ছাত্র রাজনীতি বনাম সন্ত্রাস(পর্ব-১)
ছাত্র রাজনীতি বনাম সন্ত্রাস(পর্ব-২)
১৯৯১ সালে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই দলটির ছাত্র সংগঠন দখল করে নেয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসময় প্রতিপক্ষ দল ছাত্রলীগের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে তারা। এছাড়া নিজ দলের নেতাকর্মীরাও এর বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের আরিফ হোসেন তাজ, সূর্যসেন হলের ক্যাডার রতন, তমিসহ আরও কয়েকজন অভ্যন্তরীণ ছাত্রদলের কোন্দলেই খুন হন। বিএনপির ২০০১ সালের ১০ই অক্টোবর বিএনপি জোট সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতাসীন হয়। ১৩ই নভেম্বর জহুরুল হক হল দখল নিয়ে ছাত্রদল অস্ত্রের মহড়া দেয়। ওই ঘটনা তখন দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ১৭ই নভেম্বর সংসদে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব তোলেন। এতে বিরোধি দল আওয়ামী লীগের সাড়া না পেয়ে ১৯ই নভেম্বর তিনি ছাত্রদলের কার্যক্রম স্থগিত করেন। ২০০২ সালের ২ জুলাই ছাত্রদলের লাল্টু ও পিন্টু গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে পিন্টু গ্রুপের দুজন বহিরাগত ক্যাম্পাসেই নিহত হয়। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামসুন্নাহার হলে ছাত্রদল নেতারা তান্ডব চালায়। তবে ছাত্ররা এর প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়লেও ছাত্রদল নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এতে জোট সরকার ফের শিক্ষাঙ্গণে লাঠিয়াল বাহিনীর প্রয়োজন অনুভব করে। পরে দলের তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ছাত্রদলকে নিজের মতো করে পুনর্গঠন করেন। কিন্তু এ দলটিও হেন সন্ত্রাসী কাজ নেই যে তাতে যুক্ত হয়নি। ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জহুরুল হক হলের ছাত্রদল নেতা খোকন নিহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুল ইসলাম মামুনও গ্রুপিংয়ের ছোবলে বাচঁতে পারেননি। এছাড়াও জহুরুল হক হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের হদিস আজ পর্যন্ত মেলেনি। জহুরুল হক হলে সভাপতি তানজীলের নেতৃত্বে মতিঝিলে তৎকালীন পুলিশের এলিট ফোর্স ‘RAB’-এর দু’সদস্যকে খুন করে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে পাশা নামের একজন ছাত্রদল ক্যাডার অস্ত্র নিয়ে গোলাগুলি করে দেশবাসির দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে, ইসলামী ছাত্র শিবির পুরোটাই ক্যাডারভিত্তিক ছাত্র সংগঠন। ১৯৭১ সালে জামাতের ছাত্র সংগঠন ছিলো ইসলামী ছাত্র সংঘ। কিন্তু জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে মুল দলটি নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে তার ছাত্র সংগঠন ছাত্র সংঘও নিষিদ্ধ হয়। তবে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংঘ নাম পাল্টে রাখে ছাত্র শিবির। পরে স্বৈরাচার সরকারগুলোর আমলে শিবির তাদের ক্যাডারভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিবির অস্ত্রভিত্তিক ছাত্র রাজনীতিতে শক্তি সঞ্চয় করে।
শিবিরের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এর আন্তর্জাতিক লিয়াজো। একটি আন্তর্জাতিক মুসলিম ছাত্র সংগঠন থেকে ছাত্র শিবির আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা ও আশ্রয় পায়। একেও পুরো পুরি কাজে লাগিয়েছে সংগঠনটি।
চার দলীয় জোট সরকারের আমলে তারা সরকারের অংশীদার হওয়ার কারণে এ অবস্থানকে পাকাপোক্ত করে। এসময় বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্রদলকেও তারা হটিয়ে দিয়ে তাদের দখল বহাল রাখে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদল তাদের দখল সহজেই ছাত্রলীগের হাতে ছেড়ে দিলেও শিবির ছাড়েনি। ফলে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলের সঙ্গে যে কয়টি সংঘর্ষ হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে শিবিরকে পাওয়া গেছে। তবে ছাত্রলীগের হামলার মুখে টিকতে না পেরে শিবির এখন আবাসিক হলগুলো ছেড়ে মেসে আশ্রয় নিয়ে অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলেছে। গত ১৮ জানুয়ারী চট্টগ্রামের ডবলমুরিং এলাকার মিস্ত্রিপাড়ার ‘হক ভিলা’ নামের ইসলামী ছাত্রশিবিরের মেস থেকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গুলি, বিস্ফোরক উদ্ধার করে। এ সময় জামায়াতের একজন সক্রিয় কর্মীসহ সংগঠনের ১২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তিনটি রিভলবার ও তিনটি এলজি এবং চতুর্থ তলার একটি ফ্যাট থেকে একটি রিভলবার ও নাইন এমএম পিস্তলের গুলিসহ ৩৭টি গুলি, বোমা তৈরির পাউডার পাওয়া যায়।
দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনেই ছাত্র শিবির সুকৌশলে অবস্থান করছে। শিবিরের দখলবাজিতে পড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তারা একবার জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ও দখল করেছিল। তবে প্রশাসনের চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রতিটি সরকারের সময়ই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনে প্রবেশ করে কোন্দল তৈরীর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত রয়েছে ছাত্র শিবিরের। ফলে শিবিরেরই একটি অংশ ছাত্রলীগ ও আরেকটি অংশ ছাত্রদল কর্মী হিসেবে কাজ করে। এরা ছাত্র লীগ বা ছাত্র দল করলেও শিবিরের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। তবে এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। অনেক সময় এরা শিবিরের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসায় শিবির কর্মী ইব্রাহিম ছাত্রলীগ করতে গিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে তাকে খুন করা হয়। শিবিরের এ কৌশলের কাছে দেশের প্রধান দুটি ছাত্র সংগঠনই হেরে গেছে। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোন ব্যবস্থা না নিলেও অন্তত বাস্তবতা স্বীকার করেছে। কিন্তু শিবিরের মুল দল হিসেবে জামায়াত পুরোপুরি ভিন্ন। তারা শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কোন দিনই স্বীকার করেনি।।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১০ বিকাল ৫:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



