যে শিডিউল জমা দেবে, সে অনুযায়ী তাদের কাজ করতে হবে। না হলে তাদেরও চলে যেতে হবে।'
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য সরকার বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যে কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ইজারা নেওয়ার পর কাজ না করে ফেলে রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
-- আহমেদ দীপু(দৈনিক কালের কন্ঠ)
সুত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


