যে কোন দলগত সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি তা হল সুযোগ্য নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট একটি মডেল কিংবা চিন্তাধারা থাকতেই হবে। সুযোগ্য নেতা হতে গেলে অবশ্যই তাকে দায়িত্বপরায়ণ এবং কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। দলনেতা হতে গেলে কেবল কয়েকটি গুণ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, যে কয়েকটি দোষ কিংবা ত্রুটিকে প্রথম রাতে বেড়ালের মতো মারা উচিত, সেগুলো নিয়েও ভাবা দরকার। বলা ভালো, যেগুলো প্রথমেই নিজের সার্বিক চরিত্র থেকে বাদ দিতে হবে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা। ভালো গুণগুলো তাহলে নিজে থেকেই জায়গা করে নেয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে। নেতার সৎগুণাবলির কথা আশা করি অনেকেই জানেন। যেমন : 'Credibility (বিশ্বাসযোগ্যতা)', 'Compassion (সহানুভূতি)', 'Clairvoyance ( দৃষ্টির স্বচ্ছতা)', 'Camaraderie (সখ্য)', 'Commitment (দায়বদ্ধতা)', 'Charisma (জনমোহিনী ক্ষমতা)' এবং 'Competence (দক্ষতা)'_ দলনেতার এই সাতটি আবশ্যিক গুণ নিয়ে এর আগেও অনেকে নানা আলোচনা করেছেন। আমি তাহলে নতুন কী কথা বলবো? আমি বলব সেই সাতটি দোষের কথা, নেতার আসনে বসার আগে যেগুলোকে বিসর্জন দেওয়াটাই কাম্য।
এ এক অদ্ভুত মডেল! যে সাতটি পাপস্খালনের কথা বলতে চলেছি, তা শুধু সুযোগ্য দলনেতা হওয়া নয় আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয়। এই সাতটি দোষ হল : লোভ, সর্বগ্রাসী কামনা, আলস্য, হিংসা, পদস্খলন, আত্মম্ভরিতা এবং ক্রোধ। নিশ্চয়ই এদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে বসে গেছেন! আসুন একটু দেখে নেয়া যাক।
সুযোগ্য দলনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে প্রথমেই নিজেদের মধ্যে থেকে লোভকে চিরতরে দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে। আমাদের নেতৃত্ব কালচারের এটাই সবচেয়ে প্রধান দোষ। দলনেতা হওয়ার পর নিজের দলের সবার জন্য নিবেদিতপ্রাণ না হয়ে নিজের নাম থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্সের উন্নয়ন করা। এজন্য আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি! তাই আজ যেন ভীষণ জরুরি আমাদের দলনেতাদের Credibility তথা বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন দলনেতার ব্যক্তিত্বের চরিত্র সবার প্রথমে এই গুণের দ্বারাই নির্ধারিত হয় জনমনে। আর একবার সেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে তলে তলে অনেক কিছু গুছিয়ে নিতে হয়তো পারবেন, কিন্তু নিজের যে সম্মানটুকু আপনি হারাবেন, তা ফিরিয়ে দেয়ার সাধ্য কারও নেই। বলাই বাহুল্য, এই বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাতেই সবচেয়ে পিছিয়ে আমাদের নেতারা। বিশ্বাসযোগ্যতাও এ এক মহাসংকট।
লোভের পর আসছি গ্লুটোনি অর্থাৎ সর্বগ্রাসী কামনার কথায়। সবকিছু নিজের দখলে নিয়ে নেয়ার এই মানসিকতাও বড় মারাত্মক সন্দেহ নেই। খাবদাব, বিয়ে-শাদি করব, ঢাকায় নিজে ফ্ল্যাটবাড়ি, গাড়ি করব_ এটাই কি আসল লক্ষ্য মানব জীবনের? সব কিছুর লক্ষ্য তো হওয়া দরকার মানবকল্যাণ। তা না হলে তাহলে দিনের পর দিন যারা না খেতে পেয়ে দিন কাটাচ্ছে, তাদের কথা ভাববে কে? এমনকি বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই তাদের জন্য। এই হতভাগাদের কথা আমাদের সবাইকেই ভাবতে হবে। কেবল নিজের আহার-বিহার-সংসার নিয়ে মেতে থাকার কোন অধিকার আমাদের কারও নেই। বরং জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কীভাবে নিদেনপক্ষে অসহায় মানুষজনের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, সেই চিন্তাই প্রধান হওয়া উচিত দলনেতার। দলনেতা হতে গেলে নিজের স্বার্থে বাঁচা নয়, প্রয়োজন প্রতিবেশীর প্রতি Compassion তথা সহানুভূতি। আশপাশে যারা মাথার ওপর ছাদহীন অবস্থায় প্রায় অভুক্ত থেকে দিনাতিপাত করছেন, তাদের কথা একজন দলনেতা কখনই ভুলে থাকতে পারেন না। এই সহায়সম্ব্বলহীন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে লড়াই করাটাই আসল নেতৃত্ব।
পরের দোষ আলস্য। এই আলস্য দূরে রাখাটাও অত্যন্ত জরুরি। আলস্য অর্থে আমি মানসিকভাবে চরম উদাসীন এবং শারীরিকভাবে অকর্মণ্যতার কথা বলছি। সক্রিয়ভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের পথে হাঁটার বদলে আলস্যতেই দিন গুজরান ঠিক নয়। এই দশা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টির অত্যন্ত প্রয়োজন। কর্মক্ষম হওয়াটাও তাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। সজাগ তাদের থাকতেই হবে। এটাকেই বলেছি Clairvoyance অর্থাৎ দৃষ্টির স্বচ্ছতা। দলের ভবিষ্যৎ আগে অনুধাবন করে সেই দিকে দল ও দলের সদস্যদের চালনা করতেই সংগঠনের উন্নয়ন।
চতুর্থ দোষ হিসেবে আমি হিংসাপ্রবণতার কথাই বলব। এই একটা কারণেই মানুষ দ্রুতগতিতে নিচে নেমে যেতে পারে। নিজের সহকর্মীদের প্রতি হিংসাপরায়ণ হওয়াটা কোন দলনেতার কাছে কখনই কাম্য নয়। শুধু সহকর্মী নয়, বিরোধী, ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকদের প্রতিও হিংসা কোনভাবেই সুখকর নয়। অন্তত দেশ ও সমাজের স্বার্থে তো নয়ই। হিংসা মানে তা কেবল হিংসাত্মক ঘটনার জন্ম দেয়। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, পরস্পরকে সমর্থন করার চেয়ে টেনে নামিয়ে দেয়াতেই যেন আমাদের নেতৃত্বের আসল তৃপ্তি! তাই এক্ষেত্রে প্রয়োজন Camaraderie অর্থাৎ সখ্য। এই সখ্য অবলম্বন করেই আপনি পারেন গোটা দেশকে, পুরো সমাজকে নিজের পাশে পেতে। এমনকি বিরোধীর-সমালোচকদের মুখ বন্ধ রাখতেও আপনাকে নিশ্চিতভাবেই খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।
পঞ্চম যে দোষ এড়িয়ে চলতে হবে তা হল পদস্খলন। আসলে যে দোষের কথা আমি প্রকৃতপক্ষে বলতে চাইছি, অনেক সময়ে দেখা যায় ক্ষমতার দম্ভে দলনেতার পদস্খলন ঘটে মাদক থেকে শুরু করে নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পরে। পরে কেলেঙ্কারিটা ঢাকতে গিয়ে নিজ সংগঠন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। অনেক মেধাবী দলনেতা কেলেঙ্কারির ফাঁদে পড়ে হারিয়ে গেছে। তাই এটা শুধুই পদস্খলন প্রশ্ন হিসেবে থাকছে না। এর পেছনে রয়েছে অন্যকে অপরাধে ইন্ধন দেয়া ও নিজেও সরাসরি অপরাধে শামিল হওয়া। কাজেই কোন নেতা যদি উন্নত জীবন চান তাহলে এই পদস্খলন তাকে দমন করতেই হবে।
দলনেতাদের ষষ্ঠ দোষ হল তাদের আত্মম্ভরিতা। এই দোষ অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। এটা তাদের অন্ধ করে দেয়। যা তাদের পরবর্তী 'সিঁড়ি'তে পোঁছাতে দেয় না। তাদের মধ্যে জনমোহিনী ক্ষমতা থাকে, আর এর প্রভাবেই তারা নিজেকে অসীম ক্ষমতাধর ভাবতে শুরু করেন। আর এই কারণেই তাদের পতন ঘটে। এই আত্মম্ভরিতা তাদের ভাবায় তারাই সবকিছু। তারা তখন সংগঠনের সদস্যদের নিজেদের করায়ত্ত বলে ভাবতে থাকেন, ভাবেন তিনি যা বলবেন তাই শুনবে সদস্যরা। ফলে তারা সংগঠনের জনকল্যাণমূলক কাজও বন্ধ করে দেন। তারা তখন অহংকারে মত্ত হয়ে সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা যা চায় তাও শোনেন না, উপেক্ষা করেন। যারা তখন কাছে থাকে তারাও হয়ে ওঠে তারই মতে সায় দেয়া তোষামুদের দল। তাই এই আত্মম্ভরিতাই শেষ পর্যন্ত দলনেতার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর যাদের এই দোষ স্পর্শ করে না তারাই শেষ অবধি টিকে থাকেন। তারা সাধারণ মানুষের কথা শোনেন, নিজের উঁচু মঞ্চ থেকে নেমে আসেন সাধারণের স্তরে। একমাত্র তাদেরই থাকে স্বাভাবিক কারিশমা, এটাই পরবর্তী 'সিঁড়ি' কারিশমা (জনমোহিনী শক্তি)। এই কারিশমাই তাদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখে। এটাই তাদের জনপ্রিয়তা এনে দেয় ও ক্রমউন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে আত্মম্ভরিতা তাদের মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নেতিবাচক প্রচার গড়ে দেয় এবং একদিন নিচে ফেলে দেয়। কাজেই দলনেতাদের আত্মম্ভরিতায় মদমত্ত না হয়ে প্রকৃত স্বাভাবিক কারিশমার জনমোহিনীকে বিস্তার করতে হবে।
এবার আমরা এসে পেঁৗছেছি শেষ দোষটিতে। এই দোষটি এতটাই মারাত্মক, শুধু নেতার নয়, সব মানুষদের মধ্যেই অল্পবিস্তর রয়েছে। কিন্তু দিন দিন দেখা যাচ্ছে এটা নেতাদের স্বভাবজাত মতো হয়ে উঠেছে, একে অবশ্যই পরিহার করতেই হবে। এই দোষ হল ক্রোধ। নেতাদের বুঝতে হবে ক্রোধ হল আর কিছু না শুধুই সময়ের অপচয়। এটা ক্ষতিকর। অন্যের ওপরে রাগ দেখাতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি। এখানে দরকার শেষ 'সিঁড়ি'কনিফিডেন্ট (আত্মবিশ্বাস)। নিজের ওপর প্রবল আত্মবিশ্বাসই পারে অন্যের ওপর ক্রোধের বশবর্তী হওয়া থেকে রক্ষা করতে।
নবীন দলনেতাদের প্রয়োজন এই ৭টি দোষকে ত্যাগ করে ৭টি গুণ অবলম্বন করা। বড়দের প্রত্যেকের জীবন হল এই ৭টি দোষ পরিত্যাগ করে ৭টি গুণের সমাহার। এই ৭টি দোষকে ত্যাগ করে ৭টি গুণ অবলম্বন করা করতে পারতে আজকের তরুণ আগামী দিনের সফল নেতৃত্ব দেবে, সমগ্র বিশ্ববাসীকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



