আমার পাশের ডেস্কে বসে অমিত। শেষের কবিতার লাবণ্য ওরফে বন্যর বিলিতি ডিগ্রিধারী অমিত রায় ওরফে মিতা নয়, দেশী প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিবিএ ডিগ্রিধারী অমিত হক। হঠাৎ লক্ষ্য করি বেচারা কিছুটা টেনশনে আছে। ২ মাস হল জয়েন করেছে, অফিসের কোন সমস্যা নাকি জিজ্ঞেস করতে বলে_ 'সমস্যা অন্যখানে। একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি। আমার ইয়ে মানে আপনাদের হবু ভাবী যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তার ফরম ফিলাপের টাকা ছিল ৬৮০০ টাকা। এ টাকাটা কমানোর জন্য ছাত্রছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে সেটা কমিয়ে ৫,৫০০ টাকা করা হয়। তাতেও ওরা সন্তুষ্ট না হয়ে আবার আবেদন করে। অনেক আলাপ-আলোচনা, তর্কা-তর্কী, হুমকি-ধমকির পরে কর্তৃপক্ষ পরাজয় মেনে জানায়_ সাড়ে ৩ হাজার টাকার কমে আর সম্ভব না। কিন্তু ওরা তাতেও সন্তুষ্ট নয় ফরম ফিলাপ ১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনতে চাচ্ছে। এর জন্য মিছিল, মিটিং, অবরোধ, ভাঙচুর করেছে_ পেপারে, টিভিতে নিউজও হয়েছে।'
'আরে এটা তো খুব ভালো খবর। ৬৮০০ টাকার ফি ১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনছে।'
'ভালো খবর না ছাই।' অমিত হতাশ কণ্ঠে বলে_' ভাই, প্যাঁচ লেগেছে অন্য জায়গায়। আমার ইয়ে মানে আপনাদের হবু ভাবী আমার হবু শ্বশুরে কাছে ফরম ফিলাপ বাবদ থেকে ৯০০০ টাকা নিয়েছিল। ফরম ফিলাপের ১০০০ টাকা হয়ে যাচ্ছে দেখে ওর বান্ধবী ওর কাছে থেকে ৪০০০ টাকা ধার নিয়ে মোবাইল ফোন কিনেছে। সবার দেখা দেখি সেও ওই টাকা দিয়ে ড্রেস, কসমেটিক্স কিনে উড়িয়ে দিয়েছে।'
'এটা ভালো হয়েছে। আপনার খরচ বেচে গেছে।'
'আমি টেনশনে মরি! আর আপনি মজা করেন?' অমিত বেচারা কাতর কণ্ঠে বলে_
আরে ভাই টাকা কমেছে, শপিং হয়েছে এতে সমস্যা কোথায়?'
'সমস্যা হল_ পেপারে, টিভিতে নিউজ হওয়াতে সবার বাড়িতে জেনে গেছে ফরম ফিলাপে কতটাকা লাগবে। এখন ওর বান্ধবী যে ফরম ফিলাপের বাড়তি টাকার আশায় ধার নিয়ে মোবাইল ফোন কিনেছে, ওর বাড়ি থেকে এখন তো অতিরিক্ত টাকা দেবে না। আবার আমার হবু শ্বশুরমশায়ও ফরম ফিলাপের টাকা বেশি নেয়ার জন্য ওকে সামনের মাসে হাতখরচ কম দিতে পারে। বসুন্ধরার ফুড পার্কে ২ দিন ২ চিকেন বার্গার আর ১টা টি-শার্টের জন্য এখন আমাকে পুরো জের টানতে হবে! এ দিকে অফিসে আমার এখনও প্রভিশনাল পিরিয়ড শেষ হয়নি।'
অনেক ভারি ভারি কথা বললাম এবার একটা কৌতুক বলি। তিনজন কন্ট্রাক্টর হোয়াইট হাউসের ভাঙা দেওয়াল মেরামতের জন্য নিলামে অংশ নিলো এদের মধ্যে ছিল চীন, জাপান ও বাংলাদেশের কন্ট্রাক্টর। তারা দেওয়াল পরীক্ষা করতে গেল জাপানি কন্ট্রাক্টর অনেকক্ষণ মাপামাপি, আঁকা আঁকি করে বলল_'এইটা ঠিক করতে ৯০০ ডলার লাগবে: ৪০০ ডলার মালামাল, ৪০০ ডলার শ্রমিক মজুরি আর ১০০ ডলার আমার লাভ।'
চীনের কন্ট্রাক্টরও কিছুটা মাপ নিয়ে এসে বলল_ 'এটা ঠিক করতে আমার ৭০০ ডলার লাগবে: ৩০০ ডলার মালামাল, ৩০০ ডলার শ্রমিক মজুরি আর ১০০ ডলার আমার লাভ।'
এইটা শোনার পর বাঙালি কোন মাপা-মাপির মধ্যে গেল না সে পরিদর্শক অফিসারের কাছে গিয়ে কানে কানে বলল_ 'আমি ২৭০০ ডলার নেব।' সেটা শুনে অফিসার অবাক হয়ে বলল_ 'তুমি কিছুই মাপলে না আর টাকাও চাচ্ছ সবচেয়ে কম?'
বাংলাদেশীর উত্তর_ '১০০০ ডলার আমার, ১০০০ ডলার আপনার আর ৭০০ ডলার চাইনিজরে দিয়া ঠিক করাইয়া দিমু!!'
কাজটা বাংলাদেশী কন্ট্রাক্টর পেয়ে গেল!
ফরম ফিলাপ নিয়ে যখন কথা শুরু করেছিলাম তখন ফরম ফিলাপের আরেকটা ঘটনা বলি; কলেজে পড়ার সময় আমার ফরম ফিলাপের জন্য দরকার ছিল ১৮০০ টাকা আর আমি বাড়ি থেকে নিয়েছিলাম ৩০০০ টাকা। আমার অডিট অফিসার বাবা ধরে ফেলে ব্যাপারটা। কারণ তার এক বন্ধুর মেয়ে আমাদের সঙ্গে পড়ত। সে মেয়ে আমাকে পাত্তা তো দিত না উল্টো ভাব মারত, সে আবার আমার মতো এত বাড়িয়ে বলেনি। বলেছে মাত্র ৭০০ টাকা বাড়িয়ে ২,৫০০ টাকা। ওর বাবার কাছে থেকে আমার বাবা শুনেছে টাকার পরিমাণটা। আমি তখন ধরা খেয়ে বললাম আসলে ফরম ফিলাপে লাগবে ১৫০০ টাকা। ৩০০ টাকা ভুর্তকি দিয়ে ফরম ফিলাপ করলাম আমার সঙ্গে বাবার বন্ধুর মেয়েও ৩০০ টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়ে ফরম ফিলাপ করল। ফাইনালের সময় সেই আমাকে জিজ্ঞেস করে এবার বাড়িতে কত টাকা বলতে হবে।
এবার আন্দোলন নিয়ে একটা কৌতুক বলি_
নেতা : আগামী মাস থেকে আমরা যৌতুকবিরোধী আন্দোলনে নামব।
জনৈক ব্যক্তি : এ মাসে নয় কেন, স্যার?
নেতা : কারণ এ মাসে আমার ছেলের বিয়ে, আর আগামী মাসে আমার মেয়ের বিয়ে।
মানুষ বড়ই অদ্ভুত! আমার নতুন কলিগ আছে টাকার টেনশনে আর আমি কৌতুক বলছি। এজন্য বোধহয় বলে রোম যখন পুড়ছিল নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল। আরে এটা নিয়ে একটা কৌতুক মনে পড়ল :
মাঝ নদীতে এসে নৌকার তলা ফুটো হয়ে গলগল করে পানি উঠছে আর একটু একটু করে নৌকাটাও তলিয়ে যাচ্ছে সেসঙ্গে। একজন বাদে নৌকার বাকি যাত্রীরা মহা আতংকিত। পাগলের মতো এপাশ থেকে ওপাশে ছোটাছুটি শুরু করে দিল সবাই। কিন্তু ওই একজন পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে মিটিমিটি হেসেই চলেছে। তা দেখে তো বাকিরা অবাক, 'ঘটনা কী, এমন বিপদেও গাধার মতো হাসছ কেন শুনি!'
'হাসব না! নৌকাটা তো আমাদের নয়! ডুবলেই কী আর ভাসলেই বা কী!
অনেক কথা হল এবার উপসংহারে বলি, সত্তর-আশির দশকের ডিসুম ডিসুম অ্যাকশনের, নাচগানের বাংলা-হিন্দি ছবির শেষ দৃশ্যে ভিলেনকে খতম করার পরে নায়ক জেল থেকে বের হলে কিছু উপদেশমূলক কথা বলা হতো। তার পরে হলে ছবি দেখায় 'বখে যাওয়ার অপরাধে' ধরা খেলে ওই উপদেশমূলক বাণীটি বলে বলা হতো শিক্ষামূলক ছবি দেখেছি। ছেলেবেলায় ঈশপের গল্প পড়ে পড়ে আমাদের এই অবস্থা হয়েছে সব কিছুতে কিছুতে শিক্ষামূলক কিছু খুঁজি। নব্বই দশকে বিটিভি যুগে প্রায় শোনা যেত_ শুধু শুধু সময় নষ্ট হল। এই নাটকে/ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে শুধু ফাজলামি, শিক্ষামূলক কিছু নাই! তাই এ লেখার মোরাল লাইন হল:
একজন শিশুর কাছে আমাদের তিনটি জিনিস শেখার আছে : (১) কোন কারণ ছাড়াও সবসময় সুখী থাকা, (২) সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা (৩) নিজের যেটা চাই তা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চাইতে শেখা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



