ছাত্র রাজনীতি বনাম সন্ত্রাস(পর্ব-১)
ছাত্র রাজনীতির এ নোংরা রূপটির উদ্ভব হয়েছিল ১৯৫৮ সালে পাকিস্থানে সামরিক শাসন শুরু হলে। ওইসময় দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল ছাত্রদের দমিয়ে রাখতেই তৈরী করা হয়েছিল সরকারের অনুগত ছাত্র নামের গুন্ডাবাহিনী। তবে এর আগে এ রকমের দখল পাল্টা দখলের রাজনীতি ছিলনা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলেও ছাত্ররাজনীতিতে সংঘাত সৃষ্টি হয়নি। মুসলিম লীগের সমর্থক তৎকালীন মুসলিম ছাত্রলীগের যারা শাহ আজিজ গ্রুপ নামে পরিচিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে থাকতেন। আওয়ামীপন্থী ছাত্রলীগ তাদের কখনও উৎখাত করার চেষ্টা করেনি।
তবে সামরিক শাসন শুরু হওয়ার পরই ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে কোন্দল সংঘাত ও দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। আইয়ুব খানের গভর্নর মোনায়েম খানের পৃষ্ঠপোষকতা ও গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে গঠিত হয় এনএসএফ বা ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন নামক ছাত্র সংগঠন। এদের দৌরাত্ম্য, গুন্ডামি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমেই শুরু হয় ছাত্র রাজনীতির কলংক। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পাচপাত্তু’ নামে মোনায়েম খানের অনুগ্রহভাজন এক ছাত্রনেতার উত্থান ও একসময় পতন হয়। পাচপাত্তুই ছাত্র রাজনীতিতে হত্যার রাজনীতির প্রবর্তন করে। তবে গণতন্ত্রকামী ছাত্রনেতারা তখন এ ধরনের কলুষিত রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ নেতাদের ওপর পাচপাত্তুর ভুত ভর করে। শুরু হয় হত্যার রাজনীতি।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের দ্বারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালের ৪ঠা এপ্রিল রাত সোয়া দুইটার দিকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ’র দ্বিতীয়পর্বের ছাত্র নাজমুল হক কোহিনূর, এমকম প্রথম পর্বের ছাত্র মোহাম্মদ ইদ্রিস, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র রেজওয়ানুল, একই বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র সৈয়দ মাসুম মাহমুদ, আবুল হোসেন, এবাদ খান এবং এমকম প্রথমপর্বের ছাত্র বশিরুদ্দিন আহম্মদ জিন্নাহকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের টিভি রুমের বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে নৃশংসভাবে ব্রাশফায়ার হত্যা করা হয়। পরে তাদের একই হলের পানির ট্যাঙ্কে ফেলে রাখা হয়। ভোরে ট্যাপ ব্যবহার করতে গেলে পানির বদলে রক্ত বের হয়। খুনের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের আতংকিত করতেই এ কাজ করেছিল খুনীরা।
ঐ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ায় দু’দিন পরই গ্রেপ্তার হন। একটি তদন্ত কমিটি শফিউল আলম প্রধানসহ তার সহযোগীদের অভিযুক্ত করে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। বিচারে শফিউল আলম প্রধানসহ তার সহযোগীদের যাবজ্জীবন কারাদাণ্ড হয়। তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট ক্ষমা করে দেয়ায় নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি শফিউল আলম মাত্র ১০ টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যান। এভাবে ছাত্রনেতারা(!) খুন করেও পার পেয়ে যান বলে ছাত্র রাজনীতিতে হত্যার রাজনীতি আর বন্ধ করা যায়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ ব্যালট বাক্স পর্যন্ত ছিনতাই করেছিল। পরে জিয়াউর রহমানের আমলেও ছাত্রদের মধ্যে তৈরী হয় সরকারের অনুগত বাহিনী। ছাত্রদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন পন্থা নেন। জাতীয় পার্টির শাসনামলে স্বৈরাচার এরশাদও ছাত্রদের হাতে ব্যাপক আকারে অস্ত্র তুলে দিয়ে একটি অনুগত বাহিনী তৈরী করেন। স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলন দমন করতেই এরশাদের নির্দেশে সরকারী ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজ ছাত্রদের মিছিলে গুলি করেছিলেন। যার ফলে জীবন দিতে হয়েছিল ডা. মিলন, দেলোয়ারসহ আরও কয়েকজনকে।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



